Apan Desh | আপন দেশ

অনলাইনে আর্থিক প্রতারণার ৬০ ভাগই বিকাশে, মিলছে না প্রতিকার

কাজী মুস্তাফিজ

প্রকাশিত: ০৯:১৭, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আপডেট: ০৯:২৮, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অনলাইনে আর্থিক প্রতারণার ৬০ ভাগই বিকাশে, মিলছে না প্রতিকার

ছবি : আপন দেশ

অনলাইন লেনদেনের বিস্তারে বাড়ছে প্রতারণার নতুন নতুন ফাঁদ, আর সেই ফাঁদের অন্যতম হাতিয়ার হয়ে উঠছে মোবাইল ব্যাংকিং। সিআইডির পরিসংখ্যান বলছে, এমএফএসভিত্তিক প্রতারণার ৬০ শতাংশই বিকাশ অ্যাকাউন্টে। অভিযোগ করেও প্রতিকার মিলছে না। পাশাপাশি অভিযুক্ত মার্চেন্টের তথ্য গোপন রাখার অভিযোগে প্রশ্নের মুখে পড়েছে সেবাটির জবাবদিহি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা ক্রমাগত।

এদিকে অনলাইনে আর্থিক প্রতারণা ঠেকাতে সম্প্রতি দেশের ব্যাংক ও এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের সময় বেধে দেয়া হয়েছে।

সাইবার পুলিশ সেন্টারের অভিযোগনামা, ভুক্তভোগীর বিবরণ, থানার সাধারণ ডায়েরি পর্যালোচনা করে জানা গেছে, প্রতিনিয়ত নানা অভিনব কায়দায় বিকাশসহ বিভিন্ন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সহায়তা নিয়ে অপরাধ সংগঠিত হচ্ছে। অপরাধীরা লেনদেনে ব্যবহার করছে বিকাশের মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট।

জানা যায়, অ্যাকাউন্টের লাইসেন্স দেয়ার আগেই ট্রেড লাইসেন্সসহ ব্যবসার কাগজপত্র যাচাই করে নেয় বিকাশ। কিন্তু ভুক্তভোগী গ্রাহক বিকাশের কাছে অভিযোগ নিয়ে গেলে নানা আইন-কানুনের অযুহাত দেখিয়ে ব্যবস্থা নেয়া হয় না। লেনদেনে ব্যবহার হওয়া অভিযুক্ত মার্চেন্ট বা ব্যবসায়ীর প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ভুক্তভোগীকে সহযোগিতাও করা হয় না।

আরও পড়ুন<> মোবাইল ব্যাংকিং বিদেশের তুলনায় দেশে পকেট কাটা

ভুক্তভোগী আবরার সাকিফ এ প্রতিবেদককে বলেন, তিনি বিকাশে প্রতারণার শিকার হয়েছেন। এক লাখ টাকা হারিয়েছেন। পাসপোর্ট আবেদনের ফি দেয়ার নাম করে তাকে ফাঁদে ফেলেছে প্রতারক। ঘটনার পর তাৎক্ষণিক শেরেবাংলা নগর থানায় জিডি করেছেন। বিকাশেও যোগাযোগ করেছেন। বিকাশ থেকেও অপরাধীর তথ্য দিয়ে কোনো সহযোগিতা করা হয়নি। প্রতারক মার্চেন্ট প্রতিষ্ঠানের নাম-ঠিকানা চাইলে বিকাশ থেকে বলা হয়, ‘আইনগতভাবে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নাম-ঠিকানা দেয়া সম্ভব নয়।’

আবরার বলেন, বিকাশের মাধ্যমে লেনদেন করে মানুষ সুবিধার বদলে এখন অসুবিধার মুখোমুখিই বেশি হচ্ছে। আমার ফোনের অ্যাপস থেকে পাসওয়ার্ড বা কোড নাম্বার না দিলে অন্য ডিভাইস থেকে কীভাবে লেনদেন সম্পন্ন হয়? এক্ষেত্রে বিকাশের নিশ্চয়ই কোনো কারিগরি ফাঁক-ফোকর আছে। তাদের কর্মকর্তাদের আচরণ সন্দেহজনক। প্রতিদিন অসংখ্য আর্থিক প্রতারণা ঘটছে। এভাবে প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ না হলে বিকাশ ব্যবহার বাদ দিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত প্রতারণার ঘটনাগুলোর বিষয়ে বিকাশকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা।

