মো. শামীম হুসাইন এবং কেশব লাল দেব। ছবি: সংগৃহীত
একবার অধিগ্রহণ করা জমি ফের অধিগ্রহণ- আর সে প্রক্রিয়াতেই সরকারি কোটি কোটি টাকা ছাড়ের অভিযোগ উঠেছে ঢাকা জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখা-৩ ঘিরে।
একই জমি পুনরায় অধিগ্রহণের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্র ভুয়া দাবি, বিতর্কিত মালিকানা ও অতিমূল্যায়িত অবকাঠামোর বিপরীতে বিপুল ক্ষতিপূরণ আদায়ের পথ তৈরি করেছে বলে অভিযোগ। আপন দেশ'র গভীর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এ চক্রের সঙ্গে ঢাকা ডিসি অফিসের এডিসি মো. শামীম হুসাইন, সার্ভেয়ার কেশব লাল দেবসহ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পৃক্ততার প্রমাণ।
ফলে ঢাকা জেলা প্রশাসনের এল.এ. শাখা এখন আর কোনো অধিগ্রহণজনিত ক্ষতিগ্রস্তদের বকেয়া পাওনা অর্থ পরিশোধের দফতর নেই। হয়ে উঠেছে দুর্নীতিবাজ এডিসি মো. শামীম হুসাইন, এল.এ. শাখা-৩ এর সার্ভেয়ার কেশব লাল দেব, আব্দুল বারিক আর ইকবাল হোসেনদের রাতরাতি সম্পদের পর্বত তৈরির দফতর।
এখানে সাধারণ ক্ষতিগ্রস্তদের যেমন অধিগ্রহণের অর্থ প্রাপ্তি জটিল, কঠিন ও হয়রানিমূলক হয়ে উঠেছে, তেমনি তৈরি হয়েছে শামীম-কেশবদের অবাধ লুটপাটের মওকা।
চিহ্নিত এ দুর্নীতিবাজদের দুর্নীতির অকাট্য প্রমাণ থাকলেও অদৃশ্য কারণে ধরা হয় না তাদের। তারা নামে-বেনামে গড়ে তুলেছেন সম্পদের পর্বত। অথচ এ সম্পদ কখনো দুদকের অনুসন্ধানের বিষয়বস্তু হয় না।
সম্প্রতি প্রতিবেদকের দীর্ঘ অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে শামীম-কেশব নিয়ন্ত্রিত ঢাকা ডিসি এল.এ. শাখা-৩ এর কিছু খণ্ডচিত্র।
ঘটনা এক
ভূমি অধিগ্রহণ মামলা নং-০৮/২৩-২৪। মৌজা-জোয়ার সাহারা। সিএস দাগ-১২৯৫, আর.এস-৫৪৩৮, সিটি দাগ-৫৭৭৩৭, অধিগ্রহণকৃত জমি-০.০৮১৯ একর। পূর্বের ১৩৮/১৯৬১-৬২ নং এল.এ. কেসে সিএস-১২৯৫ দাগে পূর্ণ জমি অধিগ্রহণকৃত। ইতিপূর্বে অধিগ্রহণকৃত (ওভারলেপিং) জমির তথ্য গোপন রেখে ৩০ শতাংশ হারে কমিশন নিয়ে কেশব লাল দেবের শাখা থেকে জমির মালিক দাবিদার আব্দুল মান্নানকে গত বছর ১৮ মে ১৭ কোটি ৪২ লাখ ৩৪ হাজার টাকা ‘ক্ষতিপূরণ’ বাবদ দেয়া হয়। যার চেক নম্বর-১০৯১৪১৮।
ঘটনা দুই
ভূমি অধিগ্রহণ মামলা নং-১৮/২৩-২৪। মৌজা-আব্দুল্লাহপুর। সিটি দাগ নং-২৬২৪, অধিগ্রহণকৃত জমির পরিমাণ ০.০৬৫১ একর। ইতিপূর্বে এ সম্পত্তি পানি উন্নয়ন বোর্ড সম্পূর্ণভাবে অধিগ্রহণ করেছিল। যার এল.এ. কেস নম্বর-০৮/১৯৬৪-৬৫। ইতিপূর্বে অধিগ্রহণকৃত (ওভারলেপিং) জমির তথ্য গোপন রেখে ২৫ শতাংশ হারে কমিশন খেয়ে মালিকানা দাবিদার ভুয়া এক ব্যক্তিকে প্রায় ২০ কোটি টাকা দেয়া হয়।
