Apan Desh | আপন দেশ

বিমা খাতে আস্থা ফেরাতে ডিজিটাল সংস্কারের তাগিদ বিশেষজ্ঞদের

নিজস্ব প্রতিবেদক, আপন দেশ

প্রকাশিত: ১৮:২০, ২৭ জুন ২০২৬

আপডেট: ২০:৪১, ২৭ জুন ২০২৬

বিমা খাতে আস্থা ফেরাতে ডিজিটাল সংস্কারের তাগিদ বিশেষজ্ঞদের

ছবি: আপন দেশ

বর্তমানে দেশের জীবন বিমা ও সাধারণ বিমা কোম্পানিগুলোর মিলিয়ে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার দাবি অনিষ্পন্ন রয়েছে। এ খাতের ওপর মানুষের আস্থা বাড়াতে ডিজিটালাইজেশনে এবং সুশাসনের তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। 

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, দেশে বিমা খাতে এখনো পর্যাপ্ত ডিজিটালাইজেশন হয়নি। ফলে গ্রাহক সন্তুষ্টি ও সুশাসন নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর তদারকির ঘাটতির কারণে এ খাতে আস্থা সংকট তৈরি হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ বাংলাদেশের জন্য বিমা খাতকে আরও শক্তিশালী করা জরুরি। প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার না থাকায় অনেক বিমা কোম্পানি কার্যকরভাবে কাজ করতে পারছে না। খাতভিত্তিক নিরীক্ষা ব্যবস্থা চালুর পাশাপাশি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তোলার ওপর তিনি জোর দেন।

শনিবার (২৭ জুন) রাজধানীর হোটেল একাত্তরে ইন্স্যুরেন্স রিপোর্টার্স ফোরাম (আইআরএফ) আয়োজিত ‘বিমা খাতের চ্যালেঞ্জ, সম্ভাবনা ও করণীয়’ শীর্ষক বাজেট-পরবর্তী সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। 

আইআরএফ সভাপতি গোলাম মওলার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) সভাপতি সাঈদ আহমেদ এমপি, বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরামের সভাপতি বিএম ইউসুফ আলী, জেনিথ ইসলামিক ইন্স্যুরেন্সের এমডি এসএম নুরুজ্জামান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শহিদুল ইসলাম জাহিদ প্রমুখ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বাণিজ্য প্রতিদিনের গিয়াস উদ্দিন।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন জানানা, দায়িত্ব গ্রহণের পর গত এক সপ্তাহে তিনি বিমা খাতের বিভিন্ন সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে ধারণা নিয়েছেন। তবে তিনি কেবল সমস্যা চিহ্নিত করায় নয়, বরং সমাধানভিত্তিক সংস্কারে বিশ্বাস করেন। সে লক্ষ্যেই একটি সংস্কার কাঠামো (রিফর্ম ফ্রেমওয়ার্ক) প্রস্তুত করা হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার অনিষ্পন্ন বিমা দাবি নিষ্পত্তিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হবে। প্রয়োজনীয় সব বিকল্প ব্যবস্থার পরও যদি সংকট থেকে যায়, তাহলে সরকারের কাছে এককালীন (ওয়ান-টাইম) বেইলআউট প্যাকেজের প্রস্তাবও বিবেচনা করা হবে।

আরও পড়ুন<<>> ন্যাশনাল লাইফের তদন্তে দুদক: ২১শ’ অ্যাকাউন্টে সন্দেহজনক লেনদেন, ৭১৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ-পাচার

আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, সংস্থার তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে জীবন ও সাধারণ বিমা কোম্পানিগুলোর মিলিয়ে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার দাবি অনিষ্পন্ন রয়েছে। এসব দাবি নিষ্পত্তির জন্য প্রতিটি বিমা কোম্পানির সঙ্গে পৃথকভাবে আলোচনা করা হবে এবং তাদের আর্থিক ও পরিচালনাগত সমস্যাগুলো শনাক্ত করে সমাধানের উদ্যোগ নেয়া হবে। এ সংস্কার কার্যক্রমের প্রথম স্তম্ভ হলো পলিসিধারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা। দ্বিতীয় স্তম্ভ বিমাকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত (লং-টার্ম ইনভেস্টমেন্ট ক্লাস) হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। তৃতীয় স্তম্ভ হলো খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি, যাতে ভবিষ্যতে একটি টেকসই ও শক্তিশালী বিমা শিল্প গড়ে ওঠে।

দাবি পরিশোধের সুযোগ নিয়ে বলেন, কোথাও সম্পদ বিক্রি, কোথাও আটকে থাকা অর্থ উদ্ধার কিংবা অন্য কোনো উপায়ে দাবি পরিশোধের সুযোগ থাকলে আইডিআরএ সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করবে।অনেক বিমা কোম্পানির স্থায়ী আমানতের (এফডিআর) অর্থ দুর্বল হয়ে পড়া ব্যাংকে আটকে আছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করা অর্থ নগদায়নের সুযোগও বিবেচনায় নেয়া হবে বলে জানান সংস্থাটির চেয়ারম্যান।

নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের পরও যদি উল্লেখযোগ্য অঙ্কের দায় থেকে যায়, তাহলে এককালীন বেইলআউট প্যাকেজের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। তবে সরকারের কাছে যাওয়ার আগে বিমা কোম্পানি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে নিজেদের প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে উল্লেখ করে আইডিআরএ’র চেয়ারম্যান বলেন, সরকারকে দেখাতে হবে যে ভবিষ্যতে একই ধরনের সংকট যাতে আর না হয়, সেজন্য কী ধরনের সুশাসন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্কার কার্যকর করা হচ্ছে।

যথাক্রমে ছবিতে বা থেকে- জেনিথ ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের এমডি এসএম নুরুজ্জামান, এশিয়া ইন্স্যুরেন্সের এমডি ইমরান শাহীন, পিপলস লাইফ ইন্স্যুরেন্সের এমডি বিএম ইউসূফ আলী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শহিদুল ইসলাম জাহিদ ও সিএমজেএফ-এর সভাপতি মনির হোসেন। ছবি: আপন দেশ

সমপর্যায়ের দেশের সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের বিমা শিল্প এখনও অনেক পিছিয়ে। অথচ উন্নত দেশগুলোতে বিমা শুধু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মাধ্যম নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের অন্যতম বড় উৎস হিসেবেও কাজ করে।

শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের নিয়ে নাদিয়া নিভিন বলেন, দেশের শেয়ারবাজারে বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর ঘাটতি রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিমা কোম্পানিগুলো শেয়ারবাজারের অন্যতম বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে নতুন কোম্পানির প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) ইস্যুতে বিমা কোম্পানির অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। তার মতে, একটি শক্তিশালী বিমা খাত গড়ে উঠলে শেয়ারবাজারের গভীরতা বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের নতুন উৎস সৃষ্টি হবে। তাই শেয়ারবাজারের উন্নয়ন এবং বিমা খাতের সংস্কার একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত।

আরও পড়ুন <<>> বাংলাদেশকে ১১০ কোটি ডলার দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক

দেশে মাইক্রোফাইন্যান্সের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক থাকলেও তা কাজে লাগিয়ে কার্যকর মাইক্রোইনস্যুরেন্স ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। এ জন্য প্রয়োজনীয় আইন ও বিধিমালা প্রণয়ন করে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মাইক্রোইনস্যুরেন্স সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়া হবে বলে জানান তিনি। ইসলামি বিমা বা তাকাফুল খাতের জন্যও পৃথক নীতিমালা ও কার্যকর নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।

খাতের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়ে আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিমা বিষয়ে বিভাগ, মেজর, মাইনর বা সার্টিফিকেশন কোর্স চালুর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। এর মাধ্যমে দক্ষ জনবল তৈরি হবে এবং তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

আইডিআরএ প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত। যেখানে যেতে হবে, যাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। যেভাবে উদ্যোগ নিতে হবে, তা করা হবে। তবে বিমা কোম্পানিগুলোকেও সমান আন্তরিকতা দেখাতে বলেন তিনি। নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বিমা কোম্পানি এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে প্রতিপক্ষ নয়, বরং অংশীদার হিসেবে কাজ করতে হবে। সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই দেশের বিমা খাতকে একটি শক্তিশালী ও টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো সম্ভব-বলেন নিভিন।

বিআইএফ সভাপতি বিএম ইউসুফ আলী বলেন, দেশে এমন কিছু বিমা কোম্পানি রয়েছে, যারা মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ক্লেইম নিষ্পত্তি করে থাকে। তবে এসব ইতিবাচক দিক তেমনভাবে আলোচনায় আসে না। যেসব ক্ষেত্রে ক্লেইম প্রদান করা হয় না বা বিলম্ব হয়, সেগুলোই বেশি আলোচিত ও সমালোচিত হয়। ফলে বিমা খাতের ভালো কাজগুলোও জনসমক্ষে তুলে ধরা প্রয়োজন।

জেনিথ ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের এমডি এস এম নুরুজ্জামান বলেন, লাইফ বিমা খাতে সমস্যার মাত্রা নন-লাইফ বিমার তুলনায় বেশি। অনেক প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বিক্রিতে জটিলতা রয়েছে। ব্যাংক ঋণ সহায়তা ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা সহজ করলে সংকট কমবে বলে তিনি মত দেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. শহিদুল ইসলাম জাহিদ বলেন, দেশের অর্থনীতিতে বিমাখাত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি এখনো অবহেলিত। বিমা প্রবেশযোগ্যতা খুবই কম, যা দ্রুত বাড়ানো দরকার।

আপন দেশ/এসএস/এবি

মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

সম্পর্কিত বিষয়:

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়