Apan Desh | আপন দেশ

ইবি ছাত্র উপদেষ্টার বিরুদ্ধে লক্ষাধিক টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

ইবি প্রতিনিধি, আপন দেশ

প্রকাশিত: ২১:১৬, ৩ মে ২০২৬

ইবি ছাত্র উপদেষ্টার বিরুদ্ধে লক্ষাধিক টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

ছবি: আপন দেশ

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেষ্টা ও জামায়াতপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন গ্রীণ ফোরামের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. ওবায়দুল ইসলামের বিরুদ্ধে আপ্যায়ন বিলের ভুয়া ভাউচারে লক্ষাধিক টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। ক্যাম্পাসের সাংবাদিক ও ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে মতবিনিময় সভার নামে আপ্যায়ন ব্যয় দেখিয়ে এসব অর্থ উত্তোলন করেছেন তিনি। তবে, তার কার্যালয়ে তেমন একটা মতবিনিময় সভাই হয়নি বলে জানিয়েছেন ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

কয়েকদিন আগে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে অস্বাভাবিক হারে আপ্যায়ন বিল উত্তোলনের অভিযোগ সামনে আসে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইবির আপ্যায়ন বাজেট ছিল ১৩ লাখ টাকা। তবে প্রশাসনের অস্বাভাবিক আপ্যায়ন ব্যয়ে মাত্র ৫ মাসেই শূন্য হয়ে যায় আপ্যায়ন বাজেট। বিষয়টি সন্দেহজনক হওয়ায় গতবছরের ৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন দফতরের নামে উত্তোলনকৃত আপ্যায়ন বিল যাচাই-বাছাই করে দেখা যায়, ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. ওবায়দুল ইসলামের নামে এ অফিসের আপ্যায়ন বিল উঠেছে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৩২০ টাকা। অভিযোগ রয়েছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভুয়া ভাউচারে অর্থ উত্তোলন করেছেন তিনি।

বিলের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, অধিকাংশ আপ্যায়ন বিলই তোলা হয়েছে ছাত্র উপদেষ্টার অফিসে আয়োজিত বিভিন্ন রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে মতবিনিময় সভার নামে। তন্মধ্যে, গত ২২ সেপ্টেম্বর জুলাই বর্ষপূর্তি উদযাপন উপলক্ষে ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে মতবিনিময় সভার বিল বাবদ ২২ হাজার ৫০ টাকা, ২৫ অক্টোবর সাংবাদিক ও ছাত্র প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা বাবদ আপ্যায়ন বিলে ২২ হাজার ৫০ টাকা, এরই এক সপ্তাহ পর ২ নভেম্বরে ৩টি সভা বাবদ আপ্যায়ন বিল বাবদ ২১ হাজার ৬০০ টাকা, একই দিনে আবারও ৩টি সভার আপ্যায়ন বিল বাবদ ২১ হাজার ৪২০ টাকা, ১৭ নভেম্বর তারিখে একইসঙ্গে ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে ৩টি সভার আপ্যায়ন বিল বাবদ ২২ হাজার ১৪০ টাকা এবং অর্থনীতি ও জিওগ্রাফি বিভাগের শিক্ষার্থীদের সাথে মতবিনিময় বাবদ ২২ হাজার ৫০ টাকা আপ্যায়ন বিল তোলা হয়েছে। 

