Apan Desh | আপন দেশ

কারাগারে গাজী নজরুল, এমপি পদ নিয়ে দায় ঠেলাঠেলি

বিশেষ প্রতিবেদক, আপন দেশ

প্রকাশিত: ২১:১৪, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আপডেট: ২১:৪০, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কারাগারে গাজী নজরুল, এমপি পদ নিয়ে দায় ঠেলাঠেলি

গাজী নজরুল ইসলাম

মহান মুক্তিযুদ্ধের যোদ্ধা। ভীড়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি জামায়াতে। সেখান থেকেও বহিষ্কার, সংসদীয় কমিটি থেকে বাদ। এরপর দ্বিতীয় ‘স্ত্রী’ মরিয়ম খাতুনের মৃত্যুর ঘটনায় আত্মহত্যার প্ররোচনার মামলায় গ্রেফতার। এখন তিনি কারাগারে।

একটার পর একটা ঘটনায় রাজনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত সাতক্ষীরা-৪ আসনের এমপি গাজী নজরুল ইসলাম। কিন্তু এত কিছুর পরও অক্ষত রয়ে গেছে তার এমপি পদ। দল বলছে, তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে; নির্বাচন কমিশন বলছে, সংসদের চিঠি ছাড়া তাদের হাত-পা বাঁধা; আর সংসদ সচিবালয় বলছে, এখনো কোনো সিদ্ধান্তই হয়নি। ফলে গুরুতর অভিযোগ ও  গ্রেফতারের মধ্যেও এমপি পদটি যেন আটকে আছে এক অদৃশ্য প্রশাসনিক জটের ফাঁসে।

বহিষ্কার হলো, পদ গেল না

গত ২১ জুলাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় শুরু হয়। পরদিন নৈতিক স্খলনের অভিযোগ এনে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।

শুধু বহিষ্কার করেই থামেনি দলটি। তার এমপি পদ বাতিলের দাবিও জানানো হয় নির্বাচন কমিশনের কাছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে- দলীয় পদ হারানোর পর এমপি পদও কি যাবে? কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টো চিত্র। দলীয় বহিষ্কার কার্যকর হলেও এমপি পদ বহালই থেকে যায়। নির্বাচন কমিশনের যুক্তি, দল থেকে বহিষ্কার করলেই কোনো এমপিদের পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায় না।

সংসদের দরজায় আটকে ইসির সিদ্ধান্ত

গাজী নজরুলের এমপি পদ নিয়ে এখন যেন সংসদ ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যে এক ধরনের ‘দায় ঠেলাঠেলি’ তৈরি হয়েছে।
ইসির বক্তব্য- সংসদ সচিবালয় আনুষ্ঠানিকভাবে না জানালে তারা নিজেরা কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। অর্থাৎ জামায়াতের বহিষ্কারপত্র হাতে থাকলেও সেটিকে ভিত্তি করে সরাসরি এমপি পদ বাতিলের সুযোগ নেই।

আরও পড়ুন<> আত্মহত্যা করেছে সে নিজে নিজে: গাজী নজরুল

নির্বাচন কমিশনার মাসউদ জানিয়েছেন, সংসদ তাদের রুলস অব প্রসিডিউর অনুযায়ী বিষয়টি কমিশনকে জানাবে। সংসদ সচিবালয়ের কাছ থেকে চিঠি পেলে কমিশন সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে। অর্থাৎ ইসির টেবিলে ফাইল থাকলেও সিদ্ধান্তের চাবি যেন সংসদ সচিবালয়ের হাতে।

সংসদে নেই কোনো নড়াচড়া

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয়, গাজী নজরুলকে নিয়ে এত আলোচনা-সমালোচনা হলেও তার এমপি পদ নিয়ে জাতীয় সংসদে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি।

সংসদ সচিবালয় সূত্র বলছে, গাজী নজরুলের বিষয়ে সংসদে এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের আলোচনা হয়নি। তিনি মুক্তিযোদ্ধা। এখন আছেন বিরোধী শক্তির সঙ্গে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি ও সরকারি প্রতিশ্রুতি কমিটিতে তার নাম দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তার পুরনো সংগঠন জামায়াতের অনুরোধে কমিটি থেকে তার নাম বাদ দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়। অর্থাৎ কমিটির দরজা বন্ধ হয়েছে, কিন্তু এমপি পদের দরজা খোলা রয়ে গেছে।

