ছবি : সংগৃহীত
অভিনয় জগতে পরিচিত মুখ তমা মির্জা। ক্যামেরা, আলো আর পরিচালকের নির্দেশনাই ছিল তার কর্মজগতের মূল পরিসর।
তবে প্রায় তিন মাস আগে হঠাৎ করেই পেশাজীবনে নতুন অধ্যায় শুরু করেছেন এ অভিনেত্রী। যোগ দিয়েছেন বেসরকারি ব্যাংক এবি ব্যাংকে। ব্যাংকটির অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট (এভিপি), বিভাগ— ব্রেন্ড অ্যান্ড কমিউনিকেশনস।
চাকরিতে যোগ দেয়ার বিষয়টি এতদিন প্রকাশ্যে না এলেও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেই তা জানান তমা মির্জা। এরপর থেকেই বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, ব্যাংকিং খাতে পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়া একজন অভিনেত্রী কীভাবে সরাসরি এভিপি পদে নিয়োগ পেলেন?
নিয়োগের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন
তমা মির্জা মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। অভিনয়েও তার দীর্ঘ ১৬ বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে। কিন্তু ব্যাংকিং খাতে তাঁর পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল কি না, থাকলে কত বছরের এ নিয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও এবি ব্যাংকের পর্যবেক্ষক আরিফ হোসেন খান বিষয়টি শুনে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, তমা মির্জাকে কোন যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া হয়েছে, তা তার জানা নেই। বিষয়টি ব্যাংকের কাছে জানতে চাওয়া হবে।
আরিফ হোসেন খান বলেন, ব্যাংকের প্রতিটি পদের জন্য নির্দিষ্ট যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয়। এ ক্ষেত্রে কী বিবেচনা করা হয়েছে, তা যাচাই করা হবে।
সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেক কর্মকর্তার ভাষ্য, বেসরকারি ব্যাংকের এভিপি পদে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে সাধারণত আট থেকে ১০ বছরের অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়। ফলে তমা মির্জার ক্ষেত্রে কোন যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা বিবেচনা করা হয়েছে, সেটিই এখন আলোচনার মূল বিষয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বোর্ডও জানত না?
নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে আরও একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার দাবি, বেসরকারি ব্যাংকের বিভিন্ন নিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট নিয়োগ বোর্ডকে অবহিত করার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু তমা মির্জার নিয়োগের তথ্য বোর্ডকে জানানো হয়নি।
বিষয়টি পরবর্তী বোর্ড সভায় তোলা হতে পারে বলেও জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই কর্মকর্তা। এতে নিয়োগটি ব্যাংকের নিজস্ব নীতিমালা অনুযায়ী হয়েছে কি না, সে প্রশ্নও সামনে এসেছে।
আর্থিক চাপে এবি ব্যাংক
তমা মির্জার নিয়োগের পাশাপাশি আলোচনায় এসেছে এবি ব্যাংকের আর্থিক পরিস্থিতিও।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে এবি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা, যা ব্যাংকটির মোট ঋণের প্রায় ৫৪ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংকটির বিতরণ করা প্রতি ১০০ টাকা ঋণের মধ্যে প্রায় ৫৪ টাকাই খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে।
২০২৫ সালে ব্যাংকটির নিট লোকসান ছিল প্রায় ৩ হাজার ৮৮৯ কোটি টাকা। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ঋণাত্মক ২১ টাকা ৬২ পয়সা। একই সময়ে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভি) দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ৫৭ টাকা ৮৫ পয়সায়।
এ ছাড়া ২০২৫ সালের হিসাবে বিনিয়োগের বিপরীতে ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতি ছিল প্রায় ৫৬৬ কোটি ৫১ লাখ টাকা।
‘নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা’ নিয়েও প্রশ্ন
এবি ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার এমন পরিস্থিতিতে ব্র্যান্ড অ্যান্ড কমিউনিকেশনস বিভাগের নতুন এভিপি পদে নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ব্যাংকটির কয়েকজন নির্বাহী।
তাদের ভাষ্য, ব্যাংকটির বর্তমান আর্থিক বাস্তবতায় ব্যয় কমানো যেখানে গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে নতুন করে উচ্চপদে নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা এবং এর সাংগঠনিক ও ব্যবসায়িক যুক্তি স্পষ্ট হওয়া দরকার।
এর মধ্যে ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা তমা মির্জার নিয়োগ রাজনৈতিক সুপারিশে হয়েছে বলে দাবি করেছেন। তবে এ দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
ব্যাংক কর্তৃপক্ষের বক্তব্য কী?
তমা মির্জার নিয়োগের বিষয়ে এবি ব্যাংকের সদ্য দায়িত্ব নেওয়া ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিফ বিল্লাহ আদিলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
তমা মির্জার সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। তিনিও এ বিষয়ে প্রকাশ্যে বিস্তারিত কোনো বক্তব্য দেননি।
ফলে এখন পর্যন্ত তার নিয়োগের যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ার বিস্তারিত ব্যাখ্যা ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেই আসার অপেক্ষায় রয়েছে।
প্রশ্নটা তমাকে নিয়ে নয়, নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে
একজন পরিচিত অভিনয়শিল্পীর ব্যাংকে চাকরিতে যোগ দেয়া নিজে কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। তার আইন বিষয়ে শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠান চাইলে নিজস্ব প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন পেশার অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে নিয়োগ দিতেই পারে।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে যখন নিয়োগটি ব্যাংকের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থাপনা পদে এভিপি হিসেবে। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতে পূর্ব অভিজ্ঞতা, পদের নির্ধারিত যোগ্যতা এবং নিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে অবহিত করার বিষয়গুলো সামনে আসায় নিয়োগ প্রক্রিয়াটি নিয়ে স্বচ্ছ ব্যাখ্যার প্রয়োজন তৈরি হয়েছে।
হাজারো চাকরিপ্রার্থী যেখানে বছরের পর বছর অভিজ্ঞতা অর্জন করে ধাপে ধাপে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পদে ওঠার চেষ্টা করেন, সেখানে একজন তারকার সরাসরি এভিপি পদে নিয়োগ স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করেছে।
তাই আলোচনার কেন্দ্রে এখন শুধু তমা মির্জা নন; বরং এবি ব্যাংকের নিয়োগনীতি, পদটির যোগ্যতার মানদণ্ড এবং পুরো নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাই বড় প্রশ্ন। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরবর্তী পর্যবেক্ষণ ও এবি ব্যাংক কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যাতেই এসব প্রশ্নের উত্তর মিলতে পারে।
আপনদেশ/মিম/এনএম
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।





