আরও পড়ুন<<>>শিক্ষার্থীদের ভর্তিতে আর্থিক সহায়তার আবেদনের সময় বাড়ল

এসব বিলে ক্যাম্পাসের মেইন গেটের ইবি স্ন্যাকস দোকানের প্যাকেট প্রতি ৩০০ টাকা মূল্যের বিরিয়ানি এবং যেদিন বিরিয়ানি খাওয়ানো হয়নি সেসব সভায় ঝালচত্বরের অভি ক্যাফের ২০০ টাকা মূল্যের নাস্তার প্যাকেট দেয়া হয়েছে বলে দেখানো হয়েছে। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব দোকান থেকে মাঝেমধ্যে প্রশাসনের লোকজন খাবার নিলেও ক্যাশ মেমো নেয়ার সময় দোকানদারের স্বাক্ষর নিয়ে একাধিক ফাঁকা মেমো নিয়ে যান। পরবর্তীতে এসব মেমো প্রয়োজনমতো কাজে লাগানো হয়। পরিচয় গোপন রেখে এসব দোকান থেকে প্রতিবেদক নিজেও একাধিক ফাঁকা মেমো নিয়ে এসেছেন যেখানে ইচ্ছেমতো খাবারের বিবরণ ও দাম বসিয়ে বিল উত্তোলনের সুযোগ রয়েছে।

এ ব্যাপারে ঝালচত্বরের অভি ক্যাফের মালিক আলমগীর বিশ্বাসকে ছাত্র উপদেষ্টার জমা দেয়া ২০০ টাকা মূল্যের নাস্তার মেমো দেখিয়ে জানতে চাইলে বলেন, আমার দোকানে তো কোন প্যাকেটই নাই। আমি নাস্তা বানাইও না। সেখানে আমি প্যাকেট করে নাস্তা বিক্রি করবো কীভাবে। আর আমি প্যাকেট নাস্তা বিক্রিও করি না। এগুলোর ব্যাপারে আমার জানা নেই।

ইবি স্ন্যাকসের মালিক এনামুল কবির জানান, প্রশাসনের লোকজন তার দোকান থেকে সচরাচর যেসব বিরিয়ানি নেয় সেগুলো খাসির বিরিয়ানি, দাম ১৮০ টাকা। অর্ডার ব্যতীত সাধারণ সময়ে ৩০০ টাকা প্যাকেটের কোন বিরিয়ানি বিক্রি করেন না তিনি।

এছাড়া, যেকোন মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হলে সাধারণত সভার রেজুলেশন তৈরি করার কথা থাকলেও এসব বিলের সঙ্গে সভার কোন রেজুলেশন কপি পাওয়া যায়নি। এসব সভার রেজুলেশন বা বিলের ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য চাইলে উপরমহলের অনুমতি ছাড়া তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান সংশ্লিষ্ট দফতরের কর্মকর্তারা।
আবার, ভিন্ন ভিন্ন দিনে ও ভিন্ন ভিন্ন ভাউচারে বিল তোলা হলেও একই অংকের (২২,০৫০) বিল একাধিক দিনে উত্তোলিত হওয়ায় সন্দেহের মাত্রা বেড়েছে। কেননা একাধিক দিনের মতবিনিময় সভায় উপস্থিত সদস্যবৃন্দের সংখ্যা একই হওয়াটা অস্বাভাবিক। এখানে পূর্বেই দোকান থেকে নিয়ে আসা ফাঁকা ভাউচার একাধিক দিন ভিন্ন ভিন্ন নামে ব্যবহার করে অর্থ উত্তোলন করা হতে পারে বলে আশংকা সংশ্লিষ্টদের। 

এদিকে, রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠন গুলো ছাত্র উপদেষ্টার অফিসে কোন মতবিনিময় সভা করেননি। তাই তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভার নামে উত্তোলনকৃত এসব বিলের ব্যাপারেও জানেন না তারা।

খেলাফত ছাত্র মজলিসের সভাপতি জোনায়েদ বলেন, নতুন দায়িত্ব পাওয়ার পর ছাত্র উপদেষ্টার অফিসে কখনোই কোন মিটিং হয়নি, তবে প্রক্টর অফিসে বিভিন্ন ইস্যুতে বসা হয়েছে। মিটিংয়ে লেক্সাস বিস্কিট, কলা, সিঙ্গারা, ডিম প্যাটিস এসব খাওয়ানো হতো। ৩০০ টাকা দামের বিরিয়ানি কখনো আমাদের খাওয়ানো হয়েছে বলে মনে পড়ে না।

