ফাইল ছবি, আপন দেশ
গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার বেগম রাবেয়া আহমেদ উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক, দুই সহকারী শিক্ষক ও অফিস সহকারীর বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এছাড়াও তাদের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের বেতন, পরীক্ষার ফি, সেশন ফি, স্কুল প্রাঙ্গনে বালি ভরাটে অনিয়ম, খরচের ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি, শিক্ষক হয়রানি, এসএসসি পরিক্ষার ফরম পূরণে আর্থিক অব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নিকট গত ২৪ মে উপজেলার বেগম রাবেয়া আহমেদ উচ্চ বিদ্যালয়ের ছয় সহকারী শিক্ষক বিভিন্ন অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ এনে তদন্ত পূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি করেন। অভিযোগে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বিভাষ কুমার সাহা, ব্যবস্থাপনা কমিটির সাবেক অভিভাবক সদস্য ইকবাল হোসেন নিলু, সহকারী শিক্ষক শাহানাজ পারভীন ও মৃত্যুঞ্জয় দত্ত এবং অফিস সহকারী মানস কুমার গুনকে অভিযুক্ত করেন।
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতারণা করে রাষ্ট্রের লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে এ চক্র। চক্রের মূল হোতা ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বিভাষ কুমার সাহা ও অফিস সহকারী মানস কুমার গুন। গত দুই বছরে আনুমানিক আঠার থেকে বিশ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে চক্রটি। এলাকায় সাধারণের মুখে চাউর রয়েছে, পরিচালনা কমিটিও এধরনের অনিয়ম কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। এঘটনায় শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয়দের মধ্যে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।
সূত্র আরও জানায়, সুচতুর অফিস সহকারী মানস কুমারই প্রধান শিক্ষককে বিভিন্ন সময় কুপরামর্শ দিয়ে থাকেন। অনুসন্ধানে স্কুলের ইতিপূর্বের একাধিক রেজুলেশনে মানস কুমারের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পরিলক্ষিত হয়। স্বাক্ষর জাল ও নকল সিল তৈরিতে দক্ষ মানস কুমার। এক কথায় মানসই সকল অপকর্মের নাটের গুরু। তবে মানস কুমারকে এসকল বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তিনি সকল অভিযোগ অস্বীকার করেন।
আরও পড়ুন<<>>রাজশাহীতে শুরু হচ্ছে আন্তর্জাতিক জুনিয়র টেনিস আসর
বিদ্যালয়ের অনিয়মের ঘটনায় নথিপত্র যাচাই সাপেক্ষে প্রতিকার চেয়ে শিক্ষকদের আবেদনের প্রেক্ষিতে গত ০৯ জুন উপজেলা নির্বাহী অফিসার এটিএম কামরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত ৪ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমটি গঠন করা হয়। অ্যাকাডেমিক সুপারভাইজার জিনাত রেহানা শারমীনকে আহবায়ক ও উপজেলা সহকারী মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মোছাম্মৎ মাহমুদা বেগমকে সদস্য সচিব করা হয়। তিন বছরের আয়-ব্যয় সংক্রান্ত যাবতীয় হিসাব নিরীক্ষান্তে সরেজমিন পরিদর্শন পূর্বক আদেশের ৩০ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে দাখিলের কথা বলা হয়। কিন্তু পাঁচ মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পরেও অদৃশ্য কারনে তদন্ত কমিটি এখনো পর্যন্ত ইউএনও বরাবরে প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেনি।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, বিদ্যালয় প্রদত্ত শিক্ষকদের ২০২৫ ইং সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসের বেতন ভাতা ৩ লাখ ২১ হাজার ৬২০ টাকা নগদ হাতে হাতে প্রদান করে। তবে তার অনুকুলে ২০২৬ইং সালের ১৪ জানুয়ারী দুই মাসের সমপরিমান অর্থ ব্যাংক হতে চেকের মাধ্যমে উঠিয়ে নিয়া যায়। বিভিন্ন আর্থিক খাত দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ, বিদ্যালয়ের পূর্ব পাশে পুরাতন সীমানা প্রাচীর ও ভবনের মেরামত কাজ দেখিয়ে প্রতিষ্ঠানের টাকা নয়-ছয় করা, হিসাবের খরচে গড়মিল, ২০২৪ সালের বিদ্যালয় কর্তৃক দেয় ভাতা বিতরণী রেজিষ্ট্রার হতে রেভিনিউসহ স্বাক্ষরের পাতা ছিড়ে ফেলে আলামত নষ্ট করা, এক দোকান