ফেরদৌস আহমেদ মিষ্টি (ওপরে), এ এম জহিরুদ্দিন খান (নীচে) ও তারেক রহমান। ফাইল ছবি: আপন দেশ
দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ, নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দুর্বৃত্তপনার অভিযোগ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির ঘটনায় কঠোর অবস্থানের বার্তা দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। অন্য দলীয় সন্ত্রাসীদের ধরবার আগে নিজ দলীয় নেতাদের লাগাম টানছেন।
ব্যর্থতার দায়ে ৩২ বছর আগে ১৯৯৫ সালে বিএনপির সরকারের মন্ত্রীকে পদত্যাগ করিয়েছেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। মায়ের মতোই কঠোরতার পরিচায় দিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সরকারের এমপি, বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর তিনি কঠোর হয়েছেন। সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে তিনি স্পষ্ট করতে চাইছেন, অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ প্রমাণিত হলে দলীয় পরিচয় কাউকে দায়মুক্তি দেবেন না।
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ, নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম কোনো এমপিকে পদত্যাগ করানো হলো।
এর আগে তার মা মরহুমা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ১৯৯৫ সালে। সার কারখানাগুলোর অব্যবস্থাপনা ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়া, ভুল রফতানি নীতি এবং দেশজুড়ে কৃষক নিহতের নৈতিক দায় ও প্রচণ্ড রাজনৈতিক চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত ৪ এপ্রিল, ১৯৯৫ সালে শিল্পমন্ত্রী এ এম জহিরুদ্দিন খান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো থেকে জানা যায়, সংকট মোকাবিলায় সম্পূর্ণ ব্যর্থতার কারণেই তাকে মন্ত্রিসভা থেকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল।
রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ দেয়ার খবর সামনে এসেছে। একই সঙ্গে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি ও যুবদলের কমিটি বিলুপ্তির ঘটনা দলীয় অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এসব পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে দলের অন্য নেতা-কর্মী এবং এমপিদেরও সতর্কবার্তা দেয়া হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাড্ডা সেন্টারে হামলা, মিষ্টির পদত্যাগ
গত ২৪ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাত ১২টার দিকে রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বরে রাড্ডা সেন্টারে হামলা চালায় দুই শতাধিক ব্যক্তি। দেশীয় অস্ত্র ও ভারী যন্ত্র নিয়ে হামলাকারীরা নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মি করে মূল্যবান চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ, টিকা ও নগদ টাকা লুট করে। পরে এক্সকাভেটর দিয়ে একটি পাকা ও তিনটি আধাপাকা ভবন গুঁড়িয়ে দেয়া হয়। ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থানে টাঙানো হয় ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর সাইনবোর্ড।
১৯৭৪ বা ১৯৭৬ সাল থেকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি মিরপুরের সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্ন আয়ের মানুষের প্রজনন স্বাস্থ্য, মা ও শিশুস্বাস্থ্য এবং টিকাদান সেবা দিয়ে আসছে।
আরও পড়ুন<> দুর্বৃত্তপনায় এমপি পদ হারালেন বিএনপির মিষ্টি
এ ঘটনায় রাড্ডার নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতার শাহ আলী থানায় মামলা করেন। পুলিশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছে। লুট হওয়া মালামাল উদ্ধারের কথা জানিয়েছে। দায়িত্ব পালনে গাফিলতি ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ভুল তথ্য দেয়ার অভিযোগে শাহ আলী থানার ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
মামলায় স্থানীয় বিএনপি নেতা হানফ মিয়াকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। এ ঘটনায় সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির সম্পৃক্ততা নিয়েও আলোচনা ও তদন্ত চলছে।
দলীয় সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, এ পরিস্থিতিতে তাকে এমপি পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। পদত্যাগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন মিষ্টি। তিনি পদত্যাগপত্রটি স্পীকারের কাছে জমা দিয়েছেন। স্পীকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবেন।
প্রতিমন্ত্রী আমিনুলের নেতৃত্বাধীন মহানগর উত্তর বিএনপির কমিটি বিলুপ্ত
মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশের কয়েক ঘণ্টা আগেই বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। ওই কমিটির আহবায়ক ছিলেন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। একই সঙ্গে বিলুপ্ত করা হয়েছে ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের কমিটিও।
দলীয় পর্যায়ে একের পর এক এমন সিদ্ধান্তের ফলে নেতা-কর্মীদের মধ্যে সাংগঠনিক জবাবদিহি নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। যদিও কমিটি বিলুপ্তির আনুষ্ঠানিক কারণ এবং রাড্ডা সেন্টারে হামলার ঘটনার সঙ্গে এর সরাসরি যোগসূত্র সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ঘটনাগুলোর সময়কাল রাজনৈতিক অঙ্গনে তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান
সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং দলীয় নেতাকর্মীদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখতে প্রথম থেকেই নেতা ও এমপিদের সতর্ক করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এমনটাই দলীয় সূত্রের বক্তব্য।
এর আগে চীন সফরের আগে আলোচিত এক প্রতিমন্ত্রীকেও সতর্কবার্তা দেয়ার কথা জানা গেছে। সব মিলিয়ে দলীয় পদ, এমপিপদ কিংবা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা উপেক্ষা করা হবে না- এমন বার্তাই সামনে আসছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, রাড্ডা সেন্টারে হামলার ঘটনায় তদন্তে যার বিরুদ্ধেই প্রমাণ পাওয়া যাবে, কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।
ঢাকা-১৪ সংসদীয় এ আসনে নির্বাচিত এমপি জামায়াত সমর্থিত ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম (আরমান)।
রাড্ডা সেন্টারে হামলার তদন্ত, মিষ্টির পদত্যাগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এবং দলীয় কমিটিগুলোর বিলুপ্তি- সব মিলিয়ে বিএনপির অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও জবাবদিহির প্রশ্নটি সামনে এসেছে। দলীয় পরিচয়কে অপরাধের দায় থেকে রক্ষাকবচ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না- এমন অবস্থান কার্যকর হলে তা দলের নেতা, এমপি ও তৃণমূলের কর্মীদের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারিত হবে তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।
অন্যদিকে ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই সীমিত পরিসরে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম চালু রাখা হয়েছে রাড্ডা সেন্টার।
আপন দেশ/এবি
মন্তব্য করুন ।। খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত,আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।





































