ছবি: এআই জেনারেট
দেশের বহুল আলোচিত সিকদার গ্রুপের সিকদার পরিবারের পাচার করা অর্থের মধ্যে চার দেশে এক বিলিয়ন ডলারের সন্ধান পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। যা বাংলাদেশের মুদ্রায় ১৫ হাজার ৩ ৭৫ কোটি টাকা।
এর মধ্যে ৫০ কোটি ডলার শনাক্ত করতে পেরেছে আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। যা বাংলাদেশের মুদ্রায় ৬ হাজার ১৫০ কোটি টাকা।
সাফল্য অর্থ নেয়া হয়েছে সরকারি-বেসরকারি ১১ ব্যাংক থেকে। ব্যাংকগুলো হলো একীভূত হওয়া সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অধীনে থাকা শরিয়াহভিত্তিক এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক। এর বাইরে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ব জনতা, অগ্রণী ও বেসরকারি ন্যাশনাল ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, আইএফআইসি ও এবি ব্যাংক।
রোববার (২৫ অক্টোবর) অর্থ উদ্ধার ও দেশে ফিরিয়ে আনতে করণীয় ঠিক করতে ১১ ব্যাংকের চেয়ারম্যানদের নিয়ে বিশেষ এক বৈঠক করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান।
৫০ কোটি ডলার শনাক্ত হওয়া চার দেশ হচ্ছে- কেম্যান আইল্যান্ড, থাইল্যান্ড, দুবাই ও যুক্তরাষ্ট্র। অর্থ উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনতে ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক একটি অ্যাসেট রিকোভারি সংস্থার সঙ্গে একাধিক সভা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের মনোনীত প্রতিনিধি।
পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধার করে দেশে ফেরত আনতে পারলে আন্তর্জাতিক সংস্থাটি কমিশন হিসেবে অর্থ পাবে- এরকম শর্তে চুক্তি করেছে দেশিয় ব্যাংকগুলো। কিন্তু সিকদার গ্রুপের বেলায় রিকোভারি সংস্থাটি আগাম অর্থ চেয়ে একগুচ্ছ শর্ত দিয়েছে ব্যাংকগুলোকে।
আরও পড়ুন <<>> বসুন্ধরার পাচারের টাকায় তিন মহাদেশে আট সাম্রাজ্য!
পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা, ঋণ আদায় ও মামলাসহ যাবতীয় কার্যক্রম তদারকিতে প্রতিটি গ্রুপের জন্য একটি করে লিড ব্যাংক ঠিক করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অর্থায়নকারী অন্যান্য ব্যাংক তাতে সহযোগী হিসেবে কাজ করবে।
পাচার হওয়া উদ্ধার করতে কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করতে নির্ধারণ করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে আরওয়ান (আর১) কনসোর্টিয়াম কাজ করছে সিকদার গ্রুপের পাচার করা উদ্ধারে। অন্যদিকে সিকদার গ্রুপের পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফেরত আনতে লিড ব্যাংক হিসেবে কাজ করছে ন্যাশনাল ব্যাংক।
সিকদার পরিবারের সদস্যদের পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফেরাতে বিদেশি সংস্থাটি অগ্রিম অর্থ চায়। বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত পৌছাতে লিড ব্যাংকসহ সহযোগী ব্যাংকের চেয়ারম্যানদের সঙ্গে বিশেষ এ বৈঠক করেন গভর্নর।
সভায় থাকা একাধিক ব্যাংকের চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা হয় আপন দেশ'র প্রতিবেদকের।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন চেয়ারম্যান বলেন, এক বিলিয়ন থেকে ১ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার অর্থ শনাক্ত করেছে রিকোভারি এজেন্ট। তারা বলেছে এর মধ্যে ৫০০ মিলিয়ন(৫০ কোটি) ডলার তারা উদ্ধার করে দিতে পারবে। সময় লাগবে কয়েক মাস। এখন তারা একটি রোডম্যাপ দিয়েছে চুক্তি করতে। এজন্য তারা কিছু আগাম অর্থ চায় আমাদের কাছ থেকে।
রোডম্যাপে আরওয়ান (আর১) বলেছে, শনাক্ত হওয়া ৫০০ মিলিয়ন (৫০ কোটি) ডলারের মধ্যে যতোটুকু প্রথম ধাপে উদ্ধার হবে তার মধ্যে থেকে ১২৫ মিলিয়ন (১২ কোটি ৫০ লাখ) ডলার নিয়ে নিবে একসঙ্গে।
চুক্তি হওয়ার পরবর্তী ৫ বছরের মধ্যে শনাক্ত হওয়া ৫০ কোটি টাকা উদ্ধার করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে আরওয়ান (আর১)। অর্থ উদ্ধারের রোডম্যাপে একমত হলেও আগাম অর্থ ও একসঙ্গে ১২৫ মিলিয়ন ডলার নেয়ার প্রস্তাবে একমত হয়নি কোনো ব্যাংক।
অন্যদিকে গভর্নর তাদের দ্রুত চিন্তা করে উত্তর দিতে বলেছেন। পৃথক মত থাকলে তাও জানাতে বলা হয় ব্যাংকগুলোর চেয়ারম্যানদের।
আরও পড়ুন <<>> ঋণশোধে বিদেশি মুদ্রা কোথায় পাবে মেঘনা গ্রুপ?