ঘটনা তিন
ভূমি অধিগ্রহণ মামলা নম্বর-০৪/২২-২৩, মৌজা-নড়াইবাগ। ২২৫৩ ও ২২৫৪ নম্বর দাগের জমি ও অবকাঠামো অধিগ্রহণ করা হয়। ক্ষতিপূরণ প্রদানের একটি সুসংগঠিত জালিয়াত চক্র ২২৫৩ নম্বর দাগের ওপর নির্মিত অবকাঠামো কৌশলে শুধু ২২৫৪ নম্বর দাগের ওপর দেখায়। এরপর এলএ শাখার সার্ভেয়ার কেশব লাল ও আব্দুল বারিক ৩৩ শতাংশ অর্থের বিনিময়ে মূল অ্যাওয়ার্ডি মো. সালাহ উদ্দিনকে বাদ দেন। ভুয়া মালিক সাজিয়ে মো. জসিম উদ্দিনকে ১৪ কোটি ১১ লাখ ৯৬ হাজার ৭৭ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়ার অভিযোগ রয়েছে।
ফ্যাসিস্ট আমলে ঢাকা দক্ষিণের ৬৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ছিলেন মো. সালাহউদ্দিন। ৫ আগস্টের পর তিনি ভারতে পালিয়ে যান। ওয়ারিশ ও নামজারি মোতাবেক সিটি ২২৫৩ দাগের ভূমি ও অবকাঠামোর মালিক সালাহউদ্দিনসহ ৭ জন। অন্য মালিকরা হচ্ছেন মো. আবুল কাশেম, আবুল হাশেম, রাসেল আহমেদ, তাসলিমা আহমেদ ও জসিমউদ্দিন।
আরও পড়ুন <<>> আত্মস্বীকৃত চোর প্রকৌশলী আজাদের হাতে সওজের রিমোট
তাদের পিতা তমিজউদ্দিন আহমেদ। সাং-৩০, নড়াইবাগ, ডেমরা -১৩৬০, ঢাকা। এদের মধ্যে মো. সালাহউদ্দিন এখন পলাতক, মো. ইসহাক মিয়া (মো. আবুল কাশেম) যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। এ দু’জন দেশে না থেকে কীভাবে এল.এ. শাখার শুনানিতে সশরীরে অংশ নিলেন? কেশব লাল দেবের পক্ষে সবই সম্ভব। তিনি ভুয়া ব্যক্তিদের দাঁড় করিয়ে স্বাক্ষর জাল করেছেন, শুনানির নাটক মঞ্চস্থ করা হয়েছে।
অধিগ্রহণকৃত ভূমিতে পরিকল্পিতভাবে অবকাঠামো নির্মাণ করা হয় কম মূল্যের এবং নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে। এ কাজের সঙ্গে গণপূর্ত অধিদফতর, সড়ক ও জনপথ অধিদফতর এবং ঢাকা ডিসি অফিসের সার্ভেয়ার কেশব লাল দেব, আব্দুল বারিক যুক্ত ছিলেন। নামমাত্র কথিত এ অবকাঠামোকে অতিরিক্ত মূল্য দেখিয়ে অর্থ ছাড়ের ব্যবস্থা করেন কেশব লাল-আব্দুল বারিক।
ঘটনা চার
ভূমি অধিগ্রহণ মামলা নং-১৩/১৮-১৯। মৌজা-রানাভোলা, সিটি দাগ নং-৬৮৬। অধিগ্রহণকৃত জমির পরিমাণ-০.২৩৩৭ একর। জমিটির আর.এস. ও সিটি রেকর্ড ১ নং খাস খতিয়ানভুক্ত (সরকার মালিকানাধীন খাস জমি)। তা সত্ত্বেও ৩০ শতাংশ কমিশন খেয়ে সার্ভেয়ার আব্দুল বারিক সাদেকা খানকে ৩ কোটি ২৫ লাখ ৯৪ হাজার ৯১০ টাকা প্রদানের ব্যবস্থা করেন। অথচ বিধান হচ্ছে, ১ নং খাস খতিয়ানভুক্ত জমি ভূমি মন্ত্রণালয়, বিভাগীয় কমিশনার এবং জেলা প্রশাসকের অনুমোদন সাপেক্ষে জমা খারিজ করা। এসবের তোয়াক্কা না করে সাদেকা খানকে দাঁড় করিয়ে এল.এ. শাখা-৩ এর সার্ভেয়ার বারিক পরস্পর যোগসাজশে সরকারি অর্থ হাতিয়ে নেন।
