Apan Desh | আপন দেশ

বিএনপি নেতা মতিনের গুম-কারাবাসের অন্ধকার অধ্যায়

নিজস্ব প্রতিবেদক, আপন দেশ

প্রকাশিত: ১৩:৫৮, ৩১ আগস্ট ২০২৬

আপডেট: ১৭:৫৩, ৩১ আগস্ট ২০২৬

বিএনপি নেতা মতিনের গুম-কারাবাসের অন্ধকার অধ্যায়

এম এ মতিন। ছবি: আপন দেশ

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশে গুমের ঘটনাগুলোর তদন্ত, নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান এবং দায়ীদের জবাবদিহির প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে।

গুমবিষয়ক তদন্ত কমিশনের কাছে জমা পড়া অভিযোগগুলোর অনুসন্ধানেও উঠে এসেছে ভয়াবহ সব তথ্য।

এ প্রেক্ষাপটে আলোচনায় আসছে গুমের শিকার হয়ে ফিরে আসা ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতাও। তাদের মধ্যে রয়েছেন বাড্ডা থানা বিএনপির অন্যতম যুগ্ম আহবায়ক এম এ মতিন।

২০১৫ সালের ২০ অক্টোবর রাজধানীর নিজ বাসার সামনে থেকে তাকে সাদা পোশাকধারী ব্যক্তিরা তুলে নিয়ে যায়। এরপর টানা ২৫ দিন তার কোনো সন্ধান পাননি স্বজনরা। পরিবারের সদস্যদের কাছে সে সময় ছিল চরম আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার। কোথায় নেয়া হয়েছে, কী অবস্থায় আছেন কিংবা আদৌ জীবিত কি না কোনো প্রশ্নেরই উত্তর ছিল না তাদের কাছে।

২৫ দিন পর তার সন্ধান মিললেও সেখানেই শেষ হয়নি এম এ মতিনের দুর্ভোগ।

তাবেলা হত্যা মামলায় জড়ানো

পরবর্তীতে আলোচিত ইতালীয় নাগরিক তাবেলা সিজার হত্যা মামলায় এম এ মতিনকে আসামি করা হয়। একই ঘটনায় তার ভাই, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং বিএনপির ক্ষুদ্রঋণবিষয়ক সম্পাদক এম এ কাইয়ূমসহ বিএনপির আরও কয়েকজন নেতাকর্মীকে মামলায় জড়ানো হয়।

এম এ মতিনের স্বজন ও রাজনৈতিক সহকর্মীদের অভিযোগ, তুলে নেয়ার পর তাকে গোপন স্থানে রাখা হয় এবং নির্যাতন করা হয়। তাদের দাবি, বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং এম এ কাইয়ূমের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তার কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছিল।

গুমের আগে গ্রেফতারকৃত বিএনপি নেতা এম এ মতিন। ছবি: সংগৃহীত

তবে দল ও নেতৃত্বের প্রতি তার অটুট আনুগত্যের কারণে এম এ মতিনকে দিয়ে এমন কোনো বক্তব্য বলানো সম্ভব হয়নি বলে দাবি করেছেন তার রাজনৈতিক সহকর্মীরা। তাদের ভাষ্য, নির্যাতন ও চাপের মুখেও তিনি দলীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে মিথ্যা বা সাজানো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেফতার ও নিপীড়নের যেসব অভিযোগ ছিল, এম এ মতিনের ঘটনাটি ছিল তার একটি আলোচিত উদাহরণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গুম থেকে কারাগার

২৫ দিনের নিখোঁজ জীবনের পর শুরু হয় আরেক দীর্ঘ অধ্যায় মামলা ও কারাবাস। বছরের পর বছর আদালত, কারাগার ও আইনি লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাকে। একটি পরিবারের জন্য এ সময় ছিল দীর্ঘ অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপের।

দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে অবশেষে ২০২৫ সালের ৩ জুলাই আদালতের রায়ে এম এ মতিন খালাস পান।

প্রায় এক দশক পর পাওয়া এ খালাস তার জীবনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করলেও হারিয়ে যাওয়া সময় এবং গুমের সে ২৫ দিনের অভিজ্ঞতা তার জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ স্মৃতি হয়ে আছে।