থেকে মালামাল ক্রয় করে অন্য দোকান থেকে ভাউচার দেখানো, ভাউচারে অতিরিক্ত খরচ দেখানো, একাধিকবার বিদ্যালয়ের অফিস কক্ষের তালা ভাঙ্গার ঘটনা ঘটলেও কোন আইনি ব্যবস্থা গ্রহন না করা, বর্তমান অ্যাডহক কমিটি গঠনে শিক্ষক প্রতিনিধি মনোনয়নের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের সম্মতির ব্যাপারে স্বাক্ষর গ্রহণে প্রতারণার আশ্রয় নেয়া, স্কুলের মাসিক খরচ নিয়মিত ভাবে সমন্বয় না করাসহ ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বিভাষ কুমার সাহাসহ উল্লেখিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ করা হয়েছে।
অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বিভাষ কুমার সাহা বলেন, তিনটি ব্যাংকের পাঁচটি হিসাবের মাধ্যমে স্কুলের সকল প্রকার লেনদেন পরিচালিত হয়। ২০১৮ সালের পরে এখন পর্যন্ত স্কুলের হিসাবের কোন অডিট হয়নি। একজনের স্বাক্ষরে কোন লেনদেন হয় না। স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির সম্মতি ও আমার যৌথ স্বাক্ষরে আর্থিক লেনদেন করা হয়ে থাকে। ২০২৪ সালের হিসাবের কিছু তথ্য দেখতে চাইলে তা তিনি দেখাতে পারেন নি। স্কুলের মেরামত ও উন্নয়ন কাজে ঠিকাদার ও মালামাল সরবরাহকারী নিয়োগে দরপত্র বা কোটেশনের বিষয়ে জানতে চাইলে তাৎক্ষনিক কোন কাগজপত্র দেখাতে পারেনি।
বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক মো. সিরাজুল ইসলাম কোন কারন উল্লেখ না করে প্রধান শিক্ষকের পদ থেকে গত ২৫ মার্চে সেচ্ছায় পদত্যাগ করেন। কিন্তু জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়কে প্রায় ১০ মাস পর ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের ২৪ তারিখে ঘোষণা পত্রের মাধ্যমে ইস্তফাদানের বিষয়টি অবগত করেন। ইস্তফা দেয়ার ১০ মাস পর কেন জেলা শিক্ষা অফিসকে লিখিত ভাবে জানান, তা এখনো অজানাই রয়ে গেল। প্রশ্ন থেকে যায়, সাবেক প্রধান শিক্ষক ইস্তফা দেয়ার পরেও ২০২৬ইং সালের ৩০ জুলাই পর্যন্ত কেন প্রধান শিক্ষকের পদটি শূণ্য ঘোষণা করে উক্ত পদের বিপরীতে চাহিদা দেয়া হয়নি? স্কুলের ব্যবস্থাপনা কমিটি ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের যোগসাজসে এধরনের ন্যাক্কারজনক গঠনাট ঘটেছে বলে প্রতিয়মান হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক বলেন, মাধ্যমিক শাখার এবারের অর্ধ-বার্ষিক পরীক্ষায় কাগজ ক্রয়, প্রশ্নপত্র সংগ্রহ ও ফটোকপি, স্কুলের তিনটি জানালার গ্রীল তৈরির খরচে গড়মিল রয়েছে। ২০২৪ সালের বিদ্যালয় কর্তৃক দেয়া ভাতা বিতরণী রেজিষ্ট্রার হতে রেভিনিউযুক্ত স্বাক্ষরের পাতা ছিড়ে ফেলে আলামত নষ্ট করার জন্য বর্তমান অ্যাডহক কমিটির সভাপতি কাউছার আহমেদ সরাসরি জড়িত রয়েছে বলে জানান।
অ্যাডহক কমিটির বর্তমান সভাপতি কাউছার আহমেদ বলেন, আমি প্রায় তিন মাস যাবৎ সভাপতির দায়িত্বে আছি। আমার দ্বারা কোনো অনিয়মের ঘটনা ঘটেনি। ২০২৪ সালের বিদ্যালয় কর্তৃক দেয়া ভাতা বিতরণী রেজিষ্ট্রার হতে রেভিনিউযুক্ত স্বাক্ষরের পাতা ছিড়ে ফেলার সঙ্গে আমার কোনরুপ সংশ্লিষ্টতা নেই। যেহেতু কর্তৃপক্ষ তদন্ত করছে তাই এ মূহুর্তে বিস্তারিত আর কিছু বলা সম্ভব নয়।
তদন্ত কমিটির প্রধান অ্যাকাডেমিক সুপারভাইজার জিনাত রেহানা শারমীন জানান, তদন্তকারী দল চার বার স্কুল ভিজিট করেছে। তদন্ত চলমান রয়েছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই সাপেক্ষে কর্তৃপক্ষের নিকট শীঘ্রই তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।
রাবেয়া স্কুলের বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার এটিএম কামরুল ইসলাম প্রতিবেদককে বলেন, স্কুলের শিক্ষকদের আবেদনের প্রেক্ষিতে চার সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রতিবেদন হাতে পেলেই দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হবে।
এ বিষয়ে গাজীপুর জেলা শিক্ষা অফিসার মো. আল মামুন তালুকদারকে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি রিসিভ করেন নি। পরে হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়ে কোন বক্তব্য পাওয়া যায় নি।
আপন দেশ/এসআর
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।





































