ছবি : আপন দেশ
দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট (সেপা) নিয়ে চূড়ান্ত দরকষাকষি শেষ করেছে বাংলাদেশ। দুই দেশের মধ্যে এ চুক্তি মঙ্গলবার (০৪ আগস্ট) সই হওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্য দিয়ে জাপানের পর দ্বিতীয় কোনো দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্যভিত্তিক অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের চুক্তিতে যুক্ত হবে বাংলাদেশ।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. কামাল হোসেন জানান, চুক্তির খসড়া মন্ত্রিসভার অনুমোদন ও আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষ হয়েছে। মঙ্গলবার ঢাকায় দুই দেশের প্রতিনিধিরা চুক্তিতে স্বাক্ষর করবেন। চুক্তি স্বাক্ষরের পর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ ব্রিফিং করবেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মোক্তাদির।
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর রফতানি বাজারে অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা ধরে রাখা এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যেই এ চুক্তি করা হচ্ছে। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশ অনেক বাজারে শুল্ক–সুবিধা হারাবে। সে কারণে বিকল্প হিসেবে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির ওপর জোর দিচ্ছে সরকার।
গত ২৭ থেকে ৩১ জুলাই দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে অনুষ্ঠিত পঞ্চম ও শেষ দফার আলোচনায় প্রায় ৬০ সদস্যের প্রতিনিধিদলের অংশগ্রহণে চুক্তির সব বিষয় চূড়ান্ত হয়।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কোরীয় বাণিজ্যমন্ত্রীর বৈঠক
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে অংশ নিতে দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী ইয়েও হান-কো সোমবার ঢাকায় আসেন। তিনি সচিবালয়ে প্রধান উপদেষ্টা তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।
প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব শাহাদাত হোসেন স্বাধীন জানান, বৈঠকে কোরীয় বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, সেপা কার্যকর হলে দুই দেশের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও সম্প্রসারিত হবে এবং বাংলাদেশে দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগ বাড়বে।
জবাবে প্রধান উপদেষ্টা খেলনা, ইলেকট্রনিকস, টেলিযোগাযোগ, অটোমোবাইল, সেমিকন্ডাক্টর ও জাহাজ নির্মাণ খাতে বিনিয়োগের আহবান জানান। বিশেষ করে জাহাজ নির্মাণ শিল্পে বিনিয়োগে সরকারের সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি। একই সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণও জানান।
কী থাকছে সেপায়
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, প্রস্তাবিত সেপার আওতায় দক্ষিণ কোরিয়া বাংলাদেশের জন্য ১১১টি সেবা উপখাত উন্মুক্ত করতে সম্মত হয়েছে। তাদের দাবি, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ইতিহাসে কোনো এলডিসি বা উত্তরণমুখী দেশের জন্য এত বড় পরিসরে সেবা খাত উন্মুক্ত করার নজির নেই।
আরও পড়ুন<<>>এক বছরে সর্বোচ্চ রফতানি জুলাইয়ে, তবু সামনে শঙ্কা
বিনিময়ে বাংলাদেশও সংবেদনশীল খাত ও ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্পের (এসএমই) স্বার্থ বিবেচনায় রেখে কোরীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য ৯৫টি সেবা খাত উন্মুক্ত করবে।
চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ, পাট ও পাটজাত পণ্যের জন্য দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার অব্যাহত রাখার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এলডিসি থেকে উত্তরণের পরও কিছু বাণিজ্যিক সুবিধা বহাল থাকবে বলে আশা করছেন কর্মকর্তারা।
এ ছাড়া রুলস অব অরিজিনে নমনীয়তা, কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজীকরণ, ডিজিটাল কাস্টমস ব্যবস্থা, বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের সুরক্ষা, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা, দক্ষতা উন্নয়ন, শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিরোধ নিষ্পত্তির কাঠামোও চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সেবা রফতানি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ
কর্মকর্তাদের মতে, সেপা কার্যকর হলে বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল ও সামুদ্রিক খাতের দক্ষ জনবল দক্ষিণ কোরিয়ায় সাময়িক ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিট পাওয়ার ক্ষেত্রে সুবিধা পাবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশি সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি ডেটা প্রসেসিং ও ক্লাউড সেবা দেয়ার সুযোগ পাবে।
এ ছাড়া নার্স, ফিজিওথেরাপিস্ট ও প্রশিক্ষিত কেয়ারগিভারদের জন্যও দক্ষিণ কোরিয়ায় আইনি কাঠামোর আওতায় কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে মনে করছে সরকার।
বাণিজ্য ও বিনিয়োগে নতুন সম্ভাবনা
চুক্তি কার্যকর হলে বাংলাদেশে বিদ্যুৎকেন্দ্র, মেট্রোরেল, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর পরিচালনা এবং ফাইভ–জি প্রযুক্তি বিস্তারে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ আরও বাড়তে পারে।
সিউলে বাংলাদেশ দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এশিয়া-প্যাসিফিক ট্রেড এগ্রিমেন্ট (এপিটিএ) ও ডব্লিউটিও ব্যবস্থার আওতায় বাংলাদেশ দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে প্রায় ৯৫ শতাংশ পণ্যে শুল্ক ও কোটামুক্ত সুবিধা ভোগ করছে।
বর্তমানে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ রফতানি করে ৪৯১ মিলিয়ন ডলারের পণ্য এবং আমদানি করে ৯০২ মিলিয়ন ডলারের পণ্য।
বাংলাদেশের প্রধান রফতানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক, হোম টেক্সটাইল, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ, হিমায়িত খাদ্য, সিরামিক এবং পাটজাত পণ্য। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে বাংলাদেশ মূলত লোহা-ইস্পাত, প্লাস্টিক, শিল্পযন্ত্র, যান্ত্রিক সরঞ্জাম, কাগজ এবং ট্যানিং ও ডাইং–সংশ্লিষ্ট কাঁচামাল আমদানি করে।
আপনদেশ/মিম/জেডআই
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।





































