প্রকৌশলী এ.কে.এম আজাদ রহমান
সড়ক ও জনপথ অধিদফতর (সওজ)- জনগণের ট্যাক্সের টাকায় যেখানে মসৃণ ও টেকসই সড়ক হওয়ার কথা, সেখানে বছরের পর বছর ধরে নির্মিত হয়েছে কেবল হরিলুট আর সিন্ডিকেটের চারণভূমি।
আর এ পুরো অদৃশ্য মাফিয়া সাম্রাজ্যের মূল হোতা ও গডফাদার হিসেবে নাম এসেছে সওজের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এ.কে.এম আজাদ রহমানের। যিনি ১/১১-এর সময় টুথ কমিশনে নিজেকে চোর হিসেবে স্বীকার করেছেন।
সওজে দীর্ঘদিন ধরে অলিখিত নিয়মই হয়ে দাঁড়িয়েছিল- আজাদের সবুজ সংকেত কিংবা নির্দিষ্ট অঙ্কের ‘কমিশন’ ছাড়া ফাইলের একটি পাতাও নড়বে না। টেন্ডার জালিয়াতি, ভুয়া ও অতিরিক্ত বিল পাস, বদলি-পদায়ন বাণিজ্য থেকে শুরু করে উন্নয়ন প্রকল্পের টাকা চুরির এমন কোনো খাত নেই, যেখানে এ প্রকৌশলীর একক আধিপত্যের বিষাক্ত থাবা পড়েনি।
প্রহসনের দরপত্র-শতকোটি টাকার ভুয়া বিল
আপন দেশ-এর অনুসন্ধানে জানা যায়, সওজের গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোতে মাঠপর্যায়ে বাস্তব কাজের অগ্রগতি কাগজের বাঘের মতো হলেও, অনুগত ঠিকাদারদের পকেটে গেছে শত শত কোটি টাকা। টাকার অঙ্কে কোটি কোটি টাকার অতিরিক্ত বিল পাশ করিয়ে নেয়া হয়েছে কোনো কাজ না করেই। রাস্তার স্থায়িত্ব কিংবা কাজের মান নিয়ে ভাবার কোনো ফুসরত ছিল না এ সিন্ডিকেটের; তাদের মূল লক্ষ্য ছিল একটাই- কার পকেটে কত শতাংশ কমিশন ঢুকবে, তার নিখুঁত হিসাব মেলানো।
আরও পড়ুন<> পাউবোর ডিজি স্বৈরাচারের ক্যাশিয়ার, নেপথ্যে বড় ডিল
সংশ্লিষ্টদের দাবি, সাধারণ ও সৎ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সওজের দরপত্র প্রক্রিয়া ছিল স্রেফ একটি সাজানো নাটক। নির্দিষ্ট কিছু তল্পিবাহক প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে পুরো দরপত্র প্রক্রিয়াকে সাজানো হতো আজাদের নিজস্ব ব্লুপ্রিন্ট অনুযায়ী। কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান সততা দেখাতে এলে তাকে ফাইল আটকে দেয়া, কালো তালিকাভুক্ত করার ভয় দেখানো কিংবা কমিশন না দিলে বছরের পর বছর বিল আটকে রেখে আর্থিকভাবে পঙ্গু করে দেয়ার মতো নোংরা কৌশল নেয়া হতো। সওজ ভবন যেন কোনো সরকারি দফতর নয়, বরং এক প্রকাশ্য ‘কমিশন মার্কেট’!
বদলি-পদায়ন বাণিজ্য
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সওজের একাধিক সিনিয়র কর্মকর্তা প্রতিবেদক’কে জানিয়েছেন, আজাদ রহমানের প্রভাব বলয় এতটাই ভয়ংকর ছিল যে, সেখানে কর্মকর্তাদের বদলি ও পদায়নকে রূপ দেয়া হয়েছিল ‘সোনার ডিম পাড়া হাঁসে’। কোন জেলা কার নিয়ন্ত্রণে যাবে? কার ভাগ্যে জুটবে মেগা প্রজেক্টের লাভজনক চেয়ার? কাকে ডাম্পিং স্টেশনে পাঠানো হবে?
