ছবি : আপন দেশ
আমার শরীরে অন্তত ৭০-৮০টি ইনজেকশন দেয়া হয়েছে। এসব কীসের ইনজেকশন তা আমি জানি না। এমন মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক নেতা গাজী সালাউদ্দিন তানভীর।
শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি একথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে তিনি ফেইসবুকে পোস্ট দেয়া। যা সংগঠনের ‘গুরুতর সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ’ হয়। এ অভিযোগে গত ১ আগস্ট গাজী সালাউদ্দিন তানভীরকে দলের দায়িত্ব থেকে সাময়িক অব্যাহতি দেয় এনসিপি।
এর আগে ২০২৫ সালের ২১ এপ্রিল তানভীরকে সাময়িক অব্যাহতি দিয়েছিল এনসিপি। তখন জেলা প্রশাসক নিয়োগে অবৈধ হস্তক্ষেপ এবং জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের পাঠ্যবই ছাপার কাগজে কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ তুলেছিলেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, ওখানে (কারাগারে) যে কক্ষে আমাকে রাখা হয়েছিল আওয়ামী লীগের লোকজন কীভাবে আছে তা দেখা যেত। তারা রাজার হালে জেলখানায় আছে, ফোনে কথা বলে, ভালো খাবারদাবার খায়, পরিবারের লোকজনের সঙ্গে নিয়মিত দেখা সাক্ষাৎ করে।
তিনি আরও বলেন, রাতের বেলা আওয়ামী লীগের নেতাদের গাড়িতে করে বাইরে নেয়া হয়। ভোরে আনা হয়, এটা আমি দেখেছি। এ দেখাটাই হয়তো আমার জন্য কাল হয়েছে।
এসময় গাজী সালাউদ্দিন অভিযোগ করেন, কারাগারে তার ওপর অমানবিক নির্যাতন করা হয়েছে, এমনকি তাকে চিকিৎসার নামে অপচিকিৎসা দেয়ায় তিনি ঠিকমতো চলাচল করতে পারছেন না।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে ফেইসবুকে আপত্তিকর ও মানহানিকর পোস্ট দেয়ার অভিযোগে সাইবার সুরক্ষা আইনের মামলায় গত ৫ অগাস্ট ঢাকার পূর্ব মনিপুর এলাকা থেকে তানভীরকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর ১০ অগাস্ট তাকে দিনের রিমান্ডে পায় বগুড়া সদর থানা পুলিশ।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে সে প্রসঙ্গ টেনে সালাউদ্দিন তানভীর বলেন, ৫ আগস্ট থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলে এবং রিমান্ডে আমাকে চরম নির্যাতন করা হয়েছে। হুমকি দেয়া হয়েছে। আমাকে বলা হয়েছে নির্যাতনের কথা বাইরে বললে আমার পরিবারের সদস্যদের গুম করে ফেলা হবে। এরপরও আপনাদের সামনে সত্যটা তুলে ধরতে এসেছি। আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় পাই না। সত্য সবার সামনে তুলে ধরতে চাই।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রযন্ত্রে ও সরকারের মধ্যে ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলের কালো ছায়া আগের মতোই হুবহু রয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি
তিনি বলেন, জেলে গিয়ে তার প্রমাণ আমি পেয়েছি। জীবনের ঝুঁকি রয়েছে জেনেও আমি এসব জাতির সামনে তুলে ধরতে আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়েছি।
আরও পড়ুন <<>> বিএনপির শপথ না নেয়াতেই দেশে সংকট শুরু: শফিকুর রহমান
এরপর অসুস্থতার কারণে কথা বলতে না পারায় তানভীরের পক্ষ থেকে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন এনসিপির কেন্দ্রীয় সদস্য ইয়াসির আরাফাত।
লিখিত বক্তব্যে তানভীর বলেন, ২ আগস্ট সাইবার সুরক্ষা আইনে আমার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়, অথচ ৫ আগস্ট বাংলাদেশের দ্বিতীয় স্বাধীনতার দিনে আমাকে গ্রেফতার করা হয়। বগুড়া সদর থানা বিএনপির সভাপতি এইচ এস মাফুতুন আহমেদ খান এ মামলার বাদী।
তিনি বলেন, ৫ আগস্ট আমাকে বগুড়ায় কারাগারের এমন একটি সেলে নেয়া হয়, যেটি চরম অপরিচ্ছন্ন এবং আলো-বাতাসহীন। বিদ্যুৎও নেই, একটা ফ্যানও নেই। কারারক্ষীরাও আওয়ামী লীগের। তাদের বেশিরভাগই সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের। তারা আমাকে জুলাই জঙ্গি বলে গালিগালাজ করতো, আশপাশের কয়েদিরাও আওয়ামী লীগের আসামি। তারাও যা-তা বলে সম্বোধন করতো।
তিনি আরও বলেন, ৫ আগস্ট যেদিন প্রথম জেলে নেয়া হলো, জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসে সবাইকে ভালো খাবার দেয়া হলো, কিন্তু আমাকে দুইদিনের পচা খাবার দেয়া হলো। কারাগারে এমন পচা-বাসি খাবার-দাবার দেয়া হতো, খাওয়ার অযোগ্য।
গাজী সালাউদ্দিন জানান, একপর্যায়ে তার ডায়রিয়া হয়ে যায়। চিকিৎসার জন্য শহীদ জিয়া মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয় তাকে। সেখানে যে ওষুধ লিখেছেন ডাক্তার সেটা তাকে দেয়া হয়নি, অজানা ওষুধ খেতে হয়েছে।
শরীরে অসংখ্য ইনজেকশন পুশ করা হয়েছে, এমন অভিযোগ করে গাজী সালাউদ্দিন তানভীর বলেন, এসব কীসের ইনজেকশন তা আমি জানি না। অন্তত ৭০-৮০টি ইনজেকশন দেয়া হয়েছে আমাকে। সারাক্ষণ জ্বর থাকতো আর তারা আমাকে ইনজেকশন দিত।
তিনি বলেন, একদিন হাত-পা কাঁপছিল, ডাক্তার এসে ইনজেকশন দিলেন। আমার ডান হাত আর ডান পা অবশ হয়ে গেলো, বাধ্য হয়ে শহীদ জিয়া মেডিক্যালে নিয়ে গেলো। ডাক্তার সেখানে বলেছেন, আমার স্ট্রোক হয়েছে, কিন্তু কারা কর্তৃপক্ষ বললো না স্ট্রোক করেনি, কিছুই হয়নি। আমার সিটি স্ক্যান করানো হলো, রিপোর্ট কী আসল জানি না, কারা কর্তৃপক্ষ বললো কোনও সমস্যা নেই, সব ঠিক আছে। পরে বললো, এমআরআই করাতে হবে, শহীদ জিয়া মেডিক্যালের এমআরআই মেশিনটা নষ্ট, তারপরও সেখানে আমাকে ঢোকালো।
এনসিপি থেকে অব্যাহতি পাওয়া এ নেতা বলেন, আমি ওটার ভেতরে থাকা অবস্থায় বিকট আওয়াজ হয়ে সেটি বন্ধ হয়ে গেলো। আমার কোমর থেকে পা পর্যন্ত প্যারালাইজড হয়ে গেলো। আমি ১০-১২ ঘণ্টা অজ্ঞান ছিলাম। পরে দেখি শহীদ জিয়া মেডিকেলের প্রিজন সেলে। আমার শরীরে প্রস্রাব-পায়খানা। একজন কোনোরকমে পরিষ্কার করে দিলো।
তিনি আরও বলেন, পরে উন্নত চিকিৎসার কথা বলে ঢাকায় আনা হলো। কেরানীগঞ্জে যেখানে রাখা হলো ওটাও খুবই খারাপ সেল। পিজি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য আনা হলো, এদিক সেদিক ঘুরায় শুধু। এখানে ডাক্তার দেখিয়ে জেলে নেয়ার সময় গাড়িতে হঠাৎ সাদা পোশাকে কয়েকজন লোক উঠে আসে, তারা আমাকে টর্চার করে।
গাজী সালাউদ্দিন বলেন, টর্চারের সময় নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, আসিফ মাহমুদ এবং সালাহউদ্দিন আম্মারের নাম ধরে ধরে বলা হতো, জুলাইয়ের সবাইকে এরকম নির্যাতন করা হবে। ওখানে যে কক্ষে আমাকে রাখা হয়েছিল আওয়ামী লীগের লোকজন কীভাবে আছে তা দেখা যেত। তারা রাজার হালে জেলখানায় আছে, ফোনে কথা বলে, ভালো খাবারদাবার খায়, পরিবারের লোকজনের সঙ্গে নিয়মিত দেখা সাক্ষাৎ করে। রাতের বেলা আওয়ামী লীগের নেতাদের গাড়িতে করে বাইরে নেয়া হয়। ভোরে আনা হয়, এটা আমি দেখেছি। এ দেখাটাই হয়তো আমার জন্য কাল হয়েছে।
লিখিত বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, আমার ওপর এতটাই নির্যাতন করা হয়েছে যে, বর্তমানে আমার প্রস্রাব-পায়খানা ব্যাগে ও প্যাডে করতে হচ্ছে। একটি প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তি আছি। আমাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে। জানি না চিকিৎসার কী হবে। আল্লাহর ওপর ভরসা করে আছি। আপনাদের কাছে দোয়া চাই এবং দোয়া করি, আমার সঙ্গে যা করা হয়েছে আর কারও সঙ্গে যেন করা না হয়।
দল থেকে অব্যাহতি পাওয়া গাজী সালাউদ্দিনের সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার। তিনি এ ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রকৃত ঘটনা সামনে আনার দাবি জানান।
সাইবার সুরক্ষা আইনের মামলায় গ্রেফতারের পর রিমান্ডে অসুস্থ হয়ে পড়েন গাজী সালাউদ্দিন। পরে তাকে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য তানভীরকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। পরে তিনি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের তত্ত্বাবধানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
গত ১৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় তিনি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান।
আপন দেশ/এসএস
মন্তব্য করুন ।। খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত,আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।





