চলতি মাসের মধ্যেই রিকোভারি এজেন্টের সঙ্গে চুক্তি করতে বলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ সময়ের মধ্যে চুক্তিতে একমত হলেও আগাম অর্থ ও এক সঙ্গে কমিশন দিতে রাজি হয়নি রাষ্ট্রায়ত্ব অগ্রণী ব্যাংকও।
ব্যাংকটির চেয়ারম্যান আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ ডেইলি আপন দেশ ডটকমকে বলেন, রোডম্যাপটি ভালো মনে করছি। তারা অর্থ উদ্ধার করে দিলে, তারপর কমিশন কেটে নিতে পারবে। অর্থ উদ্ধার না করলে তো কোনো টাকা দিতে পারবো না।
একসঙ্গে সাড়ে ১২ কোটি ডলার কেটে নেয়া প্রসঙ্গে বেসরকারি অপর এক ব্যাংকের চেয়ারম্যান বলেন, আমি বলেছি, যতো টাকা উদ্ধার হবে ততোটুকু কমিশন পাবে রিকোভারি এজেন্ট। এখন যদি ৫০ কোটি ডলারের মধ্যে আগাম সাড়ে ১২ কোটি ডলার কেটে নিয়ে পরের অর্থ উদ্ধার না করলে কিভাবে সংস্থাটিকে ধরবো।
বৈঠকে জানানো হয়, এককভাবে সিকদার গ্রুপ সর্বোচ্চ ৮ হাজার কোটি টাকা বের করে নিয়েছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক থেকে। আইএফআইসি ব্যাংক থেকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে গিয়েছে ৩০ কোটি ডলার।
অর্থ উদ্ধারের খরচের আনুপাতিক হার কিভাবে বহন করবে ব্যাংকগুলো তা নিয়েও আলোচনা হয় বৈঠকে। ফেরত পাওয়া অর্থ কতোটুকু কোন ব্যাংক আনুপাতিক হারে পাবে তা নিয়েও আলোচনা হয় সভায়।
এসব বিষয় ব্যাংকগুলোকে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সমাধান করতে বলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়ার সঙ্গে ১১ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ঠতা লাগবে। সেজন্য তাদের নিয়ে বৈঠকটি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান।
তিনি বলেন, অর্থ ফেরত আনতে তো একটা খরচ বহন করতে হবে ব্যাংকগুলোকে। বিদেশি রিকোভারি এজেন্ট এজন্য একটি রোডম্যাপ দিয়েছে। রোডম্যাপটি জানানো হয়েছে ব্যাংকগুলোকে। অর্থ ফেরত আনার খরচ কোন ব্যাংক কতোটুকু বহন করবে, কিভাবে করবে তা নির্ধারণ করতে আলোচনা করা হয়।
আরিফ হোসেন খান বলেন, রিকোভারি এজেন্ট যে রোডম্যাপ দিয়েছে, তার সঙ্গে ব্যাংকগুলো একমত কি না, তা জানানো হয়। দ্রুত তাদের কাছ থেকে মতামত চাওয়া হয়েছে। চাইলে তার এর বাইরেও মতামত দিতে পারবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, আরওয়ান আন্তর্জাতিক সংস্থা। তারা অর্থ আনতে সহযোগিতা করবে। তবে পাচারকৃত অর্থ শনাক্ত ও তা আইনি প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে প্রথম দিকে একটি খরচ হবে। সে খরচটি আর ওয়ান আগে চাচ্ছে। আমরা (বাংলাদেশ ব্যাংক) মধ্যস্থতাকারি হিসেবে আর ওয়ানের প্রস্তাব ব্যাংকগুলোকে জানিয়েছি। সিদ্ধান্ত পেতে অপেক্ষা করতে হবে।
থাইল্যান্ডের সম্পদ:
সিকদার পরিবারের সম্পদ থাইল্যান্ডে পাওয়ার তথ্য এর আগে আদালতে উপস্থাপন করেছিল বিএফআইইউ ও দুর্নীতি দমন কমিশন(দুদক)। পরবর্তীতে দুদকের আবেদনে সিকদার পরিবারের সন্তানদের নামে থাকা সাত কোম্পানির বিনিয়োগ অবরুদ্ধ করার আদেশ দেয় আদালত।
আরও পড়ুন <<>> দেউলিয়ার পথে হাঁটছে ইফাদ গ্রুপ
গত ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ সাব্বির ফয়েজ সে আদেশটি দেন। ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেডের সাবেক চেয়ারম্যান প্রয়াত জয়নুল হক সিকদারের তিন সন্তান রন হক সিকদার, রিক হক সিকদার ও সাবেক এমপি পারভীন হক সিকদারের এ সাত কোম্পানিতে থাকা বিনিয়োগের পরিমাণ হচ্ছে ৩৫ কোটি ৩০ লাখ থাই বাথ (প্রায় ১৩৩ কোটি ৩৫ লাখ টাকা)। চলতি বছরের গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রে থাকাকালীন মনোয়ারা সিকদার ও গত মে মাসে দুবাইতে রন হক সিকদার মারা যান। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সিকদার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন রন হক সিকদার।
কোম্পানিগুলো হলো, কেওআই রেস্টুরেন্ট কোম্পানি লিমিটেড, সিকদার গ্রুপ লিমিটেডের রিসোর্ট, সিকদার হোল্ডিং লিমিটেড, আর অ্যান্ড আর রেস্টুরেন্ট, জিরানা কোম্পানি লিমিটেড, জেআর আর্কিটেক্ট ইন্টারন্যাশনাল কোম্পানি ও সিকদার অ্যান্ড গ্যারেট ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড।
জয়নুল হক সিকদার ছিলেন ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে দুবাইতে মৃত্যু হলে ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান হক তার স্ত্রী মনোয়ারা সিকদার।
কোম্পানিগুলো হচ্ছে— কেওআই রেস্টুরেন্ট কোম্পানি লিমিটেড, সিকদার গ্রুপ লিমিটেডের রিসোর্ট, সিকদার হোল্ডিং লিমিটেড, আর অ্যান্ড আর রেস্টুরেন্ট, জিরানা কোম্পানি লিমিটেড, যে আর আর্কিটেক্ট ইন্টারন্যাশনাল কোম্পানি ও সিকদার অ্যান্ড গ্যারেট ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড।
২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে ভেঙে দেয়া হলে সিকদার পরিবার মুক্ত হয় ব্যাংকটি।
২০০৯ সাল থেকে ক্রমেই বড় হওয়া সিকদার গ্রুপের বিনিয়োগ রয়েছে ব্যাংক, বিমা, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আবাসন, নির্মাণ, হোটেল, পর্যটন, এভিয়েশনসহ নানা খাতে।
এক পর্যায়ে হঠাৎ করে বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ শুরু করে গ্রুপটি। পরবর্তীতে তা গ্রুপটির সবচেয়ে বিনিয়োগে পরিণত হয়। বিদ্যুৎ খাতে ব্যবসা করা সিকদার গ্রুপের পাওয়ার প্যাক হোল্ডিংসের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে সিকদার গ্রুপের ব্যবসা রয়েছে।
আপন দেশ/এসএস
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।





































