Apan Desh | আপন দেশ

মাছ লুটের ঘটনায় আ.লীগ নেতার বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন

যশোর প্রতিনিধি, আপন দেশ

প্রকাশিত: ১৬:৩৯, ৯ আগস্ট ২০২৬

মাছ লুটের ঘটনায় আ.লীগ নেতার বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন

ছবি: আপন দেশ

যশোরের কেশবপুরে ইজারা নেয়া সরকারি বাওড় থেকে মাছ লুট হয়েছে। এ মাছ লুটের অভিযোগ ওঠেছে বর্তমান নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের এক নেতার বিরুদ্ধে। অভিযুক্তের নাম মুজিবার রহমান মুজ। তিনি হত্যা মামলাসহ বেশ কয়েকটি মামলার আসামি বলেও জানা।

মৎস্যজীবীদের অভিযোগ, মির্জানগর বাওড় থেকে প্রতিদিন মাছ ধরে নিয়ে যাচ্ছেন মুজিবার রহমান মুজ ও তার লোকজন।

রোববার (০৯ আগস্ট) সংবাদ সম্মেলন চলার সময়ও তাকে বাওড় থেকে মাছ ধরতে দেখা গেছে বলে দাবি মৎস্যজীবীদের।

সরকারের কাছ থেকে প্রতি বছর দুই লাখ টাকা হারে মির্জানগর বাওড়টি ইজারা নিয়েছে বেগমপুর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেড। সমিতির সভাপতি আব্দুল আজিজের মাধ্যমে ২০২৬ সাল থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত তিন বছরের জন্য বাওড়টি ইজারা নেয়া হয়েছে।

সমিতির সদস্যদের দাবি, চলতি বছর বাওড়ে প্রায় ২০ লাখ টাকার মাছ ছাড়া হয়েছে। সেখান থেকে নিয়মিত মাছ ধরে নিয়ে যাওয়ায় সমিতির ১০১ জন সদস্য আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

তাদের ভাষ্য, এভাবে চলতে থাকলে তারা পথে বসবেন।

এ ঘটনায় বিচার ও প্রতিকার চেয়ে রোববার সকাল ১০টায় মির্জানগর বাওড়ের তীরে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন মৎস্যজীবী সমিতির সদস্যরা।

সংবাদ সম্মেলনে সমিতি ও গ্রামবাসীর পক্ষে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ত্রিমোহিনী ইউনিয়ন পরিষদের তিনবার নির্বাচিত সাবেক সদস্য শেখ আব্দুস সাত্তার।

বক্তব্যে শেখ আব্দুস সাত্তার বলেন, কেশবপুর উপজেলার মির্জানগর ১১ নম্বর মৌজায় সরকারি বাওড়টি অবস্থিত। এর সিএস খতিয়ান নম্বর ১৯, ২০ ও ২১। দাগ নম্বর ৬৪১, ১১৭৩ ও ৮৩০। বাওড়টির জমির পরিমাণ ১৭ একর ৫২ শতক।

তার দাবি, সিএস রেকর্ডে ওই সম্পত্তির মালিক ছিলেন তৎকালীন ভারত সম্রাটের অধীন দখলদার জমিদার তারেকেশ্বর পাল চৌধুরী। তার ঠিকানা ছিল রানাঘাট, জেলা নদীয়া।

আরও পড়ুন <<>> বিদ্যুৎ-জ্বালানি নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে: প্রধানমন্ত্রী

শেখ আব্দুস সাত্তারের বক্তব্য অনুযায়ী, জমিটি বাওড় শ্রেণির হওয়ায় ১৯৫০ সালের জমিদারি উচ্ছেদ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ২০ ধারার বিধান অনুযায়ী সরকারি সম্পত্তিতে পরিণত হয়। পরে পূর্ব পাকিস্তান সরকারের পক্ষে যশোরের ডেপুটি কালেক্টর ওই সম্পত্তির মালিকানা নেন।

তার ভাষ্য, এসএ রেকর্ডের সময় মনিরামপুর উপজেলার লক্ষ্মীকান্তপুর গ্রামের চাঁদ আলী গাজীর ছেলে মো. ইসমাইল গাজীর নামে ভুলভাবে সম্পত্তিটি রেকর্ড করা হয়। পরে ১০৬/৩৮ ও ১৯৬৪ নম্বর মামলার মাধ্যমে তৎকালীন সেটেলমেন্ট কর্মকর্তা এসএন্ডএস ম্যানুয়ালের ৫৩৩ ধারার বিধান অনুযায়ী ওই রেকর্ড বাতিল করেন। সরকারের নামে রেকর্ড বহাল রাখা হয়।

তিনি আরও বলেন, ১৯৫৪ সালে মির্জানগর বাওড়ের ১৯ নম্বর খতিয়ানের ১৩ নম্বর সিএ রোল প্রস্তুত করা হয়। পরে বাড়ির ঠিকানা অনুযায়ী নড়াইল থানার ৬/৩ নম্বর সিএ রোলে তা অন্তর্ভুক্ত হয়। আশুতোষ রায়, পিতা অনাথ রায়, গ্রাম ব্রহ্মনডাঙ্গা, থানা নড়াইলকে তৎকালীন ৬২০ টাকা ৯৯ পয়সা ক্ষতিপূরণ দেয়ার পর সরকার ১৬ আনা সম্পত্তির মালিকানা লাভ করে।

এরপর থেকে জলমহালটি সরকারের দখলে রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। এর খাজনা প্রাপ্তির খতিয়ান নম্বর ১৯ এবং তৌজি নম্বর ৫৭৫৪।

