Apan Desh | আপন দেশ

ইসলামে সমাজকল্যাণমূলক কাজের গুরুত্ব-ফযীলত

মুফতি এনায়েতুল্লাহ

প্রকাশিত: ১৪:৩৮, ১ জানুয়ারি ২০২৬

ইসলামে সমাজকল্যাণমূলক কাজের গুরুত্ব-ফযীলত

ছবি : আপন দেশ

সমাজ ও জনসমষ্টির সার্বিক মঙ্গল সাধনই হচ্ছে সমাজকল্যাণ। ‘মানুষ মানুষের জন্য’-মানবতাবোধের এ অনুপম অনুভূতি, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও দানশীলতা মানুষকে বিপদগ্রস্তদের সাহায্য করতে অনুপ্রাণিত করেছে। ফলে সুপ্রাচীনকাল থেকে মানুষ অসহায়, ক্ষুধার্ত ও দুর্দশাগ্রস্তদের সাহায্যার্থে এগিয়ে এসেছে; প্রসারিত করেছে দানের হাত। এভাবে দানশীলতার ভেতর দিয়ে শুরু হয় সমাজকল্যাণের যাত্রা। 

কালের পরিক্রমায় সমাজকল্যাণ আজ দানশীলতা পেরিয়ে শিল্পবিপ্লবোত্তর সমাজের জটিল সমস্যাদির সমাধানে নতুন রূপ পরিগ্রহ করেছে। সমাজকল্যাণ বর্তমানে পরিণত হয়েছে মানুষের আর্থ-মনোসামাজিকসহ সব সমস্যা সমাধানের একটি সুসংগঠিত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি হিসেবে।

ইসলামে সমাজকল্যাণকে বেশ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়েছে। এর মাধ্যমে দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজ ত্বরান্বিত হয়। কারণ মানুষের মন জয়ের অন্যতম মাধ্যম তার কল্যাণ সাধন। হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কাজটি করেছেন খুবই সুচারুভাবে। তিনি বৃহৎ পরিসর থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত পর্যায়ে মানুষের কল্যাণ সাধন করেছেন। সে সঙ্গে নসিহতের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে মানুষকে সমাজকল্যাণে উদ্বুদ্ধ করেছেন। এর মাধ্যমে উপকৃত হয়েছে অসংখ্য মানুষ এবং কল্যাণের এ ধারা প্রবাহিত হয়েছে লম্বা সময়জুড়ে। 

উদাহরণ হিসেবে হিলফুল ফুজুল প্রতিষ্ঠা, নবুয়তের ৫ বছর আগে কাবাঘর সংস্কারের সময় হাজরে আসওয়াদ (বেহেশতি কালো পাথর) স্থাপন নিয়ে সৃষ্ট বিবাদ মীমাংসা এবং মদিনা সনদ রচনার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। এ ছাড়া নিঃস্ব অভাবী ও মিসকিনদের ভরণপোষণ এবং আবাসনের ব্যবস্থা, এতিম, বিধবা ও অক্ষমদের প্রতিপালন, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা, ঋণ পরিশোধে সহায়তা, বন্দিমুক্তি ও গোলাম আজাদ করা, রোগীর সেবা ও চিকিৎসা, বৃক্ষনিধন রোধ ও বৃক্ষরোপণ, মদ, জুয়া ও কুসংস্কারের মূলোচ্ছেদ করে বৃহৎ পরিসরে মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন। 

এছাড়াও নবী কারিম (সা.) ব্যক্তিগতভাবে অনেক সমাজকল্যাণমূলক কাজ করতেন। এর অন্যতম হলো অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যাওয়া, দান-খয়রাত করা, রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরানো, বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানো, প্রতিবেশীর সঙ্গে ভালো আচরণ ও জানাজায় অংশগ্রহণ ইত্যাদি। এসব কাজ তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। কাজগুলো ব্যক্তিবিশেষের মধ্যে করা হলেও এর প্রভাব ছিল অনেক বেশি। কারণ যে একবার উপকৃত হয়েছেন তিনি এটা স্মরণ রাখতেন সারা জীবন।

উপরোক্ত কাজ ছাড়া নবী কারিম (সা.) নসিহতের মাধ্যমে মানুষকে সমাজকল্যাণে উদ্বুদ্ধ করেছেন। কারণ, সমাজকল্যাণ একটি বৃহৎ পরিসরের কাজ। কোনো কল্যাণকর সমাজ গঠন করা একা কারও পক্ষে সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন সবার কিংবা অন্তত সমাজের বেশিসংখ্যক মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। তাই আল্লাহর রাসুল (সা.) সমাজকল্যাণে ব্যক্তিগতভাবে অসংখ্য উদ্যোগ নেয়ার পাশাপাশি সমাজের সাধারণ মানুষদের এ কাজে উদ্বুদ্ধ করতেন। নবী কারিম (সা.)-এর অসংখ্য হাদিসের মধ্যে এর প্রমাণ মেলে।