ঘটনা পাঁচ
ল্যান্ড অ্যাকুইজিশন মামলা নম্বর-০৪/২২-২৩। মৌজা-ঘোপ দক্ষিণ, সিটি দাগ নং-১০৫। সম্পত্তির ওপর অবকাঠামো ছিল। সম্পত্তিটি মূলত এস.এ.-আর.এস. সিটি রেকর্ড বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে পাট মন্ত্রণালয়ের নামে ২ নং খতিয়ানে রেকর্ড। জমি ও অবকাঠামোর ক্ষতিপূরণের টাকা প্রদানের বিষয়ে পাট মন্ত্রণালয়ের মতামত না নিয়ে পরস্পর যোগসাজশে ২৫ শতাংশ হারে কমিশন খেয়ে ১৪ কোটি টাকার বিনিময়ে বিভিন্নজনকে ক্ষতিপূরণের টাকা চেকের মাধ্যমে দেয়ার ব্যবস্থা করেন সার্ভেয়ার আব্দুল বারিক।
অথচ এ অবকাঠামোসমূহ পাট মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন ব্যক্তিগণের নামে যৌথ তদন্ত, অ্যাওয়ার্ড প্রস্তুত করা হয়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে কোনো অনাপত্তিপত্র নেয়া হয়নি। কিন্তু এল.এ. শাখার সংশ্লিষ্ট টেবিলগুলোকে ম্যানেজ করে পাট মন্ত্রণালয়ের নাম কেটে ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে বিভিন্ন ব্যক্তিকে ৭৭ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়। ঢাকার এল.এ. শাখা-৩ এর সার্ভেয়ার কেশব লাল দেব, আব্দুল বারিক, সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের কর্মকর্তা এবং গণপূর্ত বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এ অর্থ ভাগবাটোয়ারা করে নেন।
এ ঘটনা জানাজানি হয়ে গেলে আব্দুল বারিককে কিশোরগঞ্জ জেলায় বদলি করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ৩০ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে গত ২৬ এপ্রিল ১৩২ নম্বর স্মারকে বদলির আদেশ বিভাগীয় কমিশনার অফিস থেকে বাতিল করে অদ্যাবধি একই শাখায় রয়ে গেছেন।
ঘটনা ছয়
সার্ভেয়ার ইকবাল হোসেন যেন আরেক কাঠি সরেস। ল্যান্ড অ্যাকুইজিশন মামলা নম্বর-০৪/২২-২৩। মৌজা-কামারঘোপ। সিটি দাগ নং-২২০। মামলার বিষয়বস্তু- অবকাঠামোর ক্ষতিপূরণ প্রদান। সম্পত্তিটি মূলত পাট মন্ত্রণালয়ের নামে ২ নং খতিয়ানে রেকর্ড। কিন্তু এল.এ. শাখা-৩ ২৫ শতাংশ হিসেবে প্রায় ২ কোটির বিনিময়ে নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে বিভিন্ন ব্যক্তিদের ৮ কোটি ৩৪ লাখ ১৮ হাজার ৭০৯ টাকা ক্ষতিপূরণ প্রদান করে।
আরও পড়ুন<<>> পাউবোর ডিজি স্বৈরাচারের ক্যাশিয়ার, নেপথ্যে বড় ডিল
