ফাইল ছবি, আপন দেশ
একযোগে দেশের ৩০ ব্যাংক প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও নিরাপত্তা বাড়াতে সিস্টেম উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ শুরু করেছে। এর ফলে ছয় দিন এসব ব্যাংকের কার্ড, এটিএম, পিওএসসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর সেবা বন্ধ বা সীমিত থাকবে। তবে এ বিষয়ে কিছু জানেনা বাংলাদেশ ব্যাংক।
এমন সময় এ পরিস্থিতি তৈরি হলো যখন বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে সাইবার নিরাপত্তা সচেতনতা মাস অক্টোবরের কর্মসূচি। ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা, অনলাইন প্রতারণা প্রতিরোধ এবং ডিজিটাল অবকাঠামোর নিরাপত্তা জোরদারে এ মাসে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংককে আগে থেকে না জানিয়ে এতগুলো ব্যাংক একসঙ্গে এমন সিদ্ধান্ত নেয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক অবকাঠামোর ক্ষেত্রে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে অবহিত করা প্রয়োজন।
দেশে ৬০টির বেশি ব্যাংক রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ৩০টি ব্যাংক প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও নিরাপত্তা বাড়াতে সিস্টেম উন্নয়ন এবং রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করছে। এর অংশ হিসেবে এসব ব্যাংকের কার্ড, এটিএম ও পিওএসসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর অনলাইন সেবা ৪ অক্টোবর রাত ৯টা থেকে ১০ অক্টোবর দুপুর ১২টা পর্যন্ত বন্ধ বা সীমিত থাকছে।
যেসব ব্যাংকের সেবা প্রভাবিত
প্রযুক্তিগত রক্ষণাবেক্ষণ ও সিস্টেম উন্নয়ন কার্যক্রমে থাকা ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে অগ্রণী ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, বেসিক ব্যাংক, ব্যাংক আলফালাহ বাংলাদেশ, কমিউনিটি ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, আইসিবি ইসলামী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, মেঘনা ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, মিডল্যান্ড ব্যাংক, মধুমতি ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক, এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, সীমান্ত ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, সাউথ বাংলা অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, উত্তরা ব্যাংক ও উরি ব্যাংক বাংলাদেশ।
কী জানিয়েছে ব্যাংকগুলো
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, ন্যাশনাল এসবিএসি, মধুমতি ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংক তাদের সিস্টেম রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের কারণে গ্রাহকদের কিছু সেবা সাময়িক বন্ধ থাকার বিষয়ে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। এ বিষয়ে অনেক ব্যাংক গ্রাহকদের মোবাইল ফোনে এসএমএসের মাধ্যমেও জানিয়েছে।
একটি ব্যাংকের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্কের সিস্টেম মাইগ্রেশনের কারণে ৪ অক্টোবর রাত ৯টা থেকে ১০ অক্টোবর দুপুর ১২টা পর্যন্ত ব্যাংকটির কয়েকটি কার্ড ও লেনদেন সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ থাকবে।
মধুমতি ব্যাংক জানিয়েছে, এ সময়ে সব ক্রেডিট, ডেবিট ও প্রিপেইড কার্ড, এটিএম, আইবিএফটি এবং কিউআর লেনদেন পরিষেবার কিছু অংশ সাময়িকভাবে বন্ধ থাকবে।
ব্যাংকটির ভাষ্য, উন্নত ও নিরাপদ ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করতে কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্কের সিস্টেম মাইগ্রেশন করা হচ্ছে। এ কারণে নির্ধারিত সময়ে ক্রেডিট ও প্রিপেইড কার্ডের লেনদেন বন্ধ থাকবে। একই সময়ে ওই নেটওয়ার্কের আওতাভুক্ত এটিএম, ক্যাশ রিসাইক্লিং মেশিন (সিআরএম) ও পয়েন্ট অব সেল (পিওএস) সেবাও ব্যবহার করা যাবে না।
