Apan Desh | আপন দেশ

দুর্নীতির চূড়ায় কাজী ওয়াহিদুল এখনো রূপালী ব্যাংকের এমডি

বিশেষ প্রতিবেদক, আপন দেশ 

প্রকাশিত: ১১:৩৫, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আপডেট: ১৩:২৬, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দুর্নীতির চূড়ায় কাজী ওয়াহিদুল এখনো রূপালী ব্যাংকের এমডি

ছবি: আপন দেশ

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে যখন একের পর এক পরিবর্তন আনা হচ্ছে, তখন রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) কাজী মো. ওয়াহিদুল ইসলাম এখনো বহাল। বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের এ নেতার বিরুদ্ধে ঋণ জালিয়াতির অভিযোগের প্রমাণও পেয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আর জালিয়াতির প্রতিবাদ করায় কর্মকর্তাদের তাৎক্ষণিক বদলির ঘটনাও তার হাতেই।

রাষ্ট্রায়ত্ত শীর্ষ ছয় ব্যাংকের মধ্যে অগ্রণী ব্যাংক, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড (বিডিবিএল) ও বেসিক ব্যাংকের এমডিদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সরকারি সিদ্ধান্তটি ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদকে গত ১ সেপ্টেম্বর জানানো হয়।

তিন এমডির চুক্তি বাতিলের পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক ও বিডিবিএলসহ বিভিন্ন ব্যাংক থেকে পরিচালক সরিয়ে নতুন পরিচালক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে নতুন ব্যবস্থাপনায় আনার একটি স্পষ্ট উদ্যোগ চলছে। কিন্তু এ পরিবর্তনের মধ্যেও বহাল রয়েছেন বহু অভিযোগের তীরবিদ্ধ কাজী ওয়াহিদুল ইসলাম। এখানেই প্রশ্ন- একই রাজনৈতিক পরিচয় ও সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে অন্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হলে কাজী ওয়াহিদুল ইসলামের ক্ষেত্রে কেন ব্যতিক্রম?

বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজী ওয়াহিদুল

প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী, ২০২১ সালের ১১ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের রূপালী ব্যাংক শাখার অনুমোদিত কমিটিতে কাজী ওয়াহিদুল ইসলাম সিনিয়র সহসভাপতি ছিলেন। ওই কমিটির সভাপতি ছিলেন প্রকৌশলী শচীন্দ্র নাথ সমাদ্দার এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলেন প্রকৌশলী তালুকদার মো. সুলতান মাহমুদ। কেন্দ্রীয় কমিটির অনুমোদনের কথাও নথিতে রয়েছে। অর্থাৎ, শেখ হাসিনা সরকারের শামসন আমলে একটি রাজনৈতিকভাবে পরিচিত প্রকৌশলী সংগঠনের রূপালী ব্যাংক শাখায় তার গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক পদে থাকার তথ্য রয়েছে।

২০২৪ সালে অন্তর্বতীকালিন সরকারের সরময় কাজী ওয়াহিদুল ইসলামকে রূপালী ব্যাংকের এমডি নিয়োগের সময় এ পরিচয় নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের সামনে ছিল। তারপরও নিয়োগ পাবার নেপথ্যে ৭ কোটি টাকা লেনদেনের কথা চাউর ছিল ব্যাংকখাতজুড়ে। রূপালী ব্যাংক ও অর্থমন্ত্রণালয়ের দুই সোর্স এ প্রতিবেদককে তাদের দেয়া তথ্য সঠিক দাবি করেন। বলেন, ৭ কোটি টাকার রফা হয়েছিল তৎকালী একজন উপদেষ্টার সঙ্গে যিনি গণআন্দোলনের মাস্টারমাইন্ডখ্যাত। অর্থমন্ত্রণালয়ে পত্র জারিকালে ৪ কোটি এবং সময়বিধিমতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পত্র জারির পর ৩ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। যে টাকার যোগান দিয়েছে দুটি প্রতিষ্ঠান। কাজী ওহিদুল দায়িত্বে বসার পর তাদের অনৈতিক সুবিধাও দেয়া হয়েছে। যা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

একই দোষে অন্যদের শাস্তি, কাজী ওয়াহিদুলের পুরস্কার?

পুলিশ প্রশাসন, বিচারক, গণমাধ্যমকর্মী, আমলাসহ বিভিন্ন সেক্টরের কর্মকর্তাদের অবসরে পাঠানো, বদলি এবং ওএসডি করার তথ্য রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদসহ আওয়ামী লীগের রাজনীতি সংশ্লিষ্টতা এবং গণঅভূত্থানে অর্থযোগানদাতার অভিযোগ আনা হয়েছে। চাকরি ছেড়ে পালিয়েছে অনেকেই।

আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠনের কমিটিতে নাম থাকার দায় নিয়ে এবি ব্যাংকের তৎকালীন এমডি তারিক আফজাল বিদেশ পাড়ি দিয়েছেন। পদত্যাগপত্র দিয়েছেন সেখান থেকেই। একই ব্যাংকের কর্মকর্তা মোহরের বিরুদ্ধে হয়েছিল হত্যা মামলা। তিনিও পদত্যাগপত্র দিয়েছিলেন। তাহলে একই সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা কাজী ওয়াহিদুল ইসলামের ক্ষেত্রে কী হয়েছে?

