শেখ মামুন খালেদ। ছবি: সংগৃহীত
ওয়ান-ইলেভেনের অন্যতম কুশীলব ও ডিজিএফআইর সাবেক মহাপরিচালক লে: জে: (অব.) শেখ মামুন খালেদের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত থাকা সত্ত্বেও মামলা করতে পারছে না দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দীর্ঘ দিন ধরে দুদকে কমিশন না থাকায় মামলার স্যাংশন দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে অনুসন্ধান শেষ পর্যায়ে থাকলেও দায়ের করা যাচ্ছে না মামুন খালেদ, তার স্ত্রী-সন্তানদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা। দুদক সূত্র জানিয়েছে এ তথ্য।
সূত্রমতে, ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী সময়ে ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের জিম্মি করে শত শত কোটি টাকা আদায়, জলসিঁড়িতে আবাসিক প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া, নিজের এবং স্ত্রী নিগার সুলতানা খালেদের নামে- বেনামে বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং অর্থ পাচারের অনুসন্ধান চলছে এক বছর ধরে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি টিম এ অনুসন্ধান চালাচ্ছে।
অনুসন্ধান পর্যায়ে এরই মধ্যে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ এবং রেকর্ডপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। অনুসন্ধান প্রক্রিয়ায় এরই মধ্যে লে: জে: (অব.) শেখ মামুন খালেদ এবং নিগার সুলতানা খালেদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেয়া রয়েছে। বিগত কমিশন অনুসন্ধানের অনুমোদন এবং নিষেধাজ্ঞা দেয়।
মঙ্গলবার (০৩ মার্চ) ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন নেতৃত্বাধীন কমিশন পদ্যাগের পর প্রায় এক মাস ধরে সংস্থাটি অভিভাবক শূন্য। এ প্রেক্ষাপটে মামুন খালেদসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানের অনুমোদন আটকে আছে। আটকে আছে মামলা অনুমোদন ও চার্জশিট দাখিল। একই কারণে আটকে আছে মামুন খালেদ দম্পতির মতো অনেক হাইপ্রোফাইল দুর্নীতি মামলার অনুমোদন।
সূত্রটি জানায়, শেখ মামুন খালেদের বিরুদ্ধে অকাট্য প্রমাণ দুদক টিমের হস্তগত হলেও দায়ের করা যাচ্ছে না কোনো মামলা। ফলে দুদকের কোনো মামলায় আপাতত তাকে গ্রেফতারও দেখানো যাচ্ছে না। তবে ওয়ান-ইলেভেনের অন্যতম কুশীলব লে: জে: মাসুদউদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে আগে থেকেই একাধিক দুর্নীতি মামলা থাকায় এসব মামলায় তাকে এরই মধ্যে গ্রেফতার দেখানোর আবেদন জানানো হয়েছে। যা মামুন খালেদের ক্ষেত্রে সম্ভব হচ্ছে না।
দুদক সূত্র বলছে, শেখ মামুন খালেদ ওয়ান-ইলেভেনের অন্যতম কুশীলব হলেও তিনি ছিলেন দুর্ধর্ষ। দিনকে রাত এবং রাতকে দিন করতেন শুধু মাত্র অবৈধ অর্থ হাতিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে। ওয়ান-ইলেভেন সংগঠন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে শহীদ মইনুল রোডের বাড়ি থেকে নির্মমভাবে উৎখাত, তারেক রহমানকে (বর্তমান প্রধানমন্ত্রী) নির্মম নির্যাতনের মতো পাশবিক কর্মকাণ্ডের পুরষ্কারস্বরূপ শেখ হাসিনা ২০১১ সালে লে: জে: মামুন খালেদকে ডিজিএফআইর মহাপরিচালক করেন। ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিনি এ পদে ছিলেন। ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময় (২০০৭-২০০৮) তিনি ডিজিএফআইয়ের কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর (সিআইবি) পরিচালক ছিলেন। সেনা বাহিনী থেকে অবসরের পর শেখ হাসিনা তাকে সেনাবাহিনী পরিচালিত ‘বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)’র ভিসি নিয়োগের মাধ্যমে পুরষ্কৃত করেন। এছাড়া তিনি ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ (এনডিসি) কমান্ড্যান্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
আরও পড়ুন <<>> ‘পাত্রী চাই’ বিজ্ঞাপনের ফাঁদে উচ্চপদস্থ নারী কর্মকর্তা
অভিযোগ রয়েছে, লে: জে: শেখ মামুন খালেদ সিআইবির পরিচালক এবং ডিজিএফআইর মহাপরিচালক থাকাকালে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের ফোনে ব্যাপকভাবে আড়ি পাততেন। রাজনৈতিক নেতা ছাড়াও ব্যবসায়ীদের ব্যক্তিগত কথোপকথন রেকর্ড করে তাদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করতেন। সে সঙ্গে ‘জঙ্গি নাটক’ সাজিয়েও আদায় করতেন অর্থ।
শেখ মামুন খালেদের বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সেনা কর্মকর্তাদের জন্য নির্মিত ‘জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্পর’ শত কোটি টাকা আত্মসাত করেন। এ বিষয়ে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ তদন্তে তার বিরুদ্ধে শাস্তির সুপারিশ করা হলেও তা কার্যকর হয়নি বলে জানা গেছে। ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে তিনি বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জন করেন এবং বিপুল অর্থ বিদেশে পাচার করেন।
মামুন খালেদ ও তার স্ত্রী নিগার সুলতানা খালেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান শেষ পর্যায়ে। অনুসন্ধান প্রক্রিয়ায় গতবছর ২২ মে মাসে দুদক আদালতের অনুমোদনক্রমে তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে।
এ বিষয়ে দুদকের মহাপরিচালক (বিশেষ তদন্ত) মীর মো. জয়নুল আবেদীন শিবলী জানান, অভিযোগগুলোর অনুসন্ধান এখন শেষ পর্যায়ে রয়েছে। কমিশনের অনুমোদন পেলেই মামলা দায়ের হতে পারে।
দুদকের অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায, চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর মামুন খালেদও সপরিবারে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। গতবছর এ দম্পতির অনুসন্ধান শুরু হলে গোপনে দেশত্যাগের জন্য একাধিকবার চেষ্টা চালান। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এ তথ্য জানতে পেরে দুদক টিম আদালতের কাছে তাদের দেশত্যাগের ওপর নিষেধাজ্ঞা চায়। ফলে তার দেশত্যাগের চেষ্টা ব্যর্থ হয়। এর পর থেকে লে: জে: (অব.) মামুন খালেদ রাজধানীর পল্লবীস্থ নিউ ডিওএইচএসর নিজ বাসায়ই ছিলেন। ওই বাসা থেকে বুধবার (২৫ মার্চ) রাতে তাকে আটক করে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ। পরে তাকে জুলাই অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতা হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখায় পুলিশ। এ মামলায় পরদিন তাকে গ্রেফতার দেখিয়ে রিমান্ড চাওয়া হয়। শেখ মামুন খালেদ এখন পাঁচ দিনের রিমান্ডে রয়েছেন।
আপন দেশ/এসএস
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।




































