ওপর থেকে-রানা প্রতাপ, মনি চক্রবর্তী, দিপু চন্দ্র দাস ও কাটা চুলের অংশ
ঝিনাইদহ, নরসিংদী, যশোর ও ময়মনসিংহ- দেশের ভিন্ন ভিন্ন প্রান্তে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক কয়েকটি নৃশংস ঘটনার দিকে তাকালেই প্রশ্নটি আরও তীব্র হয়ে ওঠে: সংখ্যালঘুরা কি সত্যিই আর নিরাপদ? একের পর এক সহিংসতা, হত্যা, নির্যাতন ও অপমানের ঘটনায় শুধু ব্যক্তি নয়, গোটা সংখ্যালঘু সম্প্রদায় আজ গভীর আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। এ ঘটনাগুলো দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পাশাপাশি বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলায় ঘটে যাওয়া ঘটনা মানবিকতা ও সামাজিক নিরাপত্তার চরম ব্যর্থতার উদাহরণ। এক সংখ্যালঘু নারীকে গণধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, নির্যাতনের পর অভিযুক্তরা তাকে গাছের সঙ্গে বেঁধে তার চুল কেটে দেয় এবং সে দৃশ্য ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। স্বামীহারা ওই নারী দীর্ঘদিন ধরে তার ১০ বছরের ছেলেকে নিয়ে একা বসবাস করছিলেন। শনিবার (০৩জানুয়ারি) রাতে গুরুতর আহত অবস্থায় স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন। চিকিৎসাধীন থাকার কারণে অভিযোগ দায়েরেও বিলম্ব হয়। পুলিশ একজনকে গ্রেফতার করলেও মূল অভিযুক্তরা এখনও পলাতক। এ ঘটনায় এলাকায় শুধু ক্ষোভ নয়, বিশেষ করে সংখ্যালঘু নারীদের মধ্যে চরম ভয় ছড়িয়ে পড়েছে।
আরও পড়ুন<<>> এবার মনি চক্রবর্তী নামের এক ব্যক্তি খুন
এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই নরসিংদীতে খুন হন হিন্দু ব্যবসায়ী মনি চক্রবর্তী। সোমবার (০৫ জানুয়ারি) রাত ১১টার দিকে পলাশ উপজেলার চরসিন্ধুর বাজার এলাকায় দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফেরার পথে দেশীয় অস্ত্রের আঘাতে প্রাণ হারান তিনি। স্থানীয়রা তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলেও চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। ৪০ বছর বয়সী এ মুদি ব্যবসায়ী দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় ব্যবসা করছিলেন। হত্যার কারণ তাৎক্ষণিকভাবে জানাতে পারেনি পুলিশ।
মনি চক্রবর্তীর হত্যাকাণ্ডটি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে কারণ এটি সাম্প্রতিক সময়ে নিহত তৃতীয় হিন্দু ব্যবসায়ীর ঘটনা। এর আগে ময়মনসিংহের ভালুকায় পোশাক শ্রমিক দিপু চন্দ্র দাসকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পরে তার মরদেহ গাছে বেঁধে পুড়িয়ে দেয়া হয়। এর মাত্র ১৩ দিনের মাথায় শরীয়তপুরে ব্যবসায়ী খোকন চন্দ্র দাসকে ছুরিকাঘাতের পর শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। তিন দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর তিনি মারা যান। এসব হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং সংখ্যালঘু নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলে।
যশোরেও পরিস্থিতি ভিন্ন নয়। মণিরামপুর উপজেলার কপালিয়া বাজারে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় ব্যবসায়ী রানা প্রতাপকে। সন্ধ্যার ব্যস্ত বাজারে সংঘটিত এ হত্যাকাণ্ড সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। এর আগেও যশোর শহরে রাজনৈতিক নেতা হত্যাসহ একাধিক সহিংস ঘটনার নজির রয়েছে। নির্বাচনের আগমুহূর্তে এ ধরনের সহিংসতা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
পরপর এসব ঘটনায় একটি বিষয় স্পষ্ট- সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি ক্রমেই গভীর হচ্ছে। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, প্রতিটি ঘটনা আলাদা হলেও সামগ্রিকভাবে এগুলো একটি ভয় ও অনিরাপত্তার পরিবেশ তৈরি করছে। অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে এ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
আরও পড়ুন<<>> ময়মনসিংহ হিন্দু যুবককে পিটিয়ে হত্যা, গ্রেফতার ৭
পুলিশ প্রশাসন প্রতিটি ঘটনায় তদন্ত ও গ্রেফতারের আশ্বাস দিলেও মাঠপর্যায়ে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর আস্থা এখনও ফিরছে না। তাদের অভিযোগ, ঘটনার পর প্রতিক্রিয়া দেখানো হলেও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা দুর্বল। স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি, দ্রুত বিচার এবং রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে শক্ত বার্তা না দিলে এ সহিংসতা বন্ধ হবে না।
আজ তাই প্রশ্নটা শুধু সংবাদ শিরোনামেই সীমাবদ্ধ নেই- সংখ্যালঘুরা কি আর নিরাপদ? এ প্রশ্নের জবাব রাষ্ট্র, প্রশাসন এবং সমাজকেই দিতে হবে। নইলে সংখ্যালঘুদের এ আতঙ্কই ধীরে ধীরে বাংলাদেশের নীরব কিন্তু গভীর সংকটে পরিণত হবে।
আপন দেশ/এবি
মন্তব্য করুন ।। খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত,আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।




































