Apan Desh | আপন দেশ

নিপাহ ভাইরাসে মৃত্যুঝুঁকি: কাঁচা রসে সতর্কতা জরুরি

আপন দেশ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪:২৯, ১০ জানুয়ারি ২০২৬

নিপাহ ভাইরাসে মৃত্যুঝুঁকি: কাঁচা রসে সতর্কতা জরুরি

ছবি : আপন দেশ

নিপাহ ভাইরাস একটি ভাইরাসজনিত জুনোটিক রোগ, অর্থাৎ এটি প্রাণীর দেহ থেকে মানুষের শরীরে সংক্রমিত হয়। যদিও বিভিন্ন প্রাণীর মাধ্যমে এ রোগ ছড়াতে পারে, তবে ফলখেকো বাদুড়কে এর প্রধান বাহক হিসেবে ধরা হয়। আক্রান্ত প্রাণী বা বাদুড়ের মাধ্যমে সংক্রমণের পাশাপাশি আক্রান্ত মানুষ থেকে মানুষেও এ ভাইরাস ছড়াতে সক্ষম।

প্রাণঘাতী সংক্রমণ
নিপাহ ভাইরাসে মানুষ আক্রান্ত হলে রোগটি মানব দেহে মারাত্মক রূপ নিতে পারে। এ রোগে মৃত্যুর হার অত্যন্ত বেশি, প্রায় ৪০ থেকে ৭৫ শতাংশ। মেরু অঞ্চল ও মরুভূমি বাদে বিশ্বের প্রায় সব এলাকায় বাদুড়ের বিস্তৃতি রয়েছে। বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় ১৪০০ প্রজাতির বাদুড় শনাক্ত করা হয়েছে, যা এ ভাইরাসের বিস্তারের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে।

কাঁচা রসের ঝুঁকি, বাড়ছে নিপাহ সংক্রমণ
শীতের আগমন মানেই যেন খেজুরের কাঁচা রস খাওয়ার এক ধরনের বিলাসী প্রতিযোগিতা শুরু হয়। আমরা জানি, খেজুরের কাঁচা রসের সঙ্গে নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু এ বিলাসী প্রতিযোগিতাই অনেক সময় আমাদের জন্য মরণব্যাধিতে পরিণত হয়।

চলতি বছর (২০২৬) ইতোমধ্যে দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৩৫টিতে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ফরিদপুর, রাজবাড়ী, নওগাঁ ও লালমনিরহাট জেলায় সবচেয়ে বেশি রোগী পাওয়া গেছে।

রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) জানায়, ২০২৪ সালে দেশে নিপাহ ভাইরাসে মোট পাঁচজনের মৃত্যু হয়। এছাড়া গত বছর (২০২৫) নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে চারজনের মৃত্যু হয়েছে।

নিপাহ ভাইরাসের উৎস ও বাংলাদেশে বিস্তার
ড. কো বিং চুয়া ১৯৯৯ সালে প্রথমবারের মতো শুকরের শরীরে নিপাহ ভাইরাস শনাক্ত করেন। সে সময় সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় শুকর খামারিদের মধ্যে এক ধরনের এনকেফালাইটিস, অর্থাৎ মস্তিষ্কের প্রাণঘাতী প্রদাহ দেখা দিয়েছিল। এর ফলে বিলিয়ন-বিলিয়ন ডলারের শুকর রফতানি শিল্প প্রায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়।

যে গ্রামে প্রথমবারের মতো এ ভাইরাস শনাক্ত হয়েছিল, সে কামপুং সুংগাই নিপাহ গ্রামের নাম অনুসারেই ভাইরাসটির নামকরণ করা হয়। বাংলাদেশে নিপাহ ভাইরাস প্রথম শনাক্ত হয় ২০০১ সালে, এবং তারপর থেকে প্রায় প্রতিবছরই দেশে এর আউটব্রেক ঘটছে।

আরও পড়ুন<<>>ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ২৯ জন

নিপাহ শনাক্তকরণ ও চিকিৎসার বাস্তবতা
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এ রোগের কোনো ভ্যাকসিন বা নির্দিষ্ট (স্পেসিফিক) চিকিৎসা নেই। রোগীর শারীরিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে কেবল সাপোর্টিভ কেয়ার দেয়া হয়।

