Apan Desh | আপন দেশ

ইরান যুদ্ধে কত বছর পিছিয়ে গেল মধ্যপ্রাচ্য

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, আপন দেশ

প্রকাশিত: ১১:৫০, ৯ মে ২০২৬

আপডেট: ১১:৫১, ৯ মে ২০২৬

ইরান যুদ্ধে কত বছর পিছিয়ে গেল মধ্যপ্রাচ্য

ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত শুধু সামরিক উত্তেজনাই বাড়ায়নি, কাঁপিয়ে দিয়েছে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতিও। জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়া থেকে শুরু করে পর্যটন, বিনিয়োগ, আর্থিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন পরিকল্পনা—সবখানেই পড়ছে এর প্রভাব। বিশেষ করে তেল ও গ্যাসনির্ভর দেশগুলো এখন বড় অনিশ্চয়তার মুখে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, যুদ্ধ থেমে গেলেও এ ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে লেগে যেতে পারে বহু বছর।

একসময় তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে ছিল কাতার। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে উচ্চ ঋণ ও কম রাজস্ব আয় দেশটির অর্থনীতিকে চাপে ফেলে দেয়। সে পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে প্রাকৃতিক গ্যাসকে ঘিরে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেয় দেশটি।

সমুদ্র উপকূলবর্তী গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়ন এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনের মাধ্যমে বৈশ্বিক বাজার ধরতে শুরু করে কাতার। এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই গড়ে ওঠে রাস লাফান শিল্পনগরী। রাজধানী দোহা থেকে অল্প দূরত্বে থাকা এ অঞ্চল ধীরে ধীরে বিশ্বের সবচেয়ে বড় গ্যাস রফতানি কেন্দ্রে পরিণত হয়। এর মাধ্যমে বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশে পরিণত হয় কাতার।

তবে গত ১৮ মার্চ বড় ধাক্কা খায় সে সাফল্য। চলমান সংঘাতের মধ্যে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় রাস লাফানের প্রধান গ্যাস কমপ্লেক্স ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে বিশ্বব্যাপী তরলীকৃত গ্যাস সরবরাহের প্রায় ১৭ শতাংশ বন্ধ হয়ে যায়।

এ হামলার কারণে কাতারের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান বছরে প্রায় ২ হাজার কোটি ডলার রাজস্ব হারানোর শঙ্কায় পড়েছে। একই সঙ্গে চীনসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে গ্যাস সরবরাহেও বিঘ্ন ঘটে। ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা পুরোপুরি মেরামত করতে ৩-৫ বছর সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জ্বালানি বিশ্লেষকেরা বলছেন, এ হামলা শুধু কাতারের জন্য নয়, পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের জন্য সতর্কবার্তা। কারণ উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতির বড় অংশ এখনো জ্বালানি রফতানিনির্ভর।

কাতারের জ্বালানি খাতের শীর্ষ কর্মকর্তারা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, এ ক্ষয়ক্ষতির প্রভাব অঞ্চলটিকে অন্তত ১০-২০ বছর পিছিয়ে দিতে পারে।

সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিশ্বের সবচেয়ে বড় গ্যাসভান্ডারকে ঘিরে উত্তেজনা। ইরানের সাউথ পার্স ও কাতারের নর্থ ডোম গ্যাসক্ষেত্র একই অঞ্চলে অবস্থিত। ইসরায়েলের হামলার পর পাল্টা আঘাত হানে ইরান। এতে পুরো অঞ্চল আরও অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে।

আরও পড়ুন <<>> রাশিয়া-ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা ট্রাম্পের

বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, চলমান সংঘাতে এখন পর্যন্ত উপসাগরীয় অঞ্চলের ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫ হাজার ৮০০ কোটি ডলার।

একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য বলছে, সংঘাত শুরুর পর ৮০টির বেশি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা হয়েছে। এর মধ্যে এক-তৃতীয়াংশের বেশি স্থাপনা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কাতারের পাশাপাশি কুয়েত, বাহরাইন, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতেও ক্ষতির প্রভাব পড়েছে।

এ পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও কমিয়ে আনা হয়েছে। চলতি বছরের প্রবৃদ্ধি অনেক কমে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কাতার ও কুয়েত সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়তে পারে। কারণ এ দেশগুলোর জ্বালানি পরিবহনের বড় অংশ নির্ভর করে হরমুজ প্রণালির ওপর।

হরমুজ প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। বৈশ্বিক তেল ও গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এ পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। কিন্তু সংঘাতের কারণে এ পথ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় তেল ও গ্যাস রফতানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে সৌদি আরব বিকল্প পাইপলাইন ব্যবহার করে তেল পাঠাচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতও অন্য পথ ব্যবহার করে রফতানি চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। তবে বিকল্প ব্যবস্থাগুলো দিয়ে স্বাভাবিক সময়ের অর্ধেক পরিমাণ জ্বালানিও পরিবহন করা সম্ভব হচ্ছে না।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জ্বালানি সংকটগুলোর একটি।

এ যুদ্ধের প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ নেই। বড় ধাক্কা খেয়েছে পর্যটন শিল্পও। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ গত কয়েক দশকে পর্যটনকে অর্থনীতির অন্যতম প্রধান খাত হিসেবে গড়ে তুলেছিল। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পর পর্যটক কমে গেছে ব্যাপকভাবে।

বিশেষ করে দুবাইয়ে হোটেল বুকিং কমে যাওয়া, ভ্রমণ বাতিল এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। এর ফলে অনেক মানুষ চাকরি হারাচ্ছেন কিংবা বেতনহীন ছুটিতে যাচ্ছেন।

আর্থিক খাতেও চাপ বাড়ছে। ডলার সংকট মোকাবিলায় উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য বিশেষ আর্থিক সহায়তা দেয়ার বিষয় বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র।

একই সময়ে উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের অর্থনৈতিক কৌশলও নতুনভাবে ভাবতে শুরু করেছে। তেলের ওপর নির্ভরতা কমাতে তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তি, ক্রীড়া ও বিনোদন খাতে বিপুল বিনিয়োগ করেছিল। কিন্তু চলমান অস্থিরতা সে পরিকল্পনাগুলোকেও অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সঙ্গে স্থায়ী সমঝোতা না হলে এবং হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে নিম্নমাত্রার সংঘাত চললেও তার প্রভাব উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতি বহন করতে হবে বহু বছর।

আপন দেশ/এসএস

মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়