মোহাম্মদ নুরে আলম ও সারে আলম। ফাইল ছবি
দুর্নীতির অভিযোগে শতকোটি টাকার সম্পদের অনুসন্ধান চেয়ে আবেদনটি দুদকে জমা পড়েছিল ২০২৩ সালে। অভিযোগপত্রটি আমলেই নেয়নি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। পুলিশ কর্মকর্তা নুরে আলম ও তার ভাই সারে আলমের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ গড়িয়েছিল সংবাদে। দুদকের অবস্থান নিয়ে রিট আবেদন হয় উচ্চ আদালতে।
দুই বিচারপতির বেঞ্চ তিন মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ দেন দুদককে। ২০২৪ সালের ১৭ জানুয়ারির এ নির্দেশের পর কেটে গেছে দুই বছর নয় মাস। ফাইলটি যেখানে পড়েছিল সেখানেই আছে। প্রশ্ন উঠেছে দুদকের ক্যালেন্ডারে কতো বছরে তিন মাস হয়? অদৃশ্য শক্তির ছায়ায় ফাইলবন্দি রয়েছে তদন্তটি। স্পষ্টতই আদালতের নির্দেশ অমান্য করছে দুদক।
দুই পুলিশ সহোদরের উত্থান যেভাবে:
পিতার চারচালা টিনের ঘর দু’পাশ ঠেলে উঠেছে ডুপ্লেক্স আলিশান বাড়ি। সম্পদ বেড়েছে বিদ্যুৎ গতিতে। অর্থে অঙ্ক ছাড়িয়েছে দেড়শ’ কোটি। আটপৌরে বয়ষ্ক গৃহিনী মাতাও হয়ে গেছেন পুরোদস্তুর ‘ব্যবসায়ী’। ভাইদের হাতের কব্জিতে শোভা পাচ্ছে স্বর্ণের মোটা ব্রেসলেট। সড়কের দু’ধারে ধূলা উড়িয়ে পৎ পৎ করে চলে তাদের গাড়ি। সামনে-পেছনে ডজনখানেক মটরসাইকেলের বহর। এ বিত্ত-বৈভব এনে দিয়েছে রাষ্ট্রীয় ইউনিফর্ম। জামাতাদের উছিলায় সম্পদ বেড়েছে শ্বশুরকুলেও।
এটি কোনো জমিদার পরিবারের বর্ণনা নয়। দরিদ্র পিতার সন্তান নূরে আলম এবং সারে আলম। তারা ব্রাহ্মণবাড়িয়া আশুগঞ্জ দুর্গাপুর ইউনিয়নের সোহাগপুর (নাকরপাড়া) গ্রামের বাসিন্দা। পিতার নাম মো: আক্তারুজ্জামান, মাতার নাম মা লুৎফা বেগম। মো: নূরে আলম (বিপি নং-৭৭০৬১১৯৭৮৭) এখন সীমান্তবর্তী জয়পুরহাটের পুলিশ সুপার (এসপি)। সহোদর মো: সারে আলম (বিপি নং-৭৮০৩০১০৮১৭) পুলিশের এসআই (সার্জেন্ট) হিসেবে নিয়োগ লাভ করে এখন পুলিশের ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এ কর্মরত। মা লুৎফা বেগম সাধারণ একজন গৃহিনী।
আরও পড়ুন<><> সেই সহোদর পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ
পিতার অর্থ-বিত্ত বলতে তেমন কিছুই ছিল না। কিন্তু দুই ভাই পুলিশের চাকরি পাবার পরই বিদ্যুৎ গতিতে বাড়তে থাকে তাদের অর্থ-বিত্ত। পৈত্রিক ভিটায় তুলেছেন আলীশান ডুপ্লেক্স বাড়ি। নামে-বেনামে কিনছেন অজস্র সম্পত্তি। কম করে হলেও দেড় শ’ কোটি টাকার সম্পদের মালিক তারা। তাদের দুর্নীতিলব্ধ এসব বিষয় সম্পত্তির বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে ২০২৩ সালের ১৮ এপ্রিল ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার সোহাগপুর গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা হাজী খুরশেদ আলম দুদকের চেয়ারম্যান বরাবর অভিযোগ দেয়। কিন্তু স্বজাতি বলে কথা। দুই সহোদরের বিরুদ্ধে দায়ের কথা অভিযোগটি শোভাপায় দুদকের অপেক্ষমান আলমিরাতেই।
এদিকে অভিযোগ পেয়ে আপন দেশ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে ২০২৩ সালের ৬ আগস্ট। নুরে আলম-সারে আলমের বিরুদ্ধে উঠে আগে ভয়ঙ্করচিত্র। আপন দেশ-এর আলোচিত প্রতিবেদন পড়তে ক্লিক করুন এখানে