নিপাহ নির্ণয়ের জন্য কোভিডের মতো আমাদের নির্ভর করতে হয় আরটি পিসিআর পরীক্ষার ওপর। তবে এলাইজা পরীক্ষার মাধ্যমেও নিপাহ ভাইরাসের অ্যান্টিবডি শনাক্ত করা সম্ভব। যেহেতু নিপাহর কোনো কার্যকর চিকিৎসা নেই, তাই বাঁচতে হলে সচেতনতা ও সাবধানতা মেনে চলাই একমাত্র উপায়।

নিপাহ সংক্রমণের লক্ষণসমূহ
নিপাহ ভাইরাসে সংক্রমিত হলে কেউ কেউ উপসর্গহীন থাকতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে শুধু সাধারণ জ্বর-কাশি দেখা দিতে পারে। তবে সবচেয়ে জটিল অবস্থা তৈরি হয় যখন মস্তিষ্কে সংক্রমণ বা এনসেফালাইটিস দেখা দেয়। নিপাহ ভাইরাস শরীরে প্রবেশের ৫ থেকে ১৪ দিন পর রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়। তবে লক্ষণ প্রকাশ ছাড়াও ভাইরাসটি ৪৫ দিন পর্যন্ত সুপ্ত অবস্থায় শরীরে থাকতে পারে।

শুরুর দিকে প্রচণ্ড জ্বর, মাথা ও পেশিতে ব্যথা, খিঁচুনি, শ্বাসকষ্ট, কাশি, পেটব্যথা, বমিভাব ও দুর্বলতা দেখা দিতে পারে। এ রোগে মস্তিষ্কে এনসেফালাইটিসজনিত ভয়াবহ প্রদাহ সৃষ্টি হয় এবং একপর্যায়ে রোগী প্রলাপ বকতে শুরু করে; ঘুমঘুম ভাব, মানসিক ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয় এবং অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না হলে রোগী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে পারে। আর যারা বেঁচে যান, তাদের অনেকেই স্মৃতিশক্তি হারান এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন না; এমনকি চিরতরে পঙ্গু হয়ে যেতে পারেন।

এমন পরিস্থিতিতে স্পষ্ট যে, সচেতনতা ও সাবধানতার কোনো বিকল্প নেই। খেজুরের কাঁচা রস কোনোভাবেই পান করা যাবে না। তবে খেজুরের গুড়, রান্না করা খেজুরের রসের পায়েস ও পিঠা খাওয়া নিরাপদ, কারণ ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি তাপমাত্রায় নিপাহ ভাইরাসের কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যায়।

রসপান ও ফলমূল খাওয়ায় সতর্কতা
গাছ থেকে খেজুরের রস সংগ্রহের সময় হাঁড়ি জাল বা পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে, যাতে কোনোভাবেই বাদুড়ের লালা, মল বা মূত্র রসের সঙ্গে মিশে না যায়। এ ক্ষেত্রে খেজুরের রস সংগ্রহকারী গাছিদেরও সর্বোচ্চ সতর্কতা ও নিরাপত্তা মেনে কাজ করতে হবে।

বাদুড় বা পাখির আংশিক খাওয়া ফল খাওয়া যাবে না। বাজার থেকে কেনা ফল ভালোভাবে ধুয়ে খেতে হবে। নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির কাছে বিনা প্রয়োজনে যাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে এবং রোগীর সেবায় অবশ্যই মেডিক্যাল সেফটি মেনে চলতে হবে। এ ক্ষেত্রে রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া জরুরি।

নিপাহ ভাইরাসের লক্ষণ দেখা দিলে কালবিলম্ব না করে দ্রুত নিকটস্থ সরকারি হাসপাতালে রোগীকে নিয়ে যেতে হবে এবং তাকে মানসিকভাবে সাহস জোগাতে হবে। আসুন, আমরা আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক ও সচেতন হই। তবেই এ মরণব্যাধি নিপাহ ভাইরাস থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।

আপন দেশ/জেডআই

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়