এ অর্থ সড়ক ও জনপথ, গণপূর্ত বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং সার্ভেয়ার ইকবাল হোসেনের মধ্যে ভাগাভাগি হয়। নিম্নমানের সস্তা উপকরণ দিয়ে অবকাঠামোটি নির্মাণ করা হলেও ধরা হয় অতি উচ্চ মূল্য। তদুপরি ক্ষতিপূরণের এই টাকা পরিশোধের ক্ষেত্রে পাট মন্ত্রণালয় কিংবা জেলা প্রশাসকের কোনো অনুমোদন নেয়া হয়নি। এডিসি শামীম হুসাইন নেতৃত্বাধীন সার্ভেয়ার কেশব লাল দেব, আব্দুল বারিক ও ইকবাল হোসেন এই আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত।
কে এই শামীম-কেশব?
নাম তার কেশব লাল দেব। ঢাকা জেলা প্রশাসক কার্যালয় এল.এ. শাখা-৩ এর সার্ভেয়ার এখন। হাসিনা আমলজুড়ে ছিলেন কক্সবাজার ডিসি অফিসে। মাতারবাড়ি বিদ্যুৎ প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণ দুর্নীতির অন্যতম কুশীলব। নামের সঙ্গে তার কাজের মিলটা বরাবর। অর্থ-বিত্তেও তিনি ‘লাল’। এতটাই লাল যে, ‘ওপরতলার মানুষ’কে ম্যানেজ করা যেন তার বাঁ হাতের খেল। সরকারের কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের দুর্নীতি মামলায় গ্রেফতার হলেও বেশিদিন জেল খাটতে হয়নি তাকে। চব্বিশের ৫ আগস্টের পর ‘বঞ্চিত-নির্যাতিত’র তালিকায় নাম তুলে পোস্টিং বাগিয়ে নেন ঢাকার ডিসি অফিসে।
এখানেও উপরস্থ ‘বস’ এল.এ. শাখার এডিসি শামীমের নেতৃত্বে গড়ে তুলেছেন অপ্রতিরোধ্য এক সিন্ডিকেট। যে সিন্ডিকেটের অলিখিত ‘আহবায়ক’ এডিসি শামীম, ‘মহাসচিব’ কেশব লাল দেব। সার্ভেয়ার আব্দুল বারিক ও ইকবাল হোসেন তাদের সাঙ্গপাঙ্গ। এ চক্র ঢাকার এল.এ. শাখায় প্রতিষ্ঠা করেছে সরকারি অর্থ লুটপাটের রামরাজত্ব। ভুক্তভোগীদের ভাষায়, ঘুষ, দুর্নীতি আর হয়রানির আরেক নাম ঢাকা জেলা প্রশাসনের এল.এ. শাখা-৩।
কক্সবাজারে পৃথক দু’টি প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণের নামে সরকারের কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা মামলায় শামীম হুসাইন ও কেশব লালের এখন থাকার কথা কারাগারে। সেটির পরিবর্তে তাদের হয়েছে প্রাইজ পোস্টিং।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসন কার্যালয় খেয়ে এখন তারা থাবা বসিয়েছেন ঢাকা ডিসি অফিসে। ‘ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে’ প্রকল্পের অধিগ্রহণকৃত জমির ফাইল আটকে দুই হাতে লুটছেন কোটি কোটি টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষকে ফেলছেন বহুমাত্রিক হয়রানিতে। আবার টাকা পেলে নিমিষেই সমাধানও দিচ্ছেন তারা। অর্থাৎ পরিস্থিতিটা সৃষ্টি করা হয়েছে কৃত্রিম।
দুদক সূত্র জানায়, লুটেরা হাসিনা আমলে বহুল আলোচিত ‘মাতারবাড়ি বিদ্যুৎ প্রকল্প’র ভূমি অধিগ্রহণের একটি দুর্নীতি মামলায় তৎকালীন কক্সবাজার এডিসি (এল.এ.) মো. শামীম হুসাইন (পরিচিতি নং-১৭৪৭৪) ২১ নম্বর আসামি। বাড়ি তার পাবনার চাটমোহর। গুনাইগাছা, দড়িপাড়া গ্রামের আব্দুল জলিলের পুত্র।
