প্রতীকী ছবি
কাজটি জরুরি। লাভও আছে। তবু শুরু করতে ইচ্ছে করে না। পরিচিত এ অভিজ্ঞতাকে এতদিন আলস্য বা অভ্যাসের ফল বলে মনে করা হতো। কিন্তু নতুন গবেষণা বলছে, এর পেছনে কাজ করছে মস্তিষ্কের একটি নির্দিষ্ট স্নায়ু ব্যবস্থা।
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো কাজের সঙ্গে অস্বস্তি বা চাপের আশঙ্কা জড়িয়ে থাকলে মস্তিষ্ক নিজেই আগ্রহ কমিয়ে দেয়। এমনকি কাজটি করলে পুরস্কার পাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও এ অনীহা দেখা যায়। এখান থেকেই জন্ম নেয় কাজ ফেলে রাখার প্রবণতা, যাকে আমরা প্রোক্রাস্টিনেশন বলি।
জাপানের কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিজ্ঞানী কেন-ইচি আমেমোরির নেতৃত্বে এ গবেষণা করা হয়। লক্ষ্য ছিল, চাপ বা নেতিবাচক অভিজ্ঞতার আশঙ্কা কীভাবে কাজ করার প্রেরণাকে দমিয়ে দেয়, তা বোঝা।
ওয়্যার্ড ম্যাগাজিনে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়, গবেষণার জন্য দুটি ম্যাকাক বানরকে পরীক্ষার মডেল হিসেবে নেয়া হয়। পরীক্ষার প্রথম ধাপে বানরদের পানির ওপর সাময়িক নিয়ন্ত্রণ রেখেছেন গবেষকরা। এরপর তারা বানরদের সামনে দুটি হাতল রাখেন।
একটি হাতল চাপলে অল্প পরিমাণ পানি পাওয়া গেছে, অন্যটি চাপলে বেশি। এ ধাপের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা বোঝার চেষ্টা করেছেন, পুরস্কারের পরিমাণ বাড়লে কাজ করার আগ্রহ বদলায় কি না বা কতটা বদলায়।
পরবর্তী ধাপে পরীক্ষায় তারা যোগ করেন অস্বস্তির উপাদান। বানরদের সামনে আবার দুটি বিকল্প রাখা হয়। একটিতে তারা কোনো বিরূপ অভিজ্ঞতা ছাড়াই মাঝারি পরিমাণ পানি পেয়েছে। অন্যটিতে পানির পরিমাণ বেশি, তবে শর্ত হিসেবে মুখে সরাসরি বাতাসের ঝাপটা লাগে। অর্থাৎ দ্বিতীয় বিকল্পে পুরস্কার বেশি হলেও সেটি অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত।
এ পর্যায়ে বানরদের আচরণে স্পষ্ট পরিবর্তন দেখা যায়। বাতাসের ঝাপটা থাকলে তারা কাজ শুরু করতে দেরি করে। অনেক সময় আগ্রহই দেখায় না। এখান থেকেই গবেষকেরা মস্তিষ্কের ভেতরের এক ধরনের ‘ব্রেক সিস্টেম’ শনাক্ত করেন।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, এতে যুক্ত রয়েছে মস্তিষ্কের দুটি অংশ—ভেন্ট্রাল স্ট্রায়াটাম ও ভেন্ট্রাল প্যালিডাম। এ অংশগুলো সাধারণত আনন্দ, প্রেরণা ও পুরস্কার ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। অস্বস্তির আশঙ্কা তৈরি হলে ভেন্ট্রাল স্ট্রায়াটাম সক্রিয় হয়। এরপর ভেন্ট্রাল প্যালিডামের দিকে বাধা সংকেত পাঠায়।
ভেন্ট্রাল প্যালিডাম মূলত কাজ শুরু করার তাগিদ তৈরি করে। কিন্তু বাধা সংকেত পৌঁছালে সে তাগিদ দুর্বল হয়ে যায়। ফলে কাজ শুরু পিছিয়ে যায়। অনেক সময় কাজটি এড়িয়ে যাওয়া হয়। গবেষকদের মতে, মস্তিষ্ক আগেভাগেই সম্ভাব্য কষ্টের হিসাব কষে গতি কমিয়ে দেয়।
কারেন্ট বায়োলজি জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় বিজ্ঞানীরা আরও একটি ধাপ এগিয়ে নেন। কেমোজেনেটিক পদ্ধতিতে বিশেষ ওষুধ ব্যবহার করে সাময়িকভাবে এ দুই অংশের যোগাযোগ বন্ধ করা হয়। এরপর আবার একই পরীক্ষা চালানো হয়।
ফলাফল ছিল চোখে পড়ার মতো। অস্বস্তিকর শর্ত থাকা সত্ত্বেও বানররা দ্রুত কাজ শুরু করে। আগের মতো দ্বিধা দেখা যায়নি। অর্থাৎ এই সংযোগ বন্ধ থাকলে কাজ করার প্রেরণা ফিরে আসে।
আরও পড়ুন : মোবাইল ফোনের সব গুজব উড়িয়ে দিল বিটিআরসি
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে। যেখানে কোনো শাস্তি বা অস্বস্তি ছিল না, সেখানে এ ওষুধের কোনো প্রভাব পড়েনি। এর মানে, এ স্নায়ু সার্কিট সব ধরনের প্রেরণা নিয়ন্ত্রণ করে না। এটি সক্রিয় হয় মূলত তখনই, যখন কোনো কাজের সঙ্গে নেতিবাচক অভিজ্ঞতার আশঙ্কা থাকে।
গবেষকদের মতে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ সংযোগ যত শক্ত হয়, অপছন্দের কাজ এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতাও তত বাড়ে। এভাবেই দৈনন্দিন জীবনে গড়ে ওঠে কাজ পিছিয়ে দেয়ার অভ্যাস।
এ গবেষণার গুরুত্ব শুধু অভ্যাস বোঝার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, বিষণ্নতা বা সিজোফ্রেনিয়ার মতো মানসিক সমস্যায় কাজ করার আগ্রহ কমে যাওয়ার পেছনেও এ প্রক্রিয়ার ভূমিকা থাকতে পারে।
তবে গবেষণা দলের প্রধান কেন-ইচি আমেমোরি মনে করিয়ে দেন, এ ব্যবস্থা পুরোপুরি খারাপ নয়। নেচার সাময়িকীতে দেয়া মন্তব্যে তিনি বলেন, অতিরিক্ত কাজও বিপজ্জনক। এ স্নায়ু সার্কিট মানুষকে বার্নআউট থেকে রক্ষা করে।
তাই গবেষকদের সতর্কবার্তা স্পষ্ট। মস্তিষ্কের এ স্বাভাবিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় সরাসরি হস্তক্ষেপ করার আগে আরও গভীরভাবে বোঝা জরুরি। কীভাবে এ জ্ঞান কাজে লাগানো যায়, সেটাই এখন পরবর্তী গবেষণার বড় প্রশ্ন।
আপন দেশ/এসএস
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।




