আরও পড়ুন<<>>শবে মেরাজের গুরুত্ব-তাৎপর্য-ফজিলত

সমাজে চলার পথে মানুষের অনেক বিপদ-আপদ আসে। এ সময় প্রয়োজন হয় অন্যের সাহায্যের। আর পরোপকারের এ কাজে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, আল্লাহতায়ালা তার বান্দাদের ততক্ষণ পর্যন্ত সাহায্য করতে থাকেন যতক্ষণ সে তার ভাইয়ের সাহায্য করতে থাকে। -সহিহ মুসলিম: ২৬৯৯। আবার মানুষের দুঃখ-কষ্টে যেন একে অপরের পাশে দাঁড়াই সে বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করতে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের পার্থিব দুঃখ-কষ্ট দূর করবে, আল্লাহতায়ালা কিয়ামতে তার দুঃখ-কষ্ট দূর করবেন। -সহিহ মুসলিম: ২৬৯৯। 

মানুষ যেন প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়, সে লক্ষ্যে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ওই ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যার প্রতিবেশী তার অনিষ্ট থেকে নিরাপদ নয়। -সহিহ মুসলিম : ৪৬। সে সঙ্গে প্রতিবেশীর খোঁজ-খবর রাখার বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করতে গিয়ে আল্লাহ রাসুল (সা.) বলেন, ওই ব্যক্তি ইমানদার নয়, যে ব্যক্তি তৃপ্তি সহকারে পেটপুরে খায়, অথচ তার পাশেই তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে। -মিশকাত: ৪৯৯১।

রোগী দেখতে যাওয়ার বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করে আল্লাহ রাসুল (সা.) বলেন, এমন কোনো মুসলমান নেই, যে সকালবেলা কোনো মুসলমান রোগীকে দেখতে যায়, অথচ তার জন্য সন্ধ্যা পর্যন্ত সত্তর হাজার ফেরেশতা দোয়া না করে। আর সন্ধ্যাবেলা কোনো রোগী দেখতে যায়, সকাল পর্যন্ত তার জন্য সত্তর হাজার ফেরেশতা দোয়া না করে। আর তার জন্য জান্নাতে একটি ফলের বাগান সুনির্ধারিত করে দেয়া হয়। -জামে তিরমিজি : ৯৬৯। 

বিধবা ও মিসকিনদের সহযোগিতার ফজিলত বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ রাসুল (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি বিধবা ও মিসকিনের সমস্যা সমাধানের জন্য ছুটোছুটি করে সে যেন আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে লিপ্ত। বর্ণনাকারী বলেন, আমার মনে হয় রাসুলুল্লাহ (সা.) এ কথাও বলেছেন, সে যেন ওই ব্যক্তির মতো যে সারা রাত নামাজ আদায় করে এবং সারা বছরই রোজা পালন করে। -সহিহ বোখারি: ৫৩৫৩। এভাবে পৃথকভাবে হাদিসে তিনি এতিমের লালন-পালনে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছেন, অনাহারীকে খাবার দিতে উৎসাহ দিয়েছেন, যথাসময়ে এবং যথাযথভাবে ঋণ পরিশোধের বিষয়ে তাগাদা দিয়েছেন, আবার ঋণগ্রস্ত অক্ষম ব্যক্তির প্রতি পাওনাদারকে দয়াপরবশ হওয়ার বিষয়ে দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন। 

মানুষের প্রতি দয়াপরবশ হওয়ার কথা বলতে গিয়ে আল্লাহ রাসুল (সা.) বলেন, তোমরা পৃথিবীবাসীদের প্রতি দয়া করো, তাহলে যিনি আসমানে আছেন (আল্লাহ) তিনি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন। -সুনানে আবু দাউদ: ৪৯৪১। মানবকল্যাণের বিষয়ে সর্বোপরি তিনি ইরশাদ করেন, (অন্যের) কল্যাণকামিতাই দ্বীন, (অন্যের) কল্যাণকামিতাই দ্বীন, (অন্যের) কল্যাণকামিতাই দ্বীন। -সুনানে আবু দাউদ: ৪৯৪৪।

মানবকল্যাণে করা সব কাজ ইসলামে ইবাদত হিসেবে গণ্য। তবে শর্ত হলো, তা নিঃস্বার্থ হতে হবে। সেবক বিশ্বাস করবে আমি এ কাজের মাধ্যমে মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভ করব। তার কাছ থেকেই প্রতিদান পাব। সে কোনোভাবেই সুনাম ও সুখ্যাতির আশা করবে না। আরেকটি কথা, ইসলামে সমাজসেবার ধারণা শুধু মানুষেই সীমাবদ্ধ নয়। ইসলাম পৃথিবীর সব প্রাণের সেবা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার ঘোষণা দিয়েছে। জীব, জন্তু, পাখি, উদ্ভিদ সব কিছুর প্রতি সহানুভূতিশীল হতে বলেছে। গোটা সৃষ্টিজগতের প্রতি ইসলাম দয়া প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়েছে।

লেখক : শিক্ষক ও ইসলামবিষয়ক লেখক
[email protected]

আপন দেশ/জেডআই

মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়