ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বিশ্ব বাণিজ্যে অস্থিরতা চলছে। তার প্রধান হাতিয়ার ছিল শুল্ক বা ট্যারিফ। কিন্তু এবার ট্রাম্পের শুল্ক যুদ্ধে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট।
প্রধান বিচারপতি জন রবার্টসের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ ট্রাম্পের নতুন শুল্ক ঘোষণা অবৈধ বলে বাতিল করে দিয়েছেন। তারা জানিয়েছেন, ট্রাম্পের ‘ইউনিভার্সাল বেসলাইন ট্যারিফ’ সম্পূর্ণ বেআইনি। এটি যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের পরিপন্থি।
এ রায় পুরো বিশ্বের জন্য একটি বড় খবর। এর প্রভাব পড়বে বিশ্ব অর্থনীতিতে। তবে বাংলাদেশের জন্য এ রায়ের পর কী হবে, তা নিয়ে নতুন করে হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের রায়ের কারণ
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ‘আইইইপিএ’ নামের একটি আইন ব্যবহার করে বিভিন্ন দেশের ওপর শুল্ক বসিয়েছিলেন। তিনি এর কারণ হিসেবে জাতীয় নিরাপত্তার কথা বলেছিলেন। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট বলেছে ভিন্ন কথা। আদালত জানিয়েছে, এটি আসলে জাতীয় নিরাপত্তা নয়, বরং অন্য দেশের ওপর অর্থনৈতিক জবরদস্তি। এ রায়ের ফলে বাংলাদেশ ও ভারতের মতো দেশগুলোর ওপর ট্রাম্পের আগের শুল্ক চুক্তিগুলো অকার্যকর হয়ে পড়ার কথা।
ক্ষুব্ধ ট্রাম্পের ‘প্ল্যান বি’
সুপ্রিম কোর্টের এ রায়ে ট্রাম্প ভীষণ রেগে যান। হোয়াইট হাউজে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, আদালতের কিছু সদস্যকে নিয়ে আমি লজ্জিত। দেশের স্বার্থে কাজ করার সাহস তাদের নেই।
ট্রাম্প অবশ্য থেমে থাকেননি। রায়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি পাল্টা ব্যবস্থা নেন। এবার তিনি ‘ট্রেড অ্যাক্ট ১৯৭৪’-এর ১২২ ধারা ব্যবহার করেন। এ আইনে তিনি পৃথিবীর সব দেশের ওপর নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক ঘোষণা করেছেন।
বাংলাদেশের চুক্তির কী হবে?
কিছুদিন আগেই শুল্ক ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চুক্তি করেছিল বাংলাদেশ। ট্রাম্প শুরুতে বাংলাদেশের ওপর ৩৫ শতাংশ শুল্ক বসানোর হুমকি দিয়েছিলেন। এর ফলে বাংলাদেশের পোশাক খাত বড় বিপদে পড়ে যায়। ওয়ালমার্ট বা এইচঅ্যান্ডএম-এর মতো বড় ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নেয়ার কথা বলে।
বাধ্য হয়ে বাংলাদেশ ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ চুক্তিতে সই করে। তখন শুল্ক কমিয়ে ১৯ শতাংশ করা হয়। বিনিময়ে বাংলাদেশকে আমেরিকা থেকে তুলা, সয়াবিন ও চারটি বোয়িং বিমান কেনার শর্ত মানতে হয়। অর্থনীতিবিদরা একে ‘জবরদস্তিমূলক চুক্তি’ বলেছিলেন।
এখন হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চুক্তি বাতিল হচ্ছে না। অর্থাৎ বিমান বা তুলা কেনার শর্তগুলো বহাল থাকছে। তবে বাংলাদেশের শুল্ক আগের ১৯ শতাংশের বদলে এখন নতুন নিয়মে ১০ শতাংশ হবে।
১০ শতাংশ শুল্ক কি ভালো খবর?
আপাতদৃষ্টিতে ১৯ শতাংশ থেকে কমে ১০ শতাংশ হওয়াকে ভালো মনে হতে পারে। কিন্তু অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করছেন। নতুন এ ১০ শতাংশ শুল্ক মূলত ১৫০ দিনের জন্য দেয়া হয়েছে। এ ১৫০ দিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন বিভিন্ন দেশ তদন্ত করবে। তারা দেখবে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কোনো দেশ অন্যায় সুবিধা নিচ্ছে কি না।
এ সময়ে বাংলাদেশের ভেতরেও তারা নজরদারি চালাবে। কারখানার পরিবেশ কেমন, শ্রমিকরা ঠিকমতো বেতন পান কি না, পরিবেশ দূষণ হচ্ছে কি না—এগুলো যাচাই করা হবে। দেখা হবে নারী শ্রমিকদের কাজের পরিবেশও।
যদি তদন্তে বাংলাদেশের কোনো ঘাটতি পাওয়া যায়, তবে বিপদ আরও বাড়বে। তখন এই শুল্ক বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত করতে পারবেন ট্রাম্প। আর যদি সব ঠিক থাকে, তবে শুল্ক শূন্যতেও নেমে আসতে পারে।
কী ভাবছেন ব্যবসায়ীরা?
বাংলাদেশের পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে হওয়া চুক্তিটি অসম ছিল। আমাদের লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি। সেখানে অনেক কঠিন শর্ত আছে।
তিনি আরও বলেন, ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত আগে থেকে বোঝার উপায় নেই। কখন কী করেন বলা মুশকিল। এখন যে ১০ শতাংশ শুল্ক দিয়েছেন, সেটা কতদিন থাকবে তা নিয়ে আমরা নিশ্চিত নই।
বাংলাদেশের এখন কী করা উচিত?
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, সুপ্রিম কোর্টের রায় বাংলাদেশের জন্য একটি সুখবর। তবে এখন চুপচাপ থাকাই ভালো।
তিনি বলেন, পুরনো চুক্তির কঠিন শর্তগুলো নিয়ে এখন আমেরিকার সাথে আলোচনায় বসা ঠিক হবে না। এতে ট্রাম্প প্রশাসন রেগে গিয়ে বাণিজ্য কমানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আমাদের উচিত এখন সময় নেয়া।
তার মতে, বাংলাদেশের উচিত নিজেদের প্রস্তুতি জোরদার করা। কারখানার পরিবেশ বা শ্রমিক অধিকার নিয়ে যেসব ঘাটতি আছে, সেগুলো দ্রুত ঠিক করতে হবে। যাতে আমেরিকার তদন্তের সময় বাংলাদেশ সঠিক জবাব দিতে পারে।
তবে ড. জাহিদ একটি আশার কথাও শুনিয়েছেন। তিনি বলেন, ১৫০ দিনের মধ্যে এতগুলো দেশে তদন্ত শেষ করা আমেরিকার জন্য প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। তাছাড়া আমেরিকার মূল লক্ষ্য এখন চীনের দিকে। তাই বাংলাদেশ সময় কাজে লাগালে এই বিপদ থেকে রক্ষা পেতে পারে।
আপন দেশ/এমবি
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।




