সংস্থাটির তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, মো. শামীম হুসাইন ছিলেন মাতারবাড়ি ভূমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত একটি মামলার (নং- ৫২/৮৬) ১৬৩ নম্বর আসামি। নিজে ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা হয়েও জালিয়াতির আশ্রয় নেন। অধিগ্রহণ আইন সম্পর্কে সম্যক ধারণা সত্ত্বেও কক্সবাজার জেলার এলএ মামলা (নং-০৪/১৯-২০) এর ১৮/০৫/২০১৯ ইং তারিখে প্রস্তাবিত বাঁকখালী নদীর উত্তরপাড়ের জমি অসৎ উদ্দেশে একে অপরের সহযোগিতায় প্রতারণাপূর্বক জাল-জালিয়াতির আশ্রয় নেন।
আরও পড়ুন <<>> ‘কালো টাকা’র কাজী ইমদাদ হচ্ছেন দুদক চেয়ারম্যান?
তার ওপর অর্পিত ক্ষমতার অপব্যবহারপূর্বক অপরাধমূলক অনাচারের মাধ্যমে নিজে লাভবান হয়। অন্যকে অন্যায়ভাবে লাভবান করার নিমিত্তে সরকারি টাকা অপচয় করেন। তিনি কারচুপি ও আত্মসাতের উদ্দেশে প্রস্তাবিত ভূমিটি স্থান পরিবর্তন করে বাঁকখালী নদীর দক্ষিণ পাড়ে দশগুণ বেশি মূল্যবান জমিতে প্রকল্পের জমি নির্ধারণ করেন।
পরে স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুম দখল আইন-২০১৭ বাস্তবায়ন সংক্রান্ত নির্দেশনাবলীর ০৪ (ঘ) নং অনুচ্ছেদ ভঙ্গ করে মেয়র মজিবুর রহমানের স্ত্রী ফারহানা আক্তার ও শ্যালক মিজানুর রহমানকে অধিগ্রহণকৃত জমি ২.১৯ একরের মধ্যে ১.৭২ শতক জমি পূর্বপরিকল্পিতভাবে ১.১৯০০ একর জমির ওপর ০৩/১৯৮৮-৮৯ নং রিসিভার মামলা ও অপর মামলা ৫২/১৯৮৬ বিচারাধীন থাকা অবস্থায় সহকারী কমিশনার (ভূমি), সদর মোক্তারের যোগসাজশে সরকারি রিসিভারকৃত জমি ব্যক্তির নামে দখল দেখান। ওই জমি নামজারিকরণ, নোটিশের আদেশের ক্রমিক নং-০৬, তারিখ- ১১/১১/২০১৯ তারিখে ৪ ধারা ও ২৫/১১/২০১৯ তারিখ ৭ ধারা এবং ১৭/১২/২০১৯ তারিখেই প্রাক্কলন প্রত্যাশী সংস্থার কাছে পাঠান।
পরে অপর মামলা ৫২/১৯৮৬ ইং মূলে তাকে ১৬৩ নং বিবাদী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা, মহামান্য হাইকোর্টে রিট পিটিশন নং-১৪৬৮১/২০১৯ এর ০৫/১২/২০১৯ এর আদেশকে মিসগাইড করেন। যথাযথভাবে নিষ্পত্তি না করেই মো. শামীম হুসাইন ০৯/০৭/২০২০ তারিখে অধিগ্রহণের ৭ কোটি ১৪ লাখ ৮৮,৭৮০ টাকা প্রদানপূর্বক আত্মসাৎ করেন। তদন্ত প্রতিবেদনে মো. শামীম হুসাইনের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯/৪৬৭/৪৬৮/৪৭১/১০৯ ধারাসহ ১৯৪৭ সালের ২ নং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় চার্জশিট প্রদানের সুপারিশও করা হয়।