তবে ডেবিট কার্ডের লেনদেন স্বাভাবিক থাকবে বলে জানিয়েছে মধুমতি ব্যাংক। এ ছাড়া অন্যান্য ব্যাংকের এটিএম ও পিওএস, বাংলা কিউআর এবং মানি অ্যাপের মাধ্যমে ট্যাপ, বিকাশ, নগদ ও উপায়ে ফান্ড ট্রান্সফার চালু থাকবে।
কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্কের আওতাভুক্ত নয় এমন অন্যান্য ব্যাংকে ফান্ড ট্রান্সফারও স্বাভাবিক থাকবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রযুক্তি নিরাপত্তা জোরদারেই এই পদক্ষেপ
ব্যাংক কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ব্যাংক খাতে ডিজিটাল লেনদেনের ব্যবহার দ্রুত বাড়ায় প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর সক্ষমতা ও নিরাপত্তা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। ফলে কোর ব্যাংকিং সিস্টেম, কার্ড নেটওয়ার্ক এবং অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়ন ব্যাংকিং কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে সাইবার হামলা, তথ্য চুরি, অনলাইন প্রতারণা ও ডিজিটাল আর্থিক অপরাধের ঝুঁকি বাড়ায় ব্যাংকগুলোর প্রযুক্তি অবকাঠামোকে নিয়মিত হালনাগাদ ও নিরাপদ রাখা জরুরি। বিশ্বব্যাপী অক্টোবর মাসে সাইবার নিরাপত্তা সচেতনতা মাস পালনের অন্যতম লক্ষ্যও হলো ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ডিজিটাল নিরাপত্তা জোরদারে সচেতন করা।
তবে প্রযুক্তি উন্নয়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি গ্রাহকদের জন্য সেবা বন্ধ রাখার সময়, পরিধি এবং বিকল্প ব্যবস্থা সম্পর্কে আগাম ও সমন্বিতভাবে জানানোও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
একসঙ্গে সেবা বন্ধে গভর্নরের ক্ষোভ
ব্যাংকের সিস্টেম উন্নয়ন বা নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের সময় কিছু সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা নতুন কোনো বিষয় নয়। প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর ধরন ও কাজের পরিধি অনুযায়ী কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিন পর্যন্ত কিছু সেবা সীমিত থাকতে পারে। নির্ধারিত কাজ শেষ হলে সেবাগুলো স্বাভাবিক নিয়মে চালু হয়।
তবে এবার একসঙ্গে দেশের ৩০টি ব্যাংকের বিভিন্ন সেবা বন্ধ থাকায় বড়সংখ্যক গ্রাহক ভোগান্তিতে পড়তে পারেন। একই সময়ে এতগুলো ব্যাংকের সেবা সীমিত রাখার সিদ্ধান্তের সমন্বয় ও কেন্দ্রীয় ব্যাংককে অবহিত করার বিষয়টি নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান সাংবাদিকদের বলেন, নিরাপদ ও আধুনিক ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করতে কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্কের সিস্টেম মাইগ্রেশনের কাজ চলছে। এর প্রভাবে আইটিসি তালিকাভুক্ত ৩০টি ব্যাংকের কিছু সেবা সাময়িক বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত ব্যাংকগুলো নিজেদের উদ্যোগে নিয়েছে। তিনি বলেন, বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংককে আগে থেকে জানানো হয়নি।
এতে গভর্নর ক্ষুব্ধ হয়েছেন জানিয়ে আরিফ হোসেন বলেন, বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ভালোভাবে নেননি। গুরুত্বপূর্ণ এ ধরনের সিদ্ধান্ত ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে এককভাবে নেয়াকে তিনি গর্হিত হিসেবে দেখছেন। এ ঘটনায় তিনি ক্ষুব্ধ হয়েছেন।
আপন দেশ/কেএম/এসআর
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।





