তালাবায়ে আরাবিয়ার সেক্রেটারি শামীম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উপলক্ষে মনে হয় একবার বসছিলাম তার অফিসে। এর বাইরে কোন মতবিনিময় সভা আমরা করিনি। প্রক্টর অফিসের মিটিংয়ে নর্মাল নাস্তা খাওয়াতো আর লম্বা সময় হলে সবজি রোল খেয়েছি। অন্যান্যরা হয়তো ছাত্র উপদেষ্টার অফিসে বিরিয়ানি বা ওই খাবার খেয়েছে, তবে আমি খাই নাই। আর নাস্তার দাম কোনমতেই ৩০০ টাকা হবে না।

ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি ইসমাইল হোসেন রাহাত বলেন, চব্বিশের জুলাইয়ের পরে ছাত্র উপদেষ্টার অফিসে বিভিন্ন সংগঠনের অনুমোদন এবং বঙ্গবন্ধু চেয়ার সংশ্লিষ্ট ব্যাপারে সভা হয়েছিল। এর বাইরে গত এক বছরে আমি কোন সভা করিনি, অন্য সংগঠন করেছে কিনা জানিনা। তবে আসলেও যদি কোন সভা হতোই তাহলে আমি উপস্থিত না থাকলেও অন্তত অবগত থাকতাম।

শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব মাসুদ রুমি মিথুন বলেন, ছাত্র উপদেষ্টার অফিসে ছাত্রদলের নেতৃবৃন্দ কোন মিটিং করিনি। সেখানে একাধিকবার মতবিনিময় সভা করা বা ৩০০ টাকা প্যাকেট খাবার খাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। যেখানে আমরা কোন মিটিং ই করিনি সেখানে আমাদের নামে কীভাবে আপ্যায়ন বিল তোলা হলো তা ঠিক জানিনা। আর এ বিলের টাকা কোথায় গেলো তাও আমরা জানতে চাই।

তবে ইবির বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহবায়ক এস এম সুইট প্রথমে বিষয়টি তার মনে নেই, কমিটির মুখ্য সংগঠক গোলাম রাব্বানীর সঙ্গে কথা বলে জানাবেন বলে জানান। পরবর্তীতে তিনি মন্তব্য দিতে রাজি হননি।

অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে ইবি ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. ওবায়দুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ হয় এ প্রতিবেদকের। গত ২৫ এপ্রিল যেসব বিল নিয়ে অভিযোগ রয়েছে সেগুলোর বিবরণ তিনি তার হোয়াটস অ্যাপে দিতে বলেন। পরবর্তীতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করার পর আজ তিনি জানান, এগুলো অনেক আগের বিল, বিস্তারিত মনে নেই। একটি প্রজেক্টের কাজে তিনি ব্যস্ত আছেন। প্রজেক্টের কাজ শেষ হলে তিনি ফাইল দেখে এ ব্যাপারে সময় দেবেন।

ভুয়া ভাউচারে বিল পরিশোধের ব্যাপারে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আমাদের যখন কোন অফিস বিল পাঠায়, আমরা তো মাঠপর্যায়ে যেয়ে যাচাই করি না। যিনি বিল পাঠান তাকে বিশ্বাস করেই আমরা বিল দেই। এখন তিনি যদি ১০ জনকে খাওয়ায়ে ৫০ জন লেখেন, সেটা তো আমাদের দেখা সম্ভব না। কিন্তু যদি কোন অভিযোগ আসে তাহলে প্রশাসন কমিটি করে যাচাই-বাছাই করে দেখবে। এমন পাওয়া গেলে তাকে টাকা ফেরত দিতে হবে। আমি কোন অনিয়ম ছাড় দেবো না। 

আপন দেশ/এসআর

মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

সম্পর্কিত বিষয়:

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়