কক্সবাজার জেলাধীন ঝিলংজা মৌজায় পুলিশের ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) কার্যালয় নির্মাণের লক্ষ্যে ভূমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত এক মামলায় মো. শামীম হুসাইন ২৪ নম্বর আসামি। ১ নম্বর আসামি কক্সবাজার জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের তৎকালীন সার্ভেয়ার মোহাম্মদ ওয়াসিম খান। ২০২০ সালের ১০ মার্চ দায়েরকৃত মামলায় (স্পেশাল মামলা নং-০৬/২০২০) তার বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১৬১/১৬২/৪২০/১০৯ এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এর ৪(২) ধারাসহ ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলাটিতে পিবিআই প্রকল্পে জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে সরকারের ৮ থেকে ১০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে শামীমের বিরুদ্ধে।
এজাহারে বলা হয়, দালিলিক রেকর্ড ও অবৈধ ফিল্ড বুক তথা সৃজিত ফিল্ড বুক অনুযায়ী চেক প্রদান করে ফাইল নোট ছাড়াই চন্দ্রিমা হাউজিংকে ‘ক্ষতিগ্রস্ত’ দেখিয়ে ৪ ধারা হওয়ার পর পাওয়ার অব অ্যাটর্নি গ্রহীতাদের পুনরায় রোয়েদাদভুক্ত করে, ৪ ধারা ও ৭ ধারা গোপন করে চন্দ্রিমা হাউজিংয়ের জায়গাকে অধিগ্রহণের অংশ দেখিয়েছেন।
জননিরাপত্তা বিভাগের স্মারক নং-৪৪.০০.০০০০.০৯৮.০৭.০১৬-১৭-১৩, তারিখ: ০১/০১/২০১৮ এ আর.এস. ১৯৫০ নং খতিয়ানে দাগ নং-৮০০৪/৮৯২১ সুনির্দিষ্ট করা থাকলেও শামীম হুসাইন, জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন, এডিসি আশরাফুল আফসার পরস্পর যোগসাজশে চন্দ্রিমার ভুয়া পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দলিলে উক্ত দাগ ও খতিয়ান অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ দিয়ে টাকা উত্তোলন এবং আত্মসাৎ করেন। এ ক্ষেত্রে মো. শামীম হুসাইন ঘুষ নেন ৫০ লাখ টাকা। মো. শামীম হুসাইন গংদের বিরুদ্ধে গুরুতর দু’টি মামলার চার্জশিটই দুদকের বিবেচনাধীন রয়েছে।
কক্সবাজারে এডিসি শামীমের দুর্নীতির পার্টনার ছিলেন সার্ভেয়ার কেশব লাল দেব। অধিগ্রহণকৃত জমির ক্ষতিপূরণ থেকে কোটি কোটি টাকা কমিশন-ঘুষ নেয়ার অভিযোগে ২০২১ সালের ২৩ জানুয়ারি দুদকের টাস্কফোর্সের হাতে গ্রেফতার হন এ কেশব। চট্টগ্রাম নগরীর খুলশী থানার জাকির হোসেন সড়ক সংলগ্ন ওমরগণি এমইএস কলেজের সামনে থেকে তাকে গ্রেফতার করেন দুদকের চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-২ এর তৎকালীন উপ-সহকারী পরিচালক মো. শরীফ উদ্দিন।
সার্ভেয়ার কেশবের সঙ্গে গ্রেফতার হন ভূমি অফিসের চিহ্নিত শীর্ষ দালাল মুহিব উল্লাহ। ওই ঘটনায় জামিনে বেরিয়ে দিব্যি চাকরি করছেন কেশব লাল।
