ছবি : আপন দেশ
রাজধানীর সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে গ্যাসের জন্য দীর্ঘ সারি যেন এখন নিত্যদিনের চিত্র। ভোররাত থেকে স্টেশনের সামনে গাড়ির সারি, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও মিলছে সামান্য গ্যাস। কোথাও আবার গ্যাসের চাপ এত কম যে প্রয়োজনমত গ্যাস নিতে পারছেন না চালকেরা। কোনো কোনো স্টেশনে সরবরাহ বন্ধ থাকায় গাড়ি নিয়ে এক স্টেশন থেকে আরেক স্টেশনে ছুটছেন তারা।
এর মধ্যেই বুধবার (১৯ আগস্ট) বিকেল থেকে কক্সবাজারের মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। নতুন এলএনজি কার্গো না আসায় টার্মিনালের মজুত শেষ হয়ে যাওয়ায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ফলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ আরও কমেছে।
সপ্তাহের শেষ কর্মদিবস বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) রাজধানীর সিএনজি স্টেশনগুলোতে এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে। পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, গ্যাসের সংকট এখন শুধু জ্বালানি পাওয়ার সমস্যা নয়; এটি চালকদের আয়, যাত্রী পরিবহন, যানবাহনের চলাচল এবং নগর অর্থনীতিতেও চাপ তৈরি করছে।
মালিবাগ হাজীপাড়া সিএনজি ফুয়েলিং স্টেশন, বিশ্বরোডের শান্ত সিএনজি রি-ফুয়েলিং স্টেশন, আরকে মিশন রোডের এন.এস. সিএনজি ফিলিং অ্যান্ড সার্ভিসিং সেন্টার এবং মানিকনগরের বেস্ট ইস্টার্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশনসহ বিভিন্ন স্টেশনে দীর্ঘ যানবাহনের সারি দেখা যায়। কোথাও কোথাও গ্যাসের স্বল্পচাপের কারণে সীমিত পরিসরে সরবরাহ করা হচ্ছে। আবার কোনো কোনো স্টেশনে সাময়িকভাবে সরবরাহ বন্ধ রাখা হচ্ছে।
পাঁচ ঘণ্টা লাইনে, ২২০ টাকার গ্যাস
সিএনজি অটোরিকশাচালকদের দুর্ভোগের চিত্র পাওয়া গেছে মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতিতে। মেরুল বাড্ডার একটি ফিলিং স্টেশনে ষাটোর্ধ্ব চালক নরুল ইসলাম জানিয়েছিলেন, এক রাতে টানা পাঁচ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তিনি মাত্র ২২০ টাকার গ্যাস পেয়েছিলেন। সে গ্যাস দিয়ে পরদিন বিকেল পর্যন্ত গাড়ি চালাতে পেরেছেন।
দিনভর গাড়ি চালিয়ে তার আয় হয়েছিল ১ হাজার ৮০০ টাকা। এর মধ্যে মালিককে দিতে হয়েছে ১ হাজার ১৫০ টাকা। এরপর আবার গ্যাস কিনলে হাতে থাকছে আরও কম টাকা। নরুল ইসলামের ভাষ্য, আগে প্রতিদিন ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত হাতে থাকলেও সংকটের কারণে আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
আরেক চালক সাইফুলের অভিজ্ঞতাও একই। তিনি জানান, এক ঘণ্টা অপেক্ষার পর পাম্পে গ্যাস দেয়া শুরু হয়। গ্যাস শেষ হওয়ার আগেই স্টেশনের সামনে এলেও গ্যাস না দেয়া পর্যন্ত লাইনে অপেক্ষা করতে হয়। দীর্ঘ সময় লাইনে থাকার কারণে কখন বাসায় ফিরবেন, কখন খাবেন বা ঘুমাবেন—তারও ঠিক থাকে না।
চালকদের অভিযোগ, আয় কমলেও মালিকের দৈনিক জমার টাকা কমছে না। রাজধানীতে সিএনজি অটোরিকশার দৈনিক জমা সাধারণত ১ হাজার ১৫০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা এবং অর্ধবেলার জমা ৮০০ টাকা। গ্যাসের সংকটে ট্রিপ কমে গেলেও এ জমার চাপ চালকদের ওপরই থাকছে।
গ্যাসের পেছনেই যাচ্ছে কর্মঘণ্টা
সিএনজি চালকদের জন্য সংকটের সবচেয়ে বড় মূল্য হচ্ছে সময়। স্বাভাবিক সময়ে যে সময়টুকু যাত্রী পরিবহনে ব্যয় করার কথা, তার বড় অংশ এখন চলে যাচ্ছে ফিলিং স্টেশনের লাইনে।
রাজধানীর বিভিন্ন স্টেশনের সাম্প্রতিক চিত্রে দেখা গেছে, গ্যাসের চাপ কম থাকায় একটি গাড়িতে গ্যাস দিতে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি সময় লাগছে। এতে স্টেশনের সামনে সারি দীর্ঘ হচ্ছে এবং চালকদের দিনের বড় একটি অংশ অপেক্ষায় কাটছে।
এর প্রভাব পড়ছে যাত্রীদের ওপরও। গাড়ির সংখ্যা কমে যাওয়ায় অনেক এলাকায় যাত্রীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। সংকটের সময় কিছু চালক বেশি ভাড়া চাইছেন—এমন অভিযোগও এসেছে।
অর্থাৎ গ্যাস সংকটের একটি চক্র তৈরি হয়েছে—গ্যাসের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা, অপেক্ষার কারণে কম ট্রিপ, কম ট্রিপে কম আয়, আর কম যানবাহনের কারণে যাত্রীদের বাড়তি ভোগান্তি।
আরও পড়ুন<<>>আগস্টে আরও ৫ কার্গো এলএনজি কিনবে সরকার
সংকটের নতুন ধাক্কা এক্সিলারেট থেকে
গ্যাস সংকটের পেছনে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে এলএনজি সরবরাহে। মহেশখালীতে আমদানি করা এলএনজি রিগ্যাসিফাই করে জাতীয় গ্রিডে দেয়ার দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে—একটি এক্সিলারেট এনার্জির এবং অন্যটি সামিটের।
