Apan Desh | আপন দেশ

অপরাধীর পরিচয় কেবলই অপরাধী, রাজনৈতিক পরিচয় নয়: প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক, আপন দেশ 

প্রকাশিত: ১৩:২৫, ১১ মে ২০২৬

আপডেট: ১৩:৪৯, ১১ মে ২০২৬

অপরাধীর পরিচয় কেবলই অপরাধী, রাজনৈতিক পরিচয় নয়: প্রধানমন্ত্রী

ছবি: আপন দেশ

পুলিশ বাহিনীকে কারও রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবশালী পরিচয় দেখে থমকে না যাওয়ার আহবান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, কারও রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবশালী পরিচয় দেখে থমকে যাবেন না। আপনারা আইনের লোক, কোনো বিশেষ দলের নন। যে অপরাধী, তাকে অপরাধী হিসেবেই গণ্য করবেন।

সোমবার (১১ মে) সকালে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শাপলা হলে পুলিশ সপ্তাহ ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী পুলিশের পেশাদারিত্ব, আধুনিকায়ন, বিগত সরকারের অর্থনৈতিক অনিয়ম এবং একটি মানবিক রাষ্ট্র গঠনের রূপরেখা তুলে ধরেন।

পুলিশ বাহিনীকে রাষ্ট্র ও জনগণের সেবায় উৎসর্গিত হওয়ার আহবান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে বর্তমান সরকার আপসহীন।

তারেক রহমান তার বক্তব্যের শুরুতেই একটি নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, এটি কেবল একটি স্লোগান নয়, এটি আমাদের সকলের প্রাণের আকাঙ্ক্ষা। আমি বিশ্বাস করি একজন নাগরিক হিসেবে এবং ইন জেনারেল একজন মানুষ হিসেবে আপনারা এ আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন চাইবেন। তিনি স্বীকার করেন যে, এ লক্ষ্য বাস্তবায়ন করা কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং, কিন্তু সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এটি সম্ভব। আর এ স্বপ্নের প্রথম ধাপই হলো দেশের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ এবং জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী কঠোর বার্তা দিয়ে বলেন, প্রশাসনের প্রতিটি পদই গুরুত্বপূর্ণ। শুধুমাত্র পদোন্নতি কিংবা পছন্দের জায়গায় পোস্টিং পাওয়ার জন্য তদবির করা পেশাদারিত্বের সঙ্গে আপস করার নামান্তর। তিনি বলেন, হয়তো চাহিদামত পোস্টিং পেলে আপনি সাময়িকভাবে তুষ্ট হবেন, কিন্তু এটি আপনার প্রফেশনালিজমের ক্ষতি করে। যার যেখানে দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে, সেখানেই গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করুন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, সরকার যেমন পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত, তেমনি প্রশাসনের কোনো পদই কারো জন্য চিরস্থায়ী নয়।

প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে অপরাধের ধরণ পাল্টে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে পুলিশিং আর কেবল শহর বা জেলার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। ‘ট্রান্সন্যাশনাল অর্গানাইজড ক্রাইম’ এখন বড় বাস্তবতা। কয়েক দশক আগের তুলনায় বর্তমানের চ্যালেঞ্জ অনেক বেশি বিস্তৃত। তাই প্রতিটি পুলিশ কর্মকর্তাকে আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষ এবং বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী হতে হবে। সময়ের এ দাবি মেটাতে না পারলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব হয়ে পড়বে।

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বিগত দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনের ফলে সৃষ্ট ভঙ্গুর অর্থনীতির চিত্র তুলে ধরেন। অডিটর জেনারেলের রিপোর্টের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি কিছু চাঞ্চল্যকর দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ করেন:

রূপপুর প্রকল্প: তিনি জানান, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কোয়ার্টারের জন্য একেকটি বালিশ কেনা হয়েছে ৮০ হাজার টাকায়। যেখানে পাশের দেশে একই ধরণের প্রকল্প ১৪ হাজার কোটি টাকায় শেষ হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশে খরচ হয়েছে প্রায় ৯৬ হাজার কোটি টাকা। ৩০ হাজার টাকার ড্রেসিং টেবিলের দাম দেখানো হয়েছে ৪-৫ লক্ষ টাকা।

আরও পড়ুন<<>>অব্যবহৃত ৬ শিশু হাসপাতাল চালুর নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