আরও পড়ুন<> একই জমি বারবার অধিগ্রহণ, ঢাকার এডিসি শামীমদের সোনার খনি

আরেক ভুক্তভোগী কাজী সাকিব বলেন, তিনি প্রতারণার শিকার হয়েছেন অনলাইনে মোবাইল ফোন অর্ডার করে। পণ্য বুঝিয়ে দেয়ার আগেই বিকাশের মাধ্যমে ৭০ হাজার টাকা নিয়ে গেছে। থানায় জিডি করেছেন। অভিযোগ দেয়ার পরেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বিকাশ। নম্বর দিয়ে প্রতারক মার্চেন্ট ব্যাংকের তথ্য চাইলে বিকাশ কর্মকর্তারা বলেন, গ্রাহকের তথ্য বাংলাদেশে ব্যাংকের নিষেধ আছে।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সাইবার পুলিশ সেন্টার নিয়মিত বিভিন্ন প্রতারণার অভিযোগ পাচ্ছে। ২০২০ সালের শুরু থেকে ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ১ লাখ ৮০ হাজার ৫৫৩টি অভিযোগ এসেছে। এর মধ্যে নানা ধরনের প্রতারণা অন্তর্ভুক্ত।

সিআইডির তথ্যে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের (এমএফএস) মাধ্যমে প্রতারণার ঘটনাগুলো নিয়ে ১১ মাসের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া গেছে। ২০২৫ সালের ১ জুন থেকে চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত যেসব অপরাধ সংগঠিত হয়েছে তার ৬০ শতাংশই বিকাশ অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে সংঘটিত। নগদে ১৫ শতাংশ। রকেটে ২ শতাংশ, সেলফিনে ১ শতাংশ এবং অন্যান্য ১৮ শতাংশ।

আরও পড়ুন<> বেনামি প্রতিষ্ঠানের আড়ালে মোরশেদ আলমের শত শত কোটি টাকা পাচার

ঢাকা মহানগর পুলিশের ডিবি-সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (উত্তর) বিভাগ গত সোমবার (০৭ সেপ্টেম্বর) অনলাইনে ঋণ দেয়ার নামে এক প্রতারক চক্রকে খুঁজে পেয়েছে। চক্রের সদস্য মেহেদি হাসান নামে একজনকে জামালপুরের সরিষাবাড়ী থেকে গ্রেফতার করা হয়। এ চক্র ফেসবুকে আকর্ষণীয় ডিজিটাল লোনের (ঋণ) বিজ্ঞাপন। ঋণ পেতে যোগাযোগ করার পর নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটে অ্যাকাউন্ট খুলতে বলা হতো।

এরপর ঋণ অনুমোদনের শর্ত হিসেবে চাওয়া হতো কাঙ্ক্ষিত ঋণের ১০ শতাংশ টাকা। সে টাকা পাঠানোর পর ভুক্তভোগীর সামনে হাজির করা হতো ঋণের টাকা ও জামানতের অর্থের হিসাব। কিন্তু সে টাকা ছিল শুধু অনলাইনে দেখানোর জন্য। বাস্তবে তা উত্তোলনের কোনো সুযোগই ছিল না। বিকাশ, নগদ বা রকেটের মাধ্যমে প্রতারণার টাকা সংগ্রহ করতো চক্রটি।

আরও পড়ুন<> মোবাইল ব্যাংকিং বিদেশের তুলনায় দেশে পকেট কাটা

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক এসব প্রতারণার বন্ধে দেশের সব তফসিলি ব্যাংক ও এমএফএস প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশনা দিয়েছে। এতে তিনটি বিষয় উল্লেখ করা হয়। তাতে বলা হয় বিভিন্ন অভিনব কায়দায় সংঘটিত প্রতারণার বিবরণ, পরিশোধ ও নিষ্পত্তি ব্যবস্থা আইন অনুযায়ী প্রতারণার দেনদেনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলো অপরাধে জড়াচ্ছে। সংঘটিত অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা ও জনসচেতনতা তৈরির কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানাতে বলা হয়েছে।

আরও পড়ুন<>আত্মস্বীকৃত চোর প্রকৌশলী আজাদের হাতে সওজের রিমোট

বিকাশের করপোরেট কমিউনিকেশনসের প্রধান শামসুদ্দিন হায়দার ডালিমের কাছে জানতে চাইলে তিনি আপন দেশ’কে বলেন, বিকাশের মাধ্যমে কী সংখ্যক প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে, কতোগুলোর ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