Apan Desh | আপন দেশ

এআই: শেখানোর নামে ক্ষতি করছে না তো? 

আপন দেশ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৬:০২, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

এআই: শেখানোর নামে ক্ষতি করছে না তো? 

ছবি: সংগৃহীত

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) কী? সহজভাবে বলতে গেলে, এটি এমন এক ধরনের মানবসৃষ্ট চিন্তাশীল কম্পিউটার প্রোগ্রাম, যা নিজে নিজে বিভিন্ন বিষয়ে শিখতে পারে। আমাদের চারপাশে বিদ্যমান তথ্য ও উপাত্ত বিশ্লেষণ করে মানুষের প্রশ্নের উত্তর দিতে সক্ষম হয়। একে এক ধরনের ‘কৃত্রিম মস্তিষ্ক’ বললেও ভুল হয় না।

মানুষ যেভাবে অভিজ্ঞতা থেকে শেখে, যুক্তি দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়, ভাষা বোঝে বা ছবি চিনতে পারে— এআই মূলত সে কাজগুলোই কম্পিউটার প্রোগ্রাম বা মেশিনের মাধ্যমে সম্পন্ন করে। ধরুন, আপনি ছোটবেলায় বিভিন্ন পশুপাখি বা মানুষের ছবি দেখে শিখেছেন, কোনটি কুকুর আর কোনটি মানুষ। এআই-ও ঠিক সেভাবেই বিপুল তথ্য বিশ্লেষণ করে ক্রমাগত শিখে যাচ্ছে এবং মানুষের নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করছে।

এআই-এর এ শেখার প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘মেশিন লার্নিং’। আর যখন এটি মানুষের মস্তিষ্কের মতো জটিল বিষয় বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হয়, তখন তাকে বলা হয় ‘ডিপ লার্নিং’। আজকের পৃথিবীতে মানুষের বহু কল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিচ্ছে এআই। কেউ একে বিজ্ঞানের ‘সর্বোচ্চ বিপ্লব’ হিসেবে দেখছেন। আবার কেউ মানবসভ্যতার জন্য ‘আসন্ন সংকট’ মনে করছেন। তবে এআই আজকের অবস্থানে পৌঁছাতে পাড়ি দিয়েছে দীর্ঘ পথ।

১৯৫০ সালে ইংরেজ গণিতবিদ অ্যালান টুরিং তার প্রবন্ধ Computing Machinery and Intelligence-এ প্রশ্ন তোলেন— ‘যন্ত্র কি চিন্তা করতে পারে?’ আপাতদৃষ্টিতে প্রশ্নটি প্রযুক্তিগত হলেও এর ভেতরে ছিল গভীর দার্শনিক ভাবনা। এ প্রশ্নের মধ্য দিয়েই মূলত এআই-এর ধারণার বীজ রোপিত হয়।

এর ছয় বছর পর, ১৯৫৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ডার্টমাউথ কলেজে অনুষ্ঠিত এক বৈজ্ঞানিক সভায় প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। এ সভাটিকেই এআই-এর জন্মমুহূর্ত হিসেবে ধরা হয়।

শুরুর দিকে এআই ছিল নিয়মভিত্তিক ‘যদি–তবে’ সূত্রে পরিচালিত সাধারণ প্রোগ্রাম। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিজ্ঞানীরা মানুষের মস্তিষ্কের আদলে ‘নিউরাল নেটওয়ার্ক’ ও ‘মেশিন লার্নিং’ প্রযুক্তি গড়ে তোলেন। প্রায় চার দশকের গবেষণার পর ২০১২ সালে ‘অ্যালেক্সনেট’ মডেলের সাফল্যের মধ্য দিয়ে ডিপ লার্নিং যুগের সূচনা হয়। এ পথ ধরেই আজকের চ্যাটজিপিটি, জেমিনি বা মিডজার্নির মতো এআই প্ল্যাটফর্মের বিকাশ।

এআই বাস্তবে আসার বহু আগে সাহিত্য ও শিল্পে মানুষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ধারণা কল্পনা করেছিল। ১৮১৮ সালে মেরি শেলির ফ্রাঙ্কেনস্টাইন উপন্যাসে মানুষসৃষ্ট প্রাণের যে ধারণা পাওয়া যায়, তা অনেকেই এআই-এর পূর্বাভাস হিসেবে দেখেন। চেক নাট্যকার কারেল চ্যাপেকের নাটক ‘রোসামস ইউনিভার্সাল রোবট’-এ প্রথম রোবটের ধারণা উঠে আসে। যেখানে শেষ পর্যন্ত রোবটরা মানুষের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে।