সবকিছুই নির্ধারিত হতো আজাদের ড্রয়িংরুমে, সিন্ডিকেটের আর্থিক দেনদরবারের ওপর ভিত্তি করে। মেধা, জ্যেষ্ঠতা কিংবা সততা নয়, লাভজনক পদে বসার একমাত্র যোগ্যতা ছিল আজাদের প্রতি অন্ধ আনুগত্য এবং নিয়মিত মোটা অঙ্কের নজরানা পাঠানো।
টুথ কমিশন-দুর্নীতির সম্পদে
প্রশাসনের ভেতরে এ.কে.এম আজাদ রহমান এক ‘ফিনিক্স পাখি’ হিসেবে খ্যাত। দুর্নীতির অভিযোগ যত বাড়ে, ক্ষমতার করিডোরে তার ডানার বিস্তার যেন তত বিস্তৃত হয়। ২০০৭-০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের প্রেক্ষাপটে তিনি তৎকালীন ট্রুথ কমিশনের মুখোমুখি হন।
তৎকালীন সত্য ও জবাবদিহিতা কমিশনে হাজির হয়ে তিনি জয়দেবপুর থেকে দেবগ্রাম-ভুলতা-নয়াপুর বাজার হয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মদনপুর পর্যন্ত জাতীয় মহাসড়ক নির্মাণ (সংশোধিত) প্রকল্পে দায়িত্ব পালনকালে অতিরিক্ত বিল পরিশোধের মাধ্যমে সরকারের আর্থিক ক্ষতি বা চুরির বিষয় স্বীকার করেন। দুইটি গ্রুপের কাজে ২১ লাখ ১০ হাজার ৪৩৮ টাকা অতিরিক্ত বিল পরিশোধের কথা উল্লেখ করেছিলেন। পরে তিনি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ২ লাখ টাকা জমা দেন। প্রশাসনিক নথিতে এ তথ্য উল্লেখ রয়েছে।
সওজের প্রকৌশলী আজাদের খোঁজে সড়ক ভবনে গিয়ে জানতে চাইলে পাল্টা প্রশ্ন আসে কোন আজাদ? ১/১১-তে যিনি নিজেকে চোর স্বীকার করেছিল সেই আজাদ? অতীত না জানা ব্যক্তিরা প্রথমে হতভম্ব হন। পরে মুচকি হেসে খোঁজ দেন তিনি (টাঙ্গাইল্যার আজাদ) এলেনবাড়ীর জোনাল অফিসে বসেন।
আরও পড়ুন<> ইউনিফাইড টোল সিস্টেমে রেগনামের ডিজিটাল চুরি হাজার কোটি
দুর্নীতির অভিযোগে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ১৯৮৫-এর বিধি ৩ (বি) ও ৩ (ডি) অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা নম্বর ০২/২০১২ রুজু করা হয়। তবে মামলা চলাকালে তিনি হাইকোর্টে রিট পিটিশন নম্বর ৮১৬/২০১২ দায়ের করলে আদালত প্রাথমিকভাবে তিন মাসের জন্য কার্যক্রম স্থগিত করেন। পরে স্থগিতাদেশের মেয়াদ বাড়ানো হয়। সরকার বিষয়টি নিয়ে আইনি লড়াই চালিয়ে যায় এবং পূর্ণাঙ্গ শুনানির পর রিট নিষ্পত্তি হয়।
প্রশাসনিক সূত্র জানায়, পরবর্তীতে তিনি পুনরায় গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পান। আওয়ামী লীগ জমানায় সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে দীর্ঘদিন প্রশাসনিক নিরাপত্তা বলয়ে ছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এখন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের কাছের লোকবনে গেছেন।
সরকারি বেতনে চাকরি করে কীভাবে তিনি রাজধানীর অভিজাত এলাকায় একাধিক বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, বিঘার পর বিঘা জমি এবং নিজ গ্রামে রাজকীয় সম্পদের রাজত্ব গড়েছেন, তা নিয়ে সওজের ভেতরে-বাইরে কানাকানি অন্তহীন। কিন্তু এক অদৃশ্য খুঁটির জোরে এ বিপুল অবৈধ সম্পদের উৎস বরাবরই কুয়াশার আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে।
আজাদ রহমানের এ দুর্নীতির সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে ঢাল হিসেবে কাজ করেছে একদল সুবিধাভোগী ঠিকাদারের সমন্বয়ে গঠিত একটি লবি। অভিযোগ রয়েছে, যখনই আজাদের কোনো কুকীর্তি নিয়ে কোনো অনুসন্ধানী সাংবাদিক কাজ শুরু করতেন, অমনি সক্রিয় হয়ে উঠত এ দালাল চক্র।
পটপরিবর্তন ও পুনর্বাসনের শঙ্কা
পটপরিবর্তনের পর দেশবাসী যখন দুর্নীতির মূলোৎপাটনের স্বপ্ন দেখছে, তখন সওজের ভেতরে আজাদের সেই পুরনো সিন্ডিকেট আবার নতুন রূপে সক্রিয় হয়ে উঠছে। এ চক্রটি নতুন করে সওজকে নিজেদের জিম্মায় নেয়ার জন্য লবিং শুরু করেছে। এ নিয়ে সৎ কর্মকর্তাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
সওজের তৃণমূল থেকে শুরু করে নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের ভুক্তভোগীদের স্পষ্ট দাবি- স্রেফ বদলি বা সাময়িক বরখাস্তের মতো ঠুনকো আইওয়াশ দিয়ে এ গভীর শিকড়যুক্ত সিন্ডিকেট ভাঙা অসম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন স্বাধীন তদন্ত, সম্পদের ফরেনসিক অডিট এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান আইনি ব্যবস্থা। নইলে উন্নয়নের নামে লুটপাটের এ সংস্কৃতি একসময় পুরো যোগাযোগ ব্যবস্থাকেই ধ্বংস করবে।
অভিযুক্ত আজাদ রহমানের রহস্যজনক নীরবতা
সংবাদপত্রের নীতি অনুযায়ী প্রতিবেদনের বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রাখতে অভিযুক্ত প্রকৌশলী এ.কে.এম আজাদ রহমানের দফতরে লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হয়েছিল। মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে তিনি কোনো জবাব দেননি। দুর্নীতির এ গুরুতর অভিযোগগুলোর মুখে তার এমন রহস্যজনক নীরবতা ও এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা প্রকারান্তরে বিষয়টিকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।
প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে তার কাছে দরপত্র একচেটিয়াকরণ, প্রকল্পের ভুয়া বিল পাস, বদলি বাণিজ্য, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত কোটি কোটি টাকার সম্পদ এবং বিগত ২০০৭-০৮ সালের টাস্কফোর্সের তালিকাভুক্ত হওয়া প্রসঙ্গে সুনির্দিষ্ট ৬টি লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু তিনি কোনো লিখিত বক্তব্য দেননি। এমনকি তার ব্যক্তিগত মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি এবং খুদে বার্তারও কোনো উত্তর দেননি।
আপন দেশ/এবি
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।





































