Apan Desh | আপন দেশ

বাংলা সাহিত্যে ঈদের কবিতা

আপন দেশ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৬:৪৪, ১৩ মার্চ ২০২৬

আপডেট: ১৬:৪৪, ১৩ মার্চ ২০২৬

বাংলা সাহিত্যে ঈদের কবিতা

ছবি: সংগৃহীত

উৎসব মানুষের জীবনে আনন্দ, ঐক্য ও আত্মিক শক্তির উৎস। একটি জাতি তার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের পরিচয় খুঁজে পায় নানা উৎসবের মধ্য দিয়ে। বাঙালি মুসলমানদের জন্য তেমন দুটি প্রধান ধর্মীয় উৎসব হলো ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। এ দুই ঈদ শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা বাঙালি মুসলমানের সামাজিক জীবন, সংস্কৃতি ও সাহিত্যেও গভীর প্রভাব বিস্তার করেছে। বাংলা কবিতায় ঈদ নিয়ে রচিত অসংখ্য কবিতা তারই প্রমাণ।

বাংলা ভাষায় প্রথম ঈদের কবিতা লেখেন প্রখ্যাত কবি সৈয়দ এমদাদ আলী (১৮৭৫–১৯৫৬)। তিনি ছিলেন সাহিত্যিক, সম্পাদক এবং একজন পুলিশ কর্মকর্তা। ১৯০৩ সালে তার সম্পাদিত পত্রিকা নবনূর–এর ডিসেম্বর সংখ্যায় ‘ঈদ’ শিরোনামের একটি কবিতা প্রকাশিত হয়। এটিই বাংলা ভাষার প্রথম ঈদবিষয়ক কবিতা হিসেবে স্বীকৃত।

কুহেলি তিমির সরায়ে দূরে
তরুণ অরুণ উঠিছে ধীরে
রাঙিয়া প্রতি তরুর শিরে
আজ কি হর্ষ ভরে!
আজি প্রভাতের মৃদুল বায়
রঙে নাচিয়ে যেন কয়ে যায়
‘মুসলিম জাহান আজি একতায়
দেখ কত বল ধরে।’

শুধু তাই নয়, ঈদকে কেন্দ্র করে বিশেষ সাহিত্যসংখ্যা প্রকাশের প্রচলনও তিনিই শুরু করেন। ১৯০৩, ১৯০৪ ও ১৯০৫ সালে ‘নবনূর’-এর ঈদসংখ্যা প্রকাশিত হয়। সে সংখ্যাগুলোতে ঈদবিষয়ক লেখা প্রকাশ করেছিলেন আরও অনেক বিশিষ্ট সাহিত্যিক, যেমন কায়কোবাদ এবং বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন।

কায়কোবাদ ‘ঈদ আবাহন’-এ একই শিরোনামে দুটি ঈদের কবিতা লেখেন, যার একটি প্রকাশিত হয় ‘অশ্রুমালা’ কাব্যগন্থে, অন্যটি ‘অমিয়ধারা’য়।

আজি এ ঈদের দিনে হয়ে সব এক মন প্রাণ,
জাগায় মোস্লেম সবে গাহ আজি মিলনের গান।
ডুবিবে না তবে আর ঈদের এ জ্যোতিস্মান রবি,
জীবন সার্থক হবে, ধন্য হবে এ দরিদ্র কবি।

পরবর্তীকালে বাংলা সাহিত্যে ঈদকে কেন্দ্র করে কবিতা লিখেছেন অনেক কবি। শান্তিপুরের কবি মোজাম্মেল হক ‘ঈদ’ শিরোনামে কবিতা রচনা করেন, যেখানে ঈদকে মুসলমানদের মিলনোৎসব হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। একইভাবে শেখ ফজলল করিম তার কবিতায় মুসলিম জাতির জাগরণ ও আত্মমর্যাদার আহ্বান জানিয়েছেন। এছাড়া শাহাদাৎ হোসেন এবং গোলাম মোস্তফা-এর কবিতায় ঈদের আনন্দ, ঈদের চাঁদের সৌন্দর্য এবং ধর্মীয় আবেগের প্রকাশ লক্ষ্য করা যায়।

