Apan Desh | আপন দেশ

এক মাসে রিজার্ভ কমলো ১ বিলিয়ন

যুদ্ধের প্রভাব মোকাবেলায় রোডম্যাপহীন বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক, আপন দেশ

প্রকাশিত: ২২:৫৯, ২৯ মার্চ ২০২৬

আপডেট: ০০:৩৩, ৩০ মার্চ ২০২৬

যুদ্ধের প্রভাব মোকাবেলায় রোডম্যাপহীন বাংলাদেশ

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধজনিত অর্থনৈতিক ধাক্কা মোকাবিলায় সুস্পষ্ট কোনো রোডম্যাপ ছাড়াই একাধিক অনিশ্চিত সম্ভাবনার ওপর ভর করে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার আশাবাদ দেখাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। রেমিট্যান্স বাড়তে পারে, আইএমএফের অর্থ আসতে পারে, মৌসুমি কারণে আমদানি চাপ কমতে পারে—এমন একাধিক ‘যদি’ আর ‘কিন্তু’ নির্ভর হিসাবেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কৌশল গড়ে উঠেছে।

রোববার (২৯ মার্চ) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে জাতীয় দৈনিকের সম্পাদক ও বাণিজ্য সম্পাদকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান ও ডেপুটি গভর্নররা যে চিত্র তুলে ধরেন। তাতে স্পষ্ট হয়—যুদ্ধ পরিস্থিতি মোকাবিলায় নির্দিষ্ট নীতিগত কাঠামোর চেয়ে সম্ভাব্য ইতিবাচক প্রবাহের ওপরই বেশি জোর দেয়া হচ্ছে।

এদিকে রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির মধ্যে আমদানি চাপ বেড়ে যাওয়ায় গত এক মাসে রিজার্ভ কমেছে এক বিলিয়ন ডলারের উপরে। যদিও এ সময়ে রেমিটেন্স প্রবাহ বেড়েছে। কিন্তু নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির রফতানি আয় ও আমদানি ব্যয়ের মধ্যে ঘাটতির পুরোটা পূরণ করতে পারেনি বর্ধিত প্রবাস আয়।

ডেপুটি গভর্নর কবির আহম্মাদ বলেন, সামনে বর্ষাকাল থাকায় সার আমদানি কমবে এবং রমজান শেষে আমদানি চাপও কিছুটা কমেছে। ফলে ডলারের চাহিদা আপাতত নিয়ন্ত্রণে থাকতে পারে। একই সঙ্গে তিনি আশা করেন, চলতি অর্থবছরে অতিরিক্ত ২ থেকে ২.৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আসতে পারে এবং জুনে আইএমএফ থেকে ১.৫ বিলিয়ন ডলার পাওয়া যেতে পারে।

এ সম্ভাব্য প্রবাহের ওপরই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আস্থার বড় অংশ নির্ভর করছে। কবির আহম্মাদ বলেন, আইএমএফ থেকে যদি দেড় বিলিয়ন ডলার পাই, পাশাপাশি গত বছরের চেয়ে যদি ২.৫ বিলিয়ন ডলার বেশি রেমিট্যান্স আসে, তাহলে আমার কাছে মনে হয় কিছুটা হলেও আমরা সেভ জোনে আসবো। যেরকম আমরা আতঙ্কিত, আসলে অত আতঙ্কের বিষয় আছে বলে আমার কাছে মনে হয় না।

কিন্তু এ হিসাবের প্রতিটি উপাদানই শর্তসাপেক্ষ। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে প্রবাসীদের আয় কমতে পারে, রেমিট্যান্স প্রত্যাশার মতো না-ও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে জ্বালানি ও অন্যান্য আমদানি ব্যয় বাড়লে মৌসুমি সুবিধা দ্রুতই চাপের মধ্যে পড়ে যেতে পারে।

মাঠপর্যায়ের সূচকগুলো ইতোমধ্যেই চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে। গত জানুয়ারিতে আমদানি প্রায় ৩ শতাংশ বেড়েছে এবং চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে আমদানিতে প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৬৪ শতাংশ। কয়েক মাস ধরেই আমদানি ঊর্ধ্বমুখী। সামনে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি আকু বিল পরিশোধের চাপ রয়েছে। এর মধ্যে গত এক মাসেই বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমেছে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি—যা দেখাচ্ছে, যুদ্ধের প্রভাব ইতোমধ্যেই অর্থনীতিতে পড়তে শুরু করেছে।

আরও পড়ুন <<>> চলতি মাসে রেমিট্যান্স এলো ৩.৩৩ বিলিয়ন ডলার

আইএমএফ অর্থপ্রাপ্তির বিষয়েও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরেই অনিশ্চয়তা রয়েছে। ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমান বলেন, এ বিষয়ে আলোচনা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে এবং মূল সিদ্ধান্ত হবে এপ্রিলের বৈঠকে। অর্থাৎ, যে বৈদেশিক সহায়তাকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছে, সেটিও এখনো নিশ্চিত নয়।

বৈদেশিক খাতের ধাক্কা মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, চলতি অর্থবছরে বাজার থেকে কেনা প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার একটি বাফার হিসেবে কাজ করবে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এর অর্থ দাঁড়ায়—প্রয়োজনে রিজার্ভ ব্যবহার করতে হবে, যা ইতোমধ্যেই কমতির মধ্যে থাকায় ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

ডলারের বাজার পরিস্থিতি তুলে ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, বর্তমানে নেট ওপেন পজিশনে প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ডলার রয়েছে। তবে অনিশ্চয়তার কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে সক্রিয়ভাবে ডলার কিনছে না—যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণভিত্তিক অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়।

জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকিও স্বীকার করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তারা বলেছে, তেলের দাম বাড়লে আমদানি-নির্ভর মূল্যস্ফীতি বাড়বে এবং তা অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়বে। এতে ভর্তুকি ও রাজস্ব খাতে চাপ বাড়বে। কিন্তু এ চাপ মোকাবিলায় নির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়নি।

গভর্নর বলেন, এ মুহূর্তে আমাদের কাছে কোনো কুইক সলিউশন নাই। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্বিপাক্ষিক সহায়তা বা মূল্য ছাড়ের সম্ভাবনার কথা বলা হলেও সেগুলো এখনো আলোচনার পর্যায়ে সীমাবদ্ধ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, তারা ‘ডায়নামিক’ নীতি অনুসরণ করছে। তবে বাস্তবে এ পদ্ধতি অনেকটাই ‘ওয়েইট অ্যান্ড সি’—যেখানে পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তার ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, সম্ভাব্য রেমিট্যান্স, প্রত্যাশিত আইএমএফ অর্থ এবং মৌসুমি আমদানি কমার মতো অনিশ্চিত ভরসার ওপর দাঁড়িয়ে যুদ্ধ পরিস্থিতি সামাল দেয়ার যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তা বাস্তব চাপের সঙ্গে একটি স্পষ্ট ফাঁক তৈরি করছে। এ ‘যদি’ আর ‘কিন্তু’ নির্ভর কৌশল ভেঙে পড়লে বিকল্প কী—সে প্রশ্নের উত্তর এখনো অনির্দিষ্টই রয়ে গেছে।

আপন দেশ/এসএস

মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়