ফাইল ছবি
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা এখন নীরব মহামারির রূপ নিয়েছে। প্রতিদিন সড়কে ঝরছে প্রাণ, পঙ্গুত্ব বরণ করছেন অসংখ্য মানুষ। দুর্ঘটনায় স্বজন হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে পরিবার, বিপর্যস্ত হচ্ছে জীবিকা, বাড়ছে চিকিৎসা ব্যয় ও সামাজিক অনিশ্চয়তা। এর প্রভাব পড়ছে জাতীয় অর্থনীতি ও জনজীবনে। অথচ নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা নাগরিকের মৌলিক অধিকার এবং রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। দীর্ঘদিনের আন্দোলন, আইন প্রণয়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন ও নানা সচেতনতামূলক উদ্যোগের পরও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—স্বপ্নের নিরাপদ সড়ক বাস্তবে রূপ নেবে কবে?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ১০ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে। প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে রয়েছে একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি, ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন এবং দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে ওঠা জীবন। দুর্ঘটনায় আহতদের অনেকে স্থায়ীভাবে কর্মক্ষমতা হারান। ফলে ব্যক্তির জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি পরিবারের ওপর নেমে আসে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক চাপ। সড়ক দুর্ঘটনা তাই নিছক পরিবহন খাতের সমস্যা নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ।
ব্র্যাকের গবেষণায় উঠে এসেছে, সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের ৪০ শতাংশই কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। এ বিপুল প্রাণহানি দেশের উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে। বিভিন্ন গবেষণায় সড়ক দুর্ঘটনার কারণে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২ থেকে ৩ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতির হিসাবও উঠে এসেছে। উন্নয়নশীল একটি দেশের জন্য এ ক্ষতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অর্থাৎ সড়কে প্রতিটি প্রাণহানি শুধু একটি পরিবারের শোক নয়, জাতীয় সম্পদ ও সম্ভাবনারও অপূরণীয় ক্ষতি।
দুর্ঘটনার মূল কারণ অব্যবস্থাপনা ও আইনের দুর্বল প্রয়োগ
সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে রয়েছে একাধিক কাঠামোগত ও আচরণগত কারণ। অদক্ষ চালক, যথাযথ প্রশিক্ষণের ঘাটতি, বৈধ লাইসেন্স ছাড়া যানবাহন চালানো, অতিরিক্ত গতি, বেপরোয়া চালনা এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করার প্রবণতা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। পাশাপাশি অপরিকল্পিত সড়ক অবকাঠামো, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণ এবং পথচারীদের নিরাপদ চলাচলের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকাও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।
সমস্যা হলো, আইন ও বিধিমালা থাকলেও সেগুলোর প্রয়োগ সব ক্ষেত্রে সমানভাবে কার্যকর নয়। অনিয়মের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ব্যবস্থা না থাকলে অপরাধীরা শাস্তি এড়ানোর সুযোগ পায় এবং একই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ বারবার ঘটতে থাকে। সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাই শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নিরপেক্ষ প্রয়োগ, নিয়মিত তদারকি এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
২০১৮ সালের আন্দোলন: পরিবর্তনের ঐতিহাসিক বার্তা
নিরাপদ সড়কের দাবিতে ২০১৮ সালে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সড়কে প্রাণহানির প্রতিবাদে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে লাইসেন্সবিহীন চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, ট্রাফিক আইন কার্যকর করা এবং পথচারীদের নিরাপদ চলাচলের পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানায়। তাদের সে আন্দোলন দেশজুড়ে সড়ক নিরাপত্তার প্রশ্নটিকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে জবাবদিহির দাবি জোরালো করে।
এ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ প্রণীত হয়। তবে আইন প্রণয়নই চূড়ান্ত সাফল্য নয়। আইনটির কার্যকর ও ধারাবাহিক বাস্তবায়ন, অপরাধ অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সড়ক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই আন্দোলনের প্রত্যাশা পূরণ হতে পারে। শিক্ষার্থীদের সে দাবির যথার্থতা আজও অক্ষুণ্ন রয়েছে।