গত ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর সেটি বন্ধ হয়ে যায়। পরে টার্মিনালটি আংশিকভাবে চালু হলেও পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে পারেনি। একই সময়ে বৈরী আবহাওয়ার কারণে সামিটের টার্মিনাল থেকেও কিছু সময় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ ছিল। এতে জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহে বড় ঘাটতি তৈরি হয়।
গত ১৫ আগস্ট সামিটের টার্মিনাল পূর্ণ সক্ষমতায় এবং এক্সিলারেট আংশিকভাবে চালু হওয়ায় গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বেড়েছিল। কিন্তু নতুন এলএনজি কার্গো না আসায় এক্সিলারেটের মজুত কমতে থাকে। বুধবার বিকেল ৩টার দিকে সেখান থেকে সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
চাহিদার চেয়ে সরবরাহ অনেক কম
দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। এর বিপরীতে এত দিন প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছিল। এর মধ্যে এলএনজি থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ১০৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে।
এক্সিলারেটের সরবরাহ বন্ধ হওয়ার পর বুধবার জাতীয় গ্রিডে মোট গ্যাস সরবরাহ নেমে আসে প্রায় ২১৮ কোটি ঘনফুটে। এলএনজি থেকে সরবরাহও কমে প্রায় ৫৫ কোটি ঘনফুটে নেমেছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, আবাসিক গ্রাহক এবং সিএনজি স্টেশন—সব খাতেই চাপ তৈরি হয়েছে। এর আগে সংকটের সময় গ্যাসের ঘাটতিতে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ার তথ্যও এসেছে।
‘সরবরাহ ঠিক রাখার সব উদ্যোগ নেয়া হয়েছে’
সরকারি কর্তৃপক্ষ বলছে, সংকট মোকাবিলায় বিকল্প ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। পেট্রোবাংলার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান সাম্প্রতিক এক বক্তব্যে জানিয়েছিলেন, স্পট মার্কেট থেকে দ্রুত এলএনজি কিনে সরবরাহ ঠিক রাখার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
তবে এলএনজি কার্গো সময়মতো না আসায় সংকট পুরোপুরি কাটেনি। সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে কেনা কয়েকটি কার্গো আগস্টে আসার কথা থাকলেও সেগুলো সময়মতো না আসায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে বলে জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতও এর আগে জানিয়েছিলেন, গ্যাস সরবরাহের সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার কাজ করছে। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভরতা কমাতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে জোর দেয়া হচ্ছে।
আগস্টের শুরুতে প্রতিমন্ত্রী আরও জানিয়েছিলেন, ক্ষতিগ্রস্ত এলএনজি টার্মিনাল পুরো সক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে সাময়িকভাবে আবার বন্ধ রাখার প্রয়োজন হতে পারে। এতে কয়েক দিনের জন্য সংকট আরও বাড়ার আশঙ্কার কথাও তিনি জানিয়েছিলেন।
‘এখনই কাটছে না’ সংকট
সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নানা উদ্যোগের পরও বৃহস্পতিবারের বাস্তবতা বলছে, সিএনজি চালকদের দুর্ভোগ এখনো কাটেনি। বরং এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংকট নতুন করে তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
একটি এলএনজি কার্গো বৃহস্পতিবার সামিটের টার্মিনালে যুক্ত হওয়ার কথা থাকলেও এক্সিলারেটের জন্য নতুন কার্গো ২৩-২৪ আগস্টের দিকে আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ফলে আগামী কয়েক দিন এক্সিলারেটের সরবরাহ বন্ধ থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
এ অবস্থায় রাজধানীর সিএনজি চালকদের সামনে প্রশ্ন একটাই—কখন স্বাভাবিক হবে গ্যাস সরবরাহ? কারণ তাদের জন্য প্রতিটি ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানে একটি বা একাধিক ট্রিপ হারানো। আর প্রতিটি হারানো ট্রিপ মানে দিনের আয় থেকে আরও কিছু টাকা কমে যাওয়া। কিন্তু গাড়ির মালিকের জমা, পরিবারের খরচ ও অন্যান্য দৈনন্দিন ব্যয় কমছে না।
তাই গ্যাস সংকটের হিসাব শুধু জাতীয় গ্রিডে কত কোটি ঘনফুট গ্যাস কম সরবরাহ হলো—সে পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ নয়। রাজধানীর একটি সিএনজি স্টেশনের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা চালকের হারানো কর্মঘণ্টা, কমে যাওয়া আয় এবং যাত্রীর বাড়তি অপেক্ষার মধ্যেও এই সংকটের প্রকৃত মানবিক ও অর্থনৈতিক মূল্য প্রতিদিন দৃশ্যমান হচ্ছে।
আপন দেশ/মিম/জেডআই
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।





