এদিকে ওই দুই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তদন্ত না করায় সংক্ষুব্ধ হয়ে আবেদনকারী খুরশেদ আলম হাইকোর্টে রিট করেন। ২০২৪ সালের ১৭ জানুয়ারি বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি কাজী ইবাদত হোসেনের হাইকোর্ট বেঞ্চ দুদককে তিন মাসের মধ্যে আবেদনটি নিষ্পত্তির নির্দেশ দেন। আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার অনীক আর হক ও ব্যারিস্টার মেহেদী হাসান। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সাইফুদ্দিন খালেদ। ওই সময় নূরে আলম জয়পুর হাটে পুলিশ সুপার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। আর তার সহোদর সারে আলম ঢাকা মেট্রোপলিটনের পিবিআইতে কর্মরত ছিলেন।
নির্দেশনার পর নড়েচড়ে দুদক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহর কমিশন। তড়িগড়ি সভা করে শুধুমাত্র মো. মেহেদী মুসা জেবিন নামের একজন সহকারী পরিচালককে তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছেন। সে-ই থেকে চলছে ২বছর ৯মাস। সোমবার (১২ অক্টোবর) খোঁজ নিয়ে জানা গেছে ফাইলটি আছে আগের মতোই- অনুসন্ধানাধীন।
৬৪-এর মধ্যে ১০ জেলায় ছিল নূরে আলমের বিচরণ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি বিভাগে অনার্স এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন নুরে আলম। ২৫তম বিসিএস পুলিশ সার্ভিসের মাধ্যমে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) পদে নিয়োগ লাভ করেন। ১/১১এর পর হয়ে উঠেন দুর্দান্ত দাপুটে পুলিশ কর্মকর্তা। উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিবি) গাজীপুর মেট্রোপলিটনের পর পুলিশ সুপার হয়েছিলেন জয়পুরহাট জেলার। এর আগে সহকারী পুলিশ সুপার হিসেবে সদর সার্কেল রাঙ্গামাটি, কলাপাড়া সার্কেল পটুয়াখালী, শিবালয় সার্কেল মানিকগঞ্জ, সহকারী পুলিশ কমিশনার হিসেবে চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটন পুলিশ, অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার হিসেবে সিলেট মেট্টোপলিটন পুলিশ, কমান্ডার হিসেবে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে ময়মনসিংহ ও নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশে দায়িত্ব পালন করেন। পুরো সময়টা ছিল শেখ হাসিনার শামসন আমল।
এখন কোথায় সেই নূরের আলমরা?
উত্তবঙ্গখ্যাত জয়পুরহাটের বৈধ-অবৈধ ব্যবসায়িদের কাছে পৃথকভাবে পরিচিত এ পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নুরে আলম। শেখ হাসিনার জমানায় অন্য পুলিশসুপারদের চেয়ে একধাপ এগিয়ে ছিলেন তিনি। ডিএমপিতে সেই হাবিবুর রহমান যেমন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের কাছে ‘ত্রাণকর্তা’ ছিলেন, ঠিক তেমনই জয়পুর হাটের ধনীকদের জন্য জম হলেও গরীবদের জন্য নুরে আলম ছিলেন ঢাকার হাবিবুর রহমান। স্বৈরচার সরকারের সকল কর্মের সঙ্গে আষ্টেপিষ্টে লেগে হিষ্টপুষ্ট হয়ে উঠেন দুই পুলিশ সহোদর। শেখ হাসিনার তাবেদার পুলিশরা আইনের আওতায়। হাবিবুর রহমানের মৃত্যুদণ্ডাদেরশ দিয়েছে আদালত।
২০২৪ সালের গণঅভূত্থানের পর নুরে আলমকে ঢাকায় বদলি করা হয় সিটি-রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার হিসেবে। ২০২৬ সালের ৩০ আগস্ট তাকে ট্রাফিক-ওয়ারী বিভাগের ডিসি হিসেবে পদায়ন করা হয়। এখন বহাল আছেন রাজধানীরে প্রাণকেন্দ্রেই।
আপন দেশ/এবি
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।





































