ছবি : আপন দেশ
‘নদী চর খাল বিল গজারির বন, টাঙ্গাইল শাড়ি তার গর্বের ধন’। সত্যিই কী গর্ব করার মতো নদী চর খাল বিল রয়েছে টাঙ্গাইলে? উত্তর, এক সময় ছিল। তবে বর্তমান আধুনিকতায় তা আজ বিলুপ্তির পথে।
এমনই একটি খালের কথা বলবো আজ। যে খাল টাঙ্গাইল শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতো। যার নাম ‘শ্যামা বাবুর খাল’।
শহরের প্যারাডাইস পাড়া খাদ্য গুদাম ঘেষে লৌহজং নদী থেকে উৎপত্তি হয়ে খালটির। তৎকালীন টাঙ্গাইল শহরকে উত্তর-দক্ষিণে ভাগ করে শহরের পূর্ব প্রান্তে বিল ঘারিন্দায় গিয়ে মিশেছিল।
বর্তমানে খালটির অধিকাংশ দখলে চলে গেছে। যার ওপর টাঙ্গাইল পৌরসভাসহ নানা প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ হয়েছে। ফলে বৃষ্টি হলেই শহরে দেখা দিচ্ছে জলাবদ্ধতা।
জানা যায়, শ্যামা বাবুর খালটি ছিল কৃত্রিমভাবে খনন করা একটি খাল। ১৯০০ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের রানি ভিক্টোরিয়ার সিংহাসন আরোহণের সম্মানে টাঙ্গাইল মহকুমার প্রধান সড়ক ভিক্টোরিয়া রোড তৈরির জন্য খালটি খন করা হয়। পরে ১৯৮৮ সালের প্রলয়ঙ্করী বন্যার পর ১৯৮৯ সালে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাংলাদেশের জন্য প্রণীত ফ্লাড অ্যাকশন প্ল্যানের অন্যতম উপাদান ছিল কম্পার্টমেন্টালাইজেশন পাইলট প্রজেক্ট( সিপিপি)।
এর মূল লক্ষ্য ছিল যমুনা নদীর প্লাবনভূমিতে ছোট-বড় ‘কম্পার্টমেন্ট’ বা বন্যানিয়ন্ত্রণ বেষ্টনী তৈরি করে স্থানীয় পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি ও মৎস্য চাষের উন্নয়ন এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মাধ্যমে বন্যা নিয়ন্ত্রণ করা। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের এ প্রকল্পের অংশ হিসেবে একসময়ের প্রমত্তা শ্যামা বাবুর খালকে ১৯৯৬ সালে ড্রেনে রূপান্তর করা হয়। এরপরই শুরু হয় খালের জায়গা দখলের পালা।
টাঙ্গাইল পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান জামিলুর রহমান মিরন শহরের ২০০৩ সালে প্রথম শওকত আলী তালুকদার পৌর সুপার মার্কেট বা ক্যাপসুল মার্কেট নির্মাণ করেন। এরপর পর্যায়ক্রমে শামছুল হক মার্কেট বা ভিক্টোরিয়া ফুডজোন, শামসুর রহমান খান পৌর মার্কেট, পৌর সুপার মার্কেট, পৌর সুপার মার্কেট-১, পৌর সুপার মার্কেট-২, পৌর সুপার মার্কেট-৩ নির্মাণ করেন পৌরসভায় নির্বাচিত বিভিন্ন চেয়ারম্যান ও মেয়র। এছাড়া সম্প্রতি ফায়ার সার্ভিস মার্কেট-১ ও মার্কেট-২ খালের জায়গা দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে।
খালের প্রবেশমুখ প্যারাডাইস পাড়া খাদ্য গুদামের কাছে খালের জায়গা দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে আল মাদরাসাতুল আরাবিয়্যাহ মার্কাস মাদ্রাসা। এর পূর্ব দিকে আরও গড়ে উঠেছে মুক্তিযোদ্ধা ভবন, প্যারাডাইস পাড়া পূজা মণ্ডপ, পার্ক বাজারের পাইকারি বাজার। খালের মাঝামাঝি, অর্থাৎ শহরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশে তৈরি হয়েছে হোটেল নিরালা, হোটেল কিছুক্ষণ, সিডিসি শপিং কমপ্লেক্স, সিডিসি ক্লাব, বই মার্কেটসহ আরও অনেক স্থাপনা।
