Apan Desh | আপন দেশ

বিমাখাত সংস্কারে রোডম্যাপ দিলেন আইডিআরএ’র চেয়ারম্যান

নিজস্ব প্রতিবেদক, আপন দেশ

প্রকাশিত: ১৮:২০, ২৭ জুন ২০২৬

আপডেট: ১৯:৩১, ২৭ জুন ২০২৬

বিমাখাত সংস্কারে রোডম্যাপ দিলেন আইডিআরএ’র চেয়ারম্যান

ছবি: আপন দেশ

বিমাখাতে সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নের রোডম্যাপ দিয়েছেন বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন।

শনিবার (২৭ জুন) ইন্স্যুরেন্স রিপোর্টার্স ফোরাম (আইআরএফ) আয়োজিত ‘বিমা খাতের চ্যালেঞ্জ, সম্ভাবনা ও করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এ রোডম্যাপ ঘোষণা করেন।

নাদিয়া নিভিন জানানা, বর্তমানে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার অনিষ্পন্ন বিমা দাবি নিষ্পত্তিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হবে। প্রয়োজনীয় সব বিকল্প ব্যবস্থার পরও যদি সংকট থেকে যায়, তাহলে সরকারের কাছে এককালীন (ওয়ান-টাইম) বেইলআউট প্যাকেজের প্রস্তাবও বিবেচনা করা হবে।

তিনি জানান, দায়িত্ব গ্রহণের পর গত এক সপ্তাহে তিনি বিমা খাতের বিভিন্ন সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে ধারণা নিয়েছেন। তবে তিনি কেবল সমস্যা চিহ্নিত করায় নয়, বরং সমাধানভিত্তিক সংস্কারে বিশ্বাস করেন। সে লক্ষ্যেই একটি সংস্কার কাঠামো (রিফর্ম ফ্রেমওয়ার্ক) প্রস্তুত করা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, এ সংস্কার কার্যক্রমের প্রথম স্তম্ভ হলো পলিসিধারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা। দ্বিতীয় স্তম্ভ বিমাকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত (লং-টার্ম ইনভেস্টমেন্ট ক্লাস) হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। তৃতীয় স্তম্ভ হলো খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি, যাতে ভবিষ্যতে একটি টেকসই ও শক্তিশালী বিমা শিল্প গড়ে ওঠে।

আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, সংস্থার তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে জীবন ও সাধারণ বিমা কোম্পানিগুলোর মিলিয়ে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার দাবি অনিষ্পন্ন রয়েছে। এসব দাবি নিষ্পত্তির জন্য প্রতিটি বিমা কোম্পানির সঙ্গে পৃথকভাবে আলোচনা করা হবে এবং তাদের আর্থিক ও পরিচালনাগত সমস্যাগুলো শনাক্ত করে সমাধানের উদ্যোগ নেয়া হবে।

দাবি পরিশোধের সুযোগ নিয়ে বলেন, কোথাও সম্পদ বিক্রি, কোথাও আটকে থাকা অর্থ উদ্ধার কিংবা অন্য কোনো উপায়ে দাবি পরিশোধের সুযোগ থাকলে আইডিআরএ সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করবে।

অনেক বিমা কোম্পানির স্থায়ী আমানতের (এফডিআর) অর্থ দুর্বল হয়ে পড়া ব্যাংকে আটকে আছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করা অর্থ নগদায়নের সুযোগও বিবেচনায় নেয়া হবে বলে জানান সংস্থাটির চেয়ারম্যান।

এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের পরও যদি উল্লেখযোগ্য অঙ্কের দায় থেকে যায়, তাহলে এককালীন বেইলআউট প্যাকেজের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।

তবে সরকারের কাছে যাওয়ার আগে বিমা কোম্পানি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে নিজেদের প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে উল্লেখ করে আইডিআরএ’র চেয়ারম্যান বলেন, সরকারকে দেখাতে হবে যে ভবিষ্যতে একই ধরনের সংকট যাতে আর না হয়, সেজন্য কী ধরনের সুশাসন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্কার কার্যকর করা হচ্ছে।