তবে ঈদবিষয়ক কবিতা প্রকৃত সাহিত্যিক উচ্চতায় পৌঁছে যায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম–এর হাতে। নজরুলের কবিতা ও গানে ঈদ শুধু আনন্দের উৎসব নয়, বরং মানবতা, সাম্য, দানশীলতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবে উঠে এসেছে। তার বিখ্যাত গান ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ বাঙালি মুসলমানের ঈদ উদযাপনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।

ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ,
তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে, শোন আসমানী তাগিদ।
তোর সোনা-দানা, বালাখানা সব রাহে লিল্লাহ
দে যাকাত, মুর্দা মুসলিমের আজ ভাঙাইতে নিঁদ,
ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ।

আজ পড়বি ঈদের নামাজ রে মন সেই সে ঈদগাহে,
যে ময়দানে সব গাজী মুসলিম হয়েছে শহীদ।
ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ।

আজ ভুলে যা তোর দোস্ত-দুশমন, হাত মেলাও হাতে,
তোর প্রেম দিয়ে কর বিশ্ব নিখিল ইসলামে মুরিদ।
ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ।

যারা জীবন ভরে রাখছে রোজা, নিত্য উপবাসী,
সেই গরীব ইয়াতীম মিসকিনে দে যা কিছু মুফিদ,
ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ।
আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন আসমানী তাগিদ।

ঢাল হৃদয়ের তোর তশতরীতে শিরনি তৌহিদের,
তোর দাওয়াত কবুল করবেন হজরত হয় মনে উম্মীদ।
ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ।

তোরে মারল' ছুঁড়ে জীবন জুড়ে ইট পাথর যারা,
সেই পাথর দিয়ে তোলরে গড়ে প্রেমেরই মসজিদ।
ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ,
আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন আসমানী তাগিদ।

এ গানে তিনি ধনী-দরিদ্র ভেদাভেদ ভুলে সবাইকে মিলেমিশে আনন্দ ভাগ করে নেয়ার আহবান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন যাকাতের মাধ্যমে দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রয়োজনীয়তা।

আরও পড়ুন <<>> সাঈদ আহমেদের ‘আমাজনের ডায়েরি’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন

নজরুল-পরবর্তী সময়ে অনেক কবি ঈদকে কেন্দ্র করে কবিতা রচনা করে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ফররুখ আহমদ, সিকান্দার আবু জাফর, আহসান হাবীব, সুফিয়া কামাল এবং আল মাহমুদ। ফররুখ আহমদের কবিতায় ঈদ এসেছে স্বপ্ন ও কল্পনার রূপে, আর আল মাহমুদের কবিতায় দেখা যায় শৈশবের ঈদের স্মৃতি ও আবেগঘন অনুভূতি।

আধুনিক যুগে ঈদকে কেন্দ্র করে কবিতা লেখা প্রায় একটি সাহিত্যিক ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর ঈদ উপলক্ষে বিভিন্ন পত্রিকা ও সাময়িকীতে নতুন নতুন কবিতা প্রকাশিত হয়। এসব কবিতায় যেমন রয়েছে শিল্পসৌন্দর্য, তেমনি রয়েছে মানবিক আবেগ, সামাজিক চেতনা ও স্মৃতির অনুরণন।

সার্বিকভাবে বলা যায়, ঈদ শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি বাঙালি মুসলমানের সংস্কৃতি ও সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলা কবিতায় ঈদের উপস্থিতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে উৎসব মানুষের জীবনে আনন্দের পাশাপাশি মানবতা, সহমর্মিতা ও ঐক্যের বার্তাও বহন করে। তাই বাংলা সাহিত্যে ঈদের কবিতা কেবল উৎসবের আনন্দই নয়, বরং মানুষের হৃদয়ের গভীর অনুভূতিরও প্রকাশ।

আপন দেশ/এসএস

মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

সম্পর্কিত বিষয়:

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়