আরও পড়ুন <<>> ছেলে হত্যার অভিযোগে বাবা গ্রেফতার
ফলে শহরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ভিক্টোরিয়া রোড সংকুচিত হয়ে পড়েছে। বর্তমানে যানবাহনের চাপে ভিক্টোরিয়া রোডে যান চলাচল প্রায় অচল।
আগে এ খালের মাধ্যমেই শহরের বৃষ্টির পানি লৌহজং নদী ও বিল ঘারিন্দায় গিয়ে পড়ত। খালটি দখলের পর বৃষ্টি হলেই টাঙ্গাইল শহরে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়।
দখলের বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে প্যারাডাইস পাড়ার সুবল গৌড় ও হারাধন শীল জানান, কয়েক যুগ আগে নৌকা যোগে লৌহজং নদী হয়ে শ্যামা বাবুর খাল দিয়ে শহরের নিরালা মোড়ে ব্যবসায়ীরা আসতেন। সে খালটি এখন ড্রেনে পরিণত হয়েছে। পচা পানির দুর্গন্ধে খালের পাশ দিয়ে হাঁটাচলাই দায়। অবিলম্বে খালটি উদ্ধারের জোর দাবি জানাচ্ছি।
টাঙ্গাইল সচেতন নাগরিক ফোরামের সভাপতি আকিবুর রহমান ইকবাল বলেন, আমরা যখন প্রাইমারি স্কুলের ছাত্র, তখন দেখেছি শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহমান খাল ছিল, যেটি শ্যামা বাবুর খাল নামে পরিচিত ছিল। তৎকালীন শহরের পণ্য পরিবহনের অন্যতম মাধ্যম ছিল এ শ্যামা বাবুর খাল। সরকারের একটি ভুল প্রকল্প খালটির মৃত্যু ঘটিয়েছে। বর্তমানে গন্ধময় নালায় পরিণত হয়েছে। টাঙ্গাইলের সচেতন নাগরিক ফোরামের পক্ষ থেকে অবিলম্বে খালটি উদ্ধারের জোর দাবি জানাচ্ছি।
টাঙ্গাইল জেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব মাহমুদুল হক সানু বলেন, খালটি কোনোভাবে উদ্ধার করা যায় কি না, সে বিষয়ে টাঙ্গাইল সদর আসনের এমপি ও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু ইতোমধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ডের একদল বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলছেন। আশা করা যায়, খুব দ্রুতই খালটি উদ্ধারের কার্যক্রম শুরু করা যাবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি বেলার বিভাগীয় কর্মকর্তা গৌতম চন্দ্র চন্দ জানান, খালের জায়গা দখল করে স্থাপনা নির্মাণ সম্পূর্ণ বেআইনি ও অবৈধ। নদী, খাল, বিল ও জলাশয় উদ্ধারে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা রয়েছে। এছাড়া হাইকোর্টের দিকনির্দেশনাও আছে। অবিলম্বে শ্যামা বাবুর খাল উদ্ধারে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান তিনি।
টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাইন উদ্দিন বলেন, টাঙ্গাইল সদরের ৭টি খাল বর্তমানে খনন প্রকল্পের আওতায় আনা হয়েছে, তার মধ্যে শহরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শ্যামা বাবুর খালও রয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব খালটি দখলমুক্ত করে খননের কাজ শুরু করা হবে। এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করছে।
আপন দেশ/এসএস
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।





