আরও পড়ুন<> ঋণ জালিয়াতির ব্যবস্থা নিতে বলছে বাংলাদেশ ব্যাংক<> রূপালী ব্যাংকের এমডির বিরুদ্ধে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা তসরুফের প্রমাণ

তিনি ২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর রূপালী ব্যাংকের এমডি হিসেবে দায়িত্ব নেন। রূপালী ব্যাংকের নিজস্ব তথ্যেও তার নিয়োগের তারিখ নিশ্চিত করা হয়েছে। অর্থাৎ, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা চললেও তিনি রূপালী ব্যাংকের শীর্ষ পদে বহাল রয়েছেন। রাজনৈতিক পরিচয়ের ক্ষেত্রে কাজী ওয়াহিদুলের জন্য কি আলাদা কোনো নিয়ম প্রযোজ্য? অথচ শেখ হাসিনার ছবিযুক্ত ম্যাগাজিনে কবিতা লেখার দায়ে নিয়োগের পর বাদ দেয়া হয়েছে আব্দুর রহিম নামের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাকে। যে কবিতায় শেখ হাসিনা বা তার দলের বন্দনায় কোনো শব্দও ছিল না। পরে প্রকাশ পেয়েছে যে, সবই ঘটানো হয়েছিল কাজী ওহিদুল ইসলামকে ঘিরে।

‘কমিটিতে ছিলেন না’ পত্রটি নিয়েও প্রশ্ন

বিতর্ক আরও গভীর হয়েছে একটি কথিত পত্রকে ঘিরে। প্রাপ্ত নথিতে বলা হয়েছে, কাজী ওয়াহিদুল ইসলাম মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখায় এমন একটি পত্র দাখিল করেছিলেন, যেখানে তিনি বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের কমিটিতে ছিলেন না বলে দাবি করা হয়। পত্রটিতে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের স্বাক্ষর ছিল বলেও উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু একই নথিতে ২০২১ সালের অনুমোদিত কমিটিতে তার নাম রয়েছে সিনিয়র সহসভাপতি হিসেবে। তিনি যদি কমিটিতে না থাকেন, অনুমোদিত কমিটিতে তার নাম এলো কীভাবে? আর যদি থাকেন, তাহলে পরে ‘ছিলেন না’ মর্মে পত্র কেন?

আরও পড়ুন<> বেনামি প্রতিষ্ঠানের আড়ালে মোরশেদ আলমের শত শত কোটি টাকা পাচার

বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী মো. নুরুজ্জামান আপন দেশ’কে জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সাংগঠনিক কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও কেন্দ্রীয় কমিটি বহাল ছিল। ফলে ওই পত্রের সত্যতা ও সাংগঠনিক বৈধতা তদন্তের দাবি রাখে। প্রমাণ ওই কমিটির সভাপতি প্রকৌশলী শচীন্দ্র নাথ সমাদ্দার।

১ সেপ্টেম্বরের পর ওয়াহিদুলকে নিয়ে বড় প্রশ্ন

অগ্রণী, বিডিবিএল ও বেসিক ব্যাংকের এমডিদের চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্তের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে- রূপালী ব্যাংকের এমডি কাজী ওয়াহিদুল ইসলামের চুক্তি কেন বাতিল করা হলো না? এটি এখন শুধু একটি ব্যাংকের এমডির বিষয় নয়। অন্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে একই অভিযোগে নেয়া প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠবে।

অনিয়মের প্রতিবাদসহ এমডির পদত্যাগ দাবি করায় কর্মকর্তাদের বদলি করেন কাজী ওয়াহিদুল। ছবি: সংগৃহীত

সরকারের ভেতরে কার ছায়া?

ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আমলে ‘ছায়া’ দেবার কথা যেমন চাউর ছিল, বিএনপি সরকার আমলে সেই একই ধরনের কথা নতুন করে সামনে এসেছে। স্বৈরাচারের দোসর কাজী ওয়াহিদুল ইসলামকে কি সরকারের কোনো প্রভাবশালী মহল ছায়া দিচ্ছে? কারণ, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে যখন শীর্ষ পর্যায়ে পরিবর্তন হচ্ছে, এমডিদের চুক্তি বাতিল হচ্ছে এবং পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হচ্ছে, তখন তার মতো বিতর্কিত রাজনৈতিক-সাংগঠনিক পরিচয়ের অভিযোগ থাকা একজন কর্মকর্তা কেন একইভাবে বহাল থাকবেন। এর ব্যাখ্যা সরকারের কাছ থেকেই আসা উচিত। এ ‘ছায়া-আশ্রয়’-এর অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নিয়োগের ফাইল, রাজনৈতিক পরিচয় যাচাইয়ের নথি এবং তার কথিত প্রত্যয়নপত্র পরীক্ষাসহ গোয়েন্দা সংস্থাকে কাজে লাগানো জরুরি।

আরও পড়ুন<> দুদকের মামলার আসামি হয়েও আইএফআইসি ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মনসুর

অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে কাজী ওয়াহিদুল ইসলামের মোবাইলে ০১৯২***** ১৬ নম্বরে কল করা হলে তিনি সাড়া দেননি। এজন্য তার মতামত বা ব্যাখ্যা প্রকাশ করা সম্ভব গেল না। তবে পরবর্তীতে পাওয়া গেলে তা প্রকাশ করা হবে।

আপন দেশ/এবি

মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়