কর্ণফুলী টানেল: কর্ণফুলী টানেলের দুপাশে গাছ লাগানোর জন্য বরাদ্দকৃত ৫০ কোটি টাকা কোনো কাজ ছাড়াই তুলে নেয়া হয়েছে। এছাড়া টানেলের পাশে অপ্রয়োজনীয় লাক্সারি অ্যাপার্টমেন্ট তৈরিতে শত শত কোটি টাকা অপচয় করা হয়েছে।

পিরোজপুরের ঘটনা: পিরোজপুর জেলার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, একটি মিনিস্ট্রি (এলজিআরডি) থেকে কাজ না করে কেবল কাগজ দেখিয়ে ৩৫০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে একটি জেলাতেই প্রায় ৬০০০ কোটি টাকার হদিস নেই।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, যে অপ্রয়োজনীয় খরচ ও ঋণ, এর বোঝা দেশের ২০ কোটি মানুষের মাথার ওপর। আজ যদি এ টাকাগুলো থাকতো, তবে আপনাদের আবাসন, ট্রান্সপোর্টেশন এবং আইটি ইউনিটের দাবিগুলো আমরা মুহূর্তেই পূরণ করতে পারতাম।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরবর্তী পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পর দেশে মব ভায়োলেন্সের যে ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল, পুলিশ সদস্যরা অত্যন্ত ধৈর্য ও কৌশলের সঙ্গে তা ম্যানেজ করেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, পুলিশ যদি আন্তরিক হয়, তবে আইনি ও কৌশলগত ভূমিকা নিয়ে অনেক বড় দাঙ্গা বা ঘটনা শুরুতেই নিষ্পত্তি করা সম্ভব। তিনি পুলিশকে ‘সরকারের আয়না’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, পুলিশের আচরণের ওপরই নির্ভর করে মানুষ সরকারকে কীভাবে মূল্যায়ন করবে।

দুর্নীতি ও সন্ত্রাস দমনে পুলিশকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কারো রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবশালী পরিচয় দেখে থমকে যাবেন না। আপনারা আইনের লোক, কোনো বিশেষ দলের নন। যে অপরাধী, তাকে অপরাধী হিসেবেই গণ্য করবেন। তিনি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বলেন, কোনো ধরনের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড বরদাস্ত করা হবে না। দেশের সকল ধর্মের মানুষের সহাবস্থান নিশ্চিত করা পুলিশের নৈতিক দায়িত্ব।

প্রধানমন্ত্রী নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের উদাহরণ টেনে মিতব্যয়িতার আহবান জানান। তিনি বলেন, আমরা ক্যাবিনেটে সিদ্ধান্ত নিয়েছি মন্ত্রীদের জ্বালানি তেলের বরাদ্দ ৩০ শতাংশ কমিয়ে দেয়ার। আমি নিজেও খরচ কমানোর চেষ্টা করছি। তিনি পুলিশ কর্মকর্তাদের বলেন, আমরা যারা এ ঘরে বসে আছি, তারা ২০ কোটি মানুষের তুলনায় অনেক বেশি প্রিভিলেজড (সুবিধাভোগী)। আসুন আমরা আমাদের সে সুবিধা কিছুটা ত্যাগ করি। আমরা একটু একটু করে ছাড় দিলে রাষ্ট্র অনেক বড় সাশ্রয় করতে পারবে।

প্রধানমন্ত্রী জুলাই সনদের প্রতিটি অঙ্গীকার অক্ষরে অক্ষরে পালনের ঘোষণা দিয়ে বলেন, সততা, মেধা ও দক্ষতাই হবে নিয়োগ ও বদলির একমাত্র মাপকাঠি। পুলিশের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে পর্যায়ক্রমে সকল সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির আশ্বাস দেন তিনি। 

বক্তব্যের শেষে প্রধানমন্ত্রী ২০২৬ সালের পুলিশ সপ্তাহের স্লোগান 'আমার পুলিশ আমার দেশ সবার আগে বাংলাদেশ’ সার্থক করার আহবান জানিয়ে বলেন, আসুন আমরা আমাদের অবস্থান থেকে দেশকে কতটুকু দিতে পারি, সে শপথ নেই।

অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইজিপি এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

আপন দেশ/জেডআই

মন্তব্য করুন ।। খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত,আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়