গুম থেকে ফিরে আন্দোলনের সম্মুখসারিতে

গুম থেকে ফিরে এম এ মতিন রাজনীতি থেকে সরে যাননি। বরং স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তিনি অনন্য সাধারণ ভূমিকা রাখেন বলে জানিয়েছেন তার সহকর্মীরা।

দীর্ঘ কারাবাস, মামলা ও নির্যাতনের অভিজ্ঞতা তাকে আরও দৃঢ় করে। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা এবং রাজনৈতিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে বিএনপির আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নেন।

রাজনৈতিক সহকর্মীদের মতে, গুমের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তাকে ভেঙে দিতে পারেনি; বরং আন্দোলনের প্রতি তার অঙ্গীকার আরও শক্তিশালী করেছে। ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ঝুঁকি উপেক্ষা করে তিনি স্বৈরাচারবিরোধী কর্মসূচিতে মাঠে ছিলেন।

যারা ফিরেছেন, তারাও সাক্ষী

বাংলাদেশে গুমের অভিযোগে নিখোঁজ হওয়া অনেক মানুষ আর কখনো ফিরে আসেননি। তাদের পরিবারের কাছে আজও সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- প্রিয়জন কোথায়? এ বাস্তবতায় এম এ মতিনের মতো যারা ফিরে এসেছেন, তাদের অভিজ্ঞতা গুমের অভিযোগগুলোর অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

আরও পড়ুন: জাহাজ ভাঙার বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দেড় হাজার কোটি টাকার প্রকল্প

নিজে গুমের শিকার হওয়ার কারণে নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের দীর্ঘ অপেক্ষা ও অসহায়ত্ব খুব কাছ থেকে উপলব্ধি করেন এম এ মতিন। একজন মানুষ হঠাৎ করে নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবারের সামনে দিনের পর দিন যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, তার নিজের পরিবারও সে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছে।

ইলিয়াস আলীর মতো অনেকেই ফেরেননি

গুমের ঘটনাগুলোর আলোচনায় সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত নামগুলোর একটি বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলী। ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল থেকে তিনি নিখোঁজ। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তার পরিবারের অপেক্ষার অবসান হয়নি।

ইলিয়াস আলীর মতো অনেকের ভাগ্যে কী ঘটেছে, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও অজানা। এখানেই এম এ মতিনের ঘটনার সঙ্গে অন্যদের পার্থক্য। তিনি ফিরে এসেছিলেন। তবে ফিরে আসার পরও তাকে দীর্ঘ কারাবাস ও আইনি লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।

শেষ পর্যন্ত আদালতের খালাস তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ থেকে মুক্তি দিলেও জীবনের হারিয়ে যাওয়া সময় ফিরিয়ে দিতে পারেনি।

এখন প্রশ্ন জবাবদিহির

গুমের অভিযোগগুলোর তদন্ত এখন দেশের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রশ্ন। কারা এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিল, কীভাবে একজন মানুষকে তুলে নিয়ে দিনের পর দিন গোপন স্থানে রাখা হতো এবং পরে বিভিন্ন মামলায় জড়ানোর অভিযোগ উঠেছে—এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি জোরালো হচ্ছে। 

এম এ মতিনের জীবনের ঘটনাপ্রবাহ সেই সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি প্রতিচ্ছবি। নিজ বাসার সামনে থেকে তুলে নেয়ার অভিযোগ।

২৫ দিনের নিখোঁজ জীবন

তারেক রহমান ও এম এ কাইয়ূমের সংশ্লিষ্টতার স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা। দল ও নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্যের কারণে সে বক্তব্য দিতে অস্বীকৃতি। তারপর হত্যা মামলায় জড়িয়ে দীর্ঘ কারাবাস। গুম থেকে ফিরে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা। সবশেষে প্রায় এক দশক পর আদালতের খালাস।

একজন রাজনৈতিক কর্মীর জীবনের এ দীর্ঘ পথচলা এখন শুধু ব্যক্তিগত দুর্ভোগের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে গুম, নিপীড়ন, রাজনৈতিক আনুগত্য ও বিচারহীনতার অভিযোগের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

প্রশ্ন এখন একটাই, অতীতের অন্ধকারের সত্য কি পুরোপুরি সামনে আসবে। আর ভুক্তভোগীরা কি পাবেন তাদের প্রত্যাশিত ন্যায়বিচার?

আপন দেশ/এনএম/এসএস

মন্তব্য করুন ।। খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত,আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়