এ নিয়েও ভেতরে ভেতরে আপত্তি ওঠে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এর বিরোধিতা করেছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। পরে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের হস্তক্ষেপে তাকে পুরোপুরি বাদ না দেয়ার সিদ্ধান্ত হয় বলে সূত্রের দাবি। তবে এমপি হিসেবে তার মূল অবস্থান নিয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি।

নৈতিক স্খলনের পরও ন্যাম ভবনে অবস্থান

নৈতিক স্খলনের অভিযোগ ওঠার পরও গাজী নজরুল ইসলাম রাজধানীর ন্যাম ভবনে অবস্থান করছিলেন বলে জানা গেছে। এমনকি সংসদ সচিবালয়ের বিপরীত পাশে থাকা ওই সরকারি আবাসন থেকেই শেষ পর্যন্ত তাকে গ্রেফতার করা হয়। এর মধ্যে সর্বশেষ সংসদ অধিবেশনেও তিনি অংশ নেননি। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেয়ার সুযোগও তিনি পাননি বলে জানা গেছে। তারপর গত রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) ঘটে আরও নাটকীয় ঘটনা। ন্যাম ভবনের বাসা থেকে তার দ্বিতীয় ‘স্ত্রী’ মরিয়ম খাতুনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এরপর আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগে গাজী নজরুল ইসলামকে গ্রেফতার করা হয়। একজন এমপিদের বিরুদ্ধে দলীয় বহিষ্কার থেকে শুরু করে এবার ফৌজদারি মামলায় গ্রেফতার- ঘটনার পর ঘটনা জমতে থাকলেও এমপি পদ নিয়ে সংসদের নীরবতা কাটেনি।

গ্রেফতারেও কি বদলাবে চিত্র?

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- গাজী নজরুল  গ্রেফতার হওয়ার পর সংসদ কি এবার নড়বে? জাতীয় সংসদ সচিব গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি। সিদ্ধান্ত হলে জানানো হবে। অর্থাৎ  গ্রেফতারের পরও সংসদীয় প্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন হয়নি।

এদিকে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্যও আগের জায়গাতেই। কমিশনের মতে, কোনো এমপি  গ্রেফতার হলেই তার সদস্যপদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হওয়ার বিধান নেই। সংসদ সচিবালয়কে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানাতে হবে এবং এরপরই কমিশন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবে।

অভিযোগ গুরুতর, কিন্তু রায় হয়নি

গাজী নজরুলের বিরুদ্ধে যে অভিযোগে মামলা হয়েছে, সেটি গুরুতর হলেও একটি মৌলিক বিষয় মনে রাখা জরুরি- মামলা বা  গ্রেফতার আদালতের চূড়ান্ত রায় নয়। আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি এখনো হয়নি। ফলে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের বিষয়টি তদন্ত ও আদালতের ওপরই নির্ভরশীল। তবে রাজনৈতিক বাস্তবতায় গ্রেফতারের ঘটনাটি তার অবস্থানকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। কারণ এর আগেই দলীয় বহিষ্কার এবং সংসদীয় কমিটি থেকে বাদ দেয়ার ঘটনা ঘটেছে।

তিন দরজায় তিন অবস্থান

গাজী নজরুলকে ঘিরে এখন তিনটি প্রতিষ্ঠানের অবস্থান যেন তিন রকম। জামায়াত বলছে বহিষ্কার। সংসদ সচিবালয় বলছে- এখনো সিদ্ধান্ত নেই। নির্বাচন কমিশন বলছে- সংসদের চিঠি ছাড়া ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ নেই।
ফলে প্রশ্নটি ঘুরেফিরে একই জায়গায় এসে ঠেকছে- এমপি পদ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে কে, কখন এবং কোন প্রক্রিয়ায়?

রাজনৈতিক অঙ্গনে বহিষ্কার, আইনি অঙ্গনে  গ্রেফতার, আর সাংবিধানিক অঙ্গনে অপেক্ষা- এ তিনের মাঝখানে আটকে আছে সাতক্ষীরা-৪ আসনের এমপি গাজী নজরুল ইসলামের এমপি পদ। এখন দেখার বিষয়, সংসদের নীরবতার তালা কবে খুলবে। আর সে তালা খুললেই কি ইসির টেবিলে পড়ে থাকা সিদ্ধান্তের ফাইলও নড়বে- নাকি গাজী নজরুলের এমপি পদ নিয়ে টানাপোড়েন আরও দীর্ঘ হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

আপন দেশ/এবি

মন্তব্য করুন ।। খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত,আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়