উদ্যোগ আছে, প্রয়োজন দৃশ্যমান অগ্রগতি
সড়ক নিরাপত্তা উন্নয়নে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) প্রশিক্ষণ, লাইসেন্সিং ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ রয়েছে। মহাসড়কের উন্নয়ন, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন এবং সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতেও সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের পুনর্বাসনেও বিভিন্ন সংস্থার উদ্যোগ রয়েছে।
জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের (এসডিজি) আওতায় ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও আহতের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশকে কার্যকর পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ, নির্ভরযোগ্য তথ্য-উপাত্ত এবং ফলাফলভিত্তিক কর্মসূচির ওপর জোর দিতে হবে। কেবল প্রকল্প গ্রহণ কিংবা অবকাঠামো নির্মাণের হিসাব দিয়ে সাফল্য পরিমাপ করলে চলবে না; দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি বাস্তবে কতটা কমছে, সেটিই হতে হবে মূল্যায়নের প্রধান মানদণ্ড।
নিরাপদ সড়কের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত পদক্ষেপ
নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে প্রথমেই চালকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ, দক্ষতা যাচাই এবং লাইসেন্স প্রদানের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা নিয়মিত করতে হবে এবং অতিরিক্ত গতি, বেপরোয়া চালনা, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং ও ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে সড়ক নির্মাণ ও সংস্কারে নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।
শহর ও গ্রামে পথচারীদের জন্য নিরাপদ ফুটপাত, জেব্রা ক্রসিং, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, নিরাপদ পারাপার ব্যবস্থা এবং কার্যকর ট্রাফিক সংকেত নিশ্চিত করতে হবে। মোটরসাইকেল চালক ও আরোহীদের হেলমেট ব্যবহার এবং গাড়িতে সিটবেল্ট পরার মতো সুরক্ষামূলক আচরণও কঠোরভাবে উৎসাহিত ও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি দুর্ঘটনার পর দ্রুত জরুরি চিকিৎসা, অ্যাম্বুলেন্স সেবা এবং আহতদের পুনর্বাসনব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি পরিবহনমালিক, শ্রমিক সংগঠন, চালক, সুশীল সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও নাগরিকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা না গেলে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।
স্বপ্ন নয়, নিরাপদ সড়ক হোক বাস্তবতা
নিরাপদ সড়ক কোনো বিলাসিতা নয়; এটি মানুষের জীবন রক্ষার অপরিহার্য শর্ত। প্রতিটি নাগরিকের নির্বিঘ্নে ঘর থেকে বের হওয়া এবং নিরাপদে গন্তব্যে ফিরে আসার নিশ্চয়তা থাকা উচিত। অথচ সড়কে মৃত্যুর আশঙ্কা নিয়ে প্রতিদিন যাত্রা করতে হলে উন্নয়ন ও অগ্রগতির সব অর্জনই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
এখন প্রয়োজন প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবায়নে যাওয়ার। দুর্ঘটনার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা, ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক চিহ্নিত করা, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করা এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই নিরাপদ সড়কের ভিত্তি শক্তিশালী হতে পারে। সরকারকে যেমন কার্যকর নেতৃত্ব দিতে হবে, তেমনি নাগরিকদেরও ট্রাফিক আইন মেনে চলার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
২০১৮ সালের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন আমাদের দেখিয়েছে, নিরাপদ সড়কের দাবি কোনো বিচ্ছিন্ন আবেগ নয়; এটি জনমানুষের ন্যায্য প্রত্যাশা। সে প্রত্যাশাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে আর কালক্ষেপণের সুযোগ নেই। প্রশ্ন শুধু স্বপ্নের নিরাপদ সড়ক কবে বাস্তব হবে, তা নয়; বরং সে লক্ষ্য অর্জনে আজ কী পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে এবং তার ফল কতটা দৃশ্যমান। মানুষের জীবনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে নিরাপদ সড়ক আর অধরা স্বপ্ন থাকবে না—তা হয়ে উঠবে বাংলাদেশের বাস্তবতা।
আপন দেশ/জেডআই
মন্তব্য করুন ।। খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত,আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।





