শেখ আব্দুস সাত্তারের দাবি, ১৯৫৫ সালে সিএস রেকর্ডীয় মালিক রেভিনিউ সেলের মাধ্যমে নড়াইলের জমিদার আশুতোষ রায়ের কাছে সম্পত্তিটি বিক্রি করেন। পরে ওই সম্পত্তি ১৭ নম্বর গোপসেনা মৌজার ৩ নম্বর সিএ রোলে অন্তর্ভুক্ত হয়।

তার ভাষ্য, সরকার চারটি সিএ রোল প্রস্তুত করে তৎকালীন জমিদারদের ক্ষতিপূরণ দেয়। এরপর অধিগ্রহণের মাধ্যমে বাওড়টির ১৬ আনা সম্পত্তির মালিকানা সরকার লাভ করে।

শেখ আব্দুস সাত্তার আরও বলেন, পরবর্তীতে মির্জানগর গ্রামের সাহিদা খাতুন ও আব্দুর রশিদ ওই সম্পত্তির মালিকানা দাবি করে যশোরের সাবজজ আদালতে মামলা করেন। মামলাটি ছিল দেওয়ানি ৬৫/৬৮।

ওই মামলায় ইসমাইল গাজীকে এক নম্বর বিবাদী এবং সরকারকে দুই নম্বর বিবাদী করা হয়। তবে তার দাবি, সরকারকে ওই মামলার বিষয়ে কোনো সমন বা নোটিশ দেওয়া হয়নি।

ফলে এক নম্বর বিবাদীর সঙ্গে আপসের ভিত্তিতে একতরফা রায় নেয়া হয় বলে তিনি দাবি করেন।

তবে মামলার এক নম্বর বিবাদী ইসমাইল গাজী ১৯৬৮ সালের ২৪ অক্টোবর আদালতে হাজির হয়ে লিখিত বক্তব্য দেন। সেখানে তিনি জানান, বাদীর করা মামলা সঠিক নয়। বাওড়টির প্রকৃত মালিক সরকার।

শেখ আব্দুস সাত্তারের ভাষ্য, পরে ১৯৭৯ সালে ইসমাইল গাজী মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে মামলার বাদীদের সঙ্গে আপস করেন। এরপর সাহিদা খাতুনসহ অন্যরা একতরফা আপসের রায় ও ডিক্রির ভিত্তিতে নামজারি করে সরকারি বাওড়টি দখলের চেষ্টা করেন।

এ খবর পেয়ে সরকারের পক্ষে শেখ আব্দুস সাত্তার তৎকালীন ভূমি প্রতিমন্ত্রীর কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিমন্ত্রী যশোরের জেলা প্রশাসককে বিষয়টি তদন্ত করে প্রতিবেদন দেয়ার নির্দেশ দেন।

এ সংক্রান্ত স্মারক নম্বর ৩২০১/এসএ। তারিখ ১১ ডিসেম্বর ১৯৯৩।

জেলা প্রশাসক তদন্ত শেষে ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯৯৪ তারিখে সরকারি জলমহালটি সরকারের অনুকূলে রাখার বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদন দেন বলে দাবি করেন শেখ আব্দুস সাত্তার।

পরবর্তীতে বাওড়টি এসএ ও আরএস রেকর্ডে সরকারের এক নম্বর খতিয়ানে রেকর্ডভুক্ত করা হয় বলেও তিনি জানান।

শেখ আব্দুস সাত্তার বলেন, সরকারি সম্পত্তির পক্ষে অবস্থান নেয়ায় মুজিবার রহমান মুজ ও তার লোকজন তার এবং সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আদালতে একাধিক মামলা করেন। এসব মামলায় সরকারের পক্ষে রায় হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

তার অভিযোগ, এতে ক্ষুব্ধ হয়ে মুজিবার রহমান মুজ ও তার লোকজন ২০১২ সালে তার ছোট ভাই শেখ আব্দুল্লাহ বাবুকে হত্যা করেন। এ ঘটনায় করা মামলার নম্বর ১২/১৭/০১/২০১২। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে।

শেখ আব্দুস সাত্তারের আরও অভিযোগ, তাকে নিজের বাড়ি থেকেও বিতাড়িত করা হয়েছে। বর্তমানে সহায়-সম্বল হারিয়ে পরিবার নিয়ে তিনি বেনাপোলে বসবাস করছেন।

তিনি বলেন, সরকারের পক্ষে মামলা পরিচালনা করতে গিয়ে তিনি ভিটেবাড়িসহ সর্বস্ব হারিয়েছেন। একই সঙ্গে মুজিবার রহমান মুজ ও তার লোকজন প্রতিদিন বাওড় থেকে মাছ ধরে নিয়ে যাচ্ছেন। এতে মৎস্যজীবী সমিতির সদস্যরা সর্বস্বান্ত হচ্ছেন।

শেখ আব্দুস সাত্তার বলেন, রোববারের সংবাদ সম্মেলনের খবর মুজিবার রহমান মুজ ও তার লোকজন আগে থেকেই জানতেন। এরপরও তারা বাওড় থেকে জোর করে মাছ ধরে নিয়ে যান।

তিনি বলেন, সংবাদ সম্মেলন চলার সময়ও মুজিবার রহমান মুজকে বাওড় থেকে মাছ ধরতে দেখা গেছে।

এ ঘটনায় তদন্ত করে মুজিবার রহমান মুজ ও তার লোকজনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান তিনি। একই সঙ্গে জেলা প্রশাসকসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সরকারি বাওড় রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহবান জানান।

সংবাদ সম্মেলনে মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি আব্দুল আজিজসহ স্থানীয় বাসিন্দারা উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে বাওড় থেকে মাছ ধরার অভিযোগের বিষয়ে মুজিবার রহমান মুজের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি সাংবাদিকের ওপর চড়াও হন বলে জানা গেছে।

আপন দেশ/এসএস

মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়