আধুনিক চলচ্চিত্র যেমন দ্য ম্যাট্রিক্স, এক্স মেশিনা বা আই রোবট -এ এআইকে ঘিরে প্রেম, ভয়, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও মানবিক আবেগের দ্বন্দ্ব তুলে ধরা হয়েছে।

আরও পড়ুন <<>> নতুন পৃথিবীর সন্ধান পেল বিজ্ঞানীরা

শিক্ষা, কৃষি, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি— প্রায় সব ক্ষেত্রেই এআই আজ মানুষের সহায়ক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। শিক্ষার্থীরা জটিল বিষয় সহজ ভাষায় জানতে পারছে, দুষ্প্রাপ্য তথ্য দ্রুত পাচ্ছে। চিকিৎসাক্ষেত্রে রোগ শনাক্তকরণ, স্ক্যান, ইমেজিং ও জটিল অস্ত্রোপচারে এআই ব্যবহৃত হচ্ছে।

কৃষিতে স্মার্ট সেন্সিং প্রযুক্তির মাধ্যমে ফসলের সঠিক সময়ে সেচ বা কীটনাশক প্রয়োগের পূর্বাভাস দেয়া সম্ভব হচ্ছে। পাশাপাশি চ্যাটজিপিটি, সোরা এআই বা মিডজার্নির মতো প্ল্যাটফর্ম মানুষের কল্পনাকে ছবি, লেখা বা ভিডিওতে রূপ দিচ্ছে। এভাবে এআই মানুষের এক ধরনের ‘দ্বিতীয় মস্তিষ্ক’ হয়ে উঠছে।

এআই কি মানুষকে কর্মহীন করবে?

এআই নিয়ে সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো চাকরির বাজারে মানুষের স্থান দখল করা। ব্যাংকিং, হিসাবরক্ষণ, সাংবাদিকতা, সফটওয়্যার উন্নয়নসহ নানা খাতে এআই দ্রুত কাজ করতে সক্ষম। তবে এআই মূলত বিদ্যমান তথ্যের ওপর নির্ভরশীল। নতুন সৃজনশীল চিন্তার ক্ষেত্রে মানুষের মতো স্বাধীনভাবে ভাবতে এখনও এটি সক্ষম নয়।

একই সঙ্গে ভুয়া ছবি, মিথ্যা তথ্য ও বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট তৈরিতে এআই-এর অপব্যবহার উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। তথ্যের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

মানবাধিকারের পরিপন্থী ব্যবহার ঠেকাতে ইউনেস্কো ২০২১ সালে ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নৈতিকতা’ বিষয়ক সুপারিশ প্রকাশ করে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও ঝুঁকিপূর্ণ এআই ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপের উদ্যোগ নিয়েছে। উদ্দেশ্য একটাই— প্রযুক্তি যেন মানবকল্যাণের পথে থাকে।

সমাজ, ক্ষমতা ও মানসিক সংকট

সমাজবিজ্ঞানীরা এআই-কে নতুন সামাজিক চুক্তি হিসেবে দেখছেন। ইউভাল নোয়া হারারির মতে, ভবিষ্যতে যারা ডেটা নিয়ন্ত্রণ করবে, তারাই ক্ষমতার নিয়ন্ত্রক হবে। একই সঙ্গে এআই মানুষের আবেগ ও আত্মপরিচয়ের ওপর প্রভাব ফেলছে। চ্যাটবটের সঙ্গে ভার্চুয়াল বন্ধুত্ব বা সম্পর্ক গড়ে উঠছে। মনোবিজ্ঞানীরা একে ‘ডিজিটাল নিঃসঙ্গতা’ বলছেন। অতিরিক্ত এআই নির্ভরতা মানুষের সৃজনশীলতাও কমিয়ে দিতে পারে।

এআই আঁকতে পারে, কবিতা লিখতে পারে, গান বানাতে পারে। তবু মানুষের সঙ্গে তার মৌলিক পার্থক্য রয়ে গেছে— অনুভূতি। মানুষের শিল্প, আবিষ্কার ও সৃজনশীলতার পেছনে থাকে আবেগ, সংগ্রাম ও অভিজ্ঞতা, যা এআই কখনো অনুভব করতে পারে না।

প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক, মানবিকতা, নৈতিকতা ও আবেগের জায়গায় মানুষ অনন্য। তাই এআই যুগে মানুষের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো নিজের মানবিক পরিচয়কে অক্ষুণ্ণ রাখা।

আপন দেশ/এসএস

মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়