চেয়ারম্যান বলেন, বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় এখন ৩ হাজার ডলারের বেশি এবং দেশের অর্থনীতির আকার অর্ধ ট্রিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। ভবিষ্যতে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হতে হলে একটি শক্তিশালী বিমা খাত গড়ে তোলা অপরিহার্য।

সমপর্যায়ের দেশের সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের বিমা শিল্প এখনও অনেক পিছিয়ে। অথচ উন্নত দেশগুলোতে বিমা শুধু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মাধ্যম নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের অন্যতম বড় উৎস হিসেবেও কাজ করে।

শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের নিয়ে নাদিয়া নিভিন বলেন, দেশের শেয়ারবাজারে বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর ঘাটতি রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিমা কোম্পানিগুলো শেয়ারবাজারের অন্যতম বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে নতুন কোম্পানির প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) ইস্যুতে বিমা কোম্পানির অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য।

আরও পড়ুন <<>> বাংলাদেশকে ১১০ কোটি ডলার দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক

তার মতে, একটি শক্তিশালী বিমা খাত গড়ে উঠলে শেয়ারবাজারের গভীরতা বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের নতুন উৎস সৃষ্টি হবে। তাই শেয়ারবাজারের উন্নয়ন এবং বিমা খাতের সংস্কার একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত।

বাংলাদেশকে দুর্যোগপ্রবণ দেশ উল্লেখ করে আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, প্রতি বছর ঘূর্ণিঝড়, বন্যাসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে জাতীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের ক্ষতি হয়। এসব দুর্যোগের পর পুনর্বাসনে সরকারকে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়।

তিনি বলেন, উন্নত দেশগুলোতে বিমার মাধ্যমে ঝুঁকি বণ্টনের ব্যবস্থা থাকায় সরকারের আর্থিক চাপ কমে। বাংলাদেশেও বিমা খাতকে সে সক্ষমতায় উন্নীত করতে হবে, যাতে আর্থিক স্থিতিশীলতা বাড়ে এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কা মোকাবিলা সহজ হয়।

দেশে মাইক্রোফাইন্যান্সের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক থাকলেও তা কাজে লাগিয়ে কার্যকর মাইক্রোইনস্যুরেন্স ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। এ জন্য প্রয়োজনীয় আইন ও বিধিমালা প্রণয়ন করে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মাইক্রোইনস্যুরেন্স সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়া হবে বলে জানান তিনি।

এছাড়া তিনি ইসলামি বিমা বা তাকাফুল খাতের জন্যও পৃথক নীতিমালা ও কার্যকর নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানান।

খাতের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়ে আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিমা বিষয়ে বিভাগ, মেজর, মাইনর বা সার্টিফিকেশন কোর্স চালুর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। এর মাধ্যমে দক্ষ জনবল তৈরি হবে এবং তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

সংস্কার সফল করতে তিনটি পক্ষের কথা উল্লেখ করে বলেন, কোনো খাতের সংস্কার সফল করতে তিনটি পক্ষের সদিচ্ছা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার, শিল্পমালিকদের আন্তরিকতা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর ভূমিকা। এ তিন পক্ষ একসঙ্গে কাজ না করলে কোনো সংস্কারই সফল হবে না।

আইডিআরএ প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত। যেখানে যেতে হবে, যাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। যেভাবে উদ্যোগ নিতে হবে, তা করা হবে। তবে বিমা কোম্পানিগুলোকেও সমান আন্তরিকতা দেখাতে বলেন তিনি।

তিনি বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বিমা কোম্পানি এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে প্রতিপক্ষ নয়, বরং অংশীদার হিসেবে কাজ করতে হবে। সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই দেশের বিমা খাতকে একটি শক্তিশালী ও টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো সম্ভব।

সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) সভাপতি সাঈদ আহমেদ এবং বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরামের (বিআইএফ) সভাপতি বিএম ইউসুফ আলী।

আপন দেশ/এসএস

মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

সম্পর্কিত বিষয়:

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়