শুধু কেশব লাল নন-মাতারবাড়ি প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ দুর্নীতির সঙ্গে যে চক্রটি জড়িত ছিল, পুরো চক্রটিই এখন ঢাকা জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখায় বদলি হয়ে এসেছে। চক্রের অন্য সদস্যরা হলেন-আবদুল বারেক, মো. শাহীন এবং মুজিবুল হক। মুজিবুল রাজধানীর পূর্বাচল প্রকল্পের ৩০০ ফিট রাস্তার ভূমি অধিগ্রহণ খাতের ৪৪৬ কোটি টাকা আত্মসাৎ মামলায় একবার চাকরিচ্যুত হন।
মুজিবুল হক হচ্ছেন হাসিনা সরকারের প্রভাবশালী সচিব কবির বিন আনোয়ারের ঘনিষ্ঠজন। তার ভূমি সংক্রান্ত পরামর্শদাতা। তার পরামর্শেই কবির বিন আনোয়ার কক্সবাজারসহ দেশের পর্যটন এলাকায় ভূমিদস্যুতায় প্রভাব বিস্তার করেন। চাকরিহারা মুজিবুল চব্বিশের ৫ আগস্টের পর নিজেকে ‘নিগৃহীত’ ও ‘বঞ্চিত’ সাজিয়ে চাকরিতে পুনর্বহাল হন। এখন এডিসি শামীম হুসাইনের নেতৃত্বে গড়ে তোলা কেশব লাল দেব, আবদুল বারেক, মো. শাহীন মিয়া এবং মুজিবুল সিন্ডিকেট এখন ঢাকা ডিসির অধিগ্রহণ শাখার সর্বেসর্বা।
অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট সূত্রটি জানায়, বর্তমান সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী কক্সবাজার ডিসি অফিসের পুরো জালিয়াত চক্রটিকে ঢাকায় নিয়ে এসেছেন বিশেষ উদ্দেশে। ওই মন্ত্রীর ক্ষমতায় তারা ঢাকা ডিসি অফিসে ক্ষমতায়িত। যে কারণে ফ্যাসিস্ট আমলে দুর্নীতি মামলার আসামিরা এখন সাফ-ছুতরো হয়ে ঢাকায় চাকরি করছেন দোর্দণ্ড প্রতাপে। প্রভাবশালী মন্ত্রীর দোহাই দিয়ে চরায় দুর্নীতিবাজ চক্রটির বিরুদ্ধে ঢাকা ডিসি অফিসে কথা বলার কেউ নেই।
এদিকে অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে যোগাযোগ করা হয় মো. শামীম হুসাইনের সঙ্গে। ফোন করলে অপরপ্রান্ত থেকে জানানো হয়, তার হাত মচকে গেছে। এখন তিনি এভারকেয়ার হসপিটালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
দুদকের গ্রেফতার এবং ঢাকা ডিসি অফিসের এল.এ. শাখা-৩ এ ভুক্তভোগীদের হয়রানি এবং ঘুষ-দুর্নীতির বিষয়ে জানতে মঙ্গলবার (০৮ সেপ্টেম্বর) যোগাযোগ করা হয় সার্ভেয়ার কেশব লাল দেবের সঙ্গে। তাকে ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এসএমএস পাঠালেও এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
একই বিষয়ে কথা বলতে যোগাযোগ করা হয় ঢাকার জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমের সঙ্গে। তাকে একাধিকবার কল করা হলেও রিসিভ করেননি। এসএমএস পাঠালেও মেলেনি কোনো সাড়া।
আপন দেশ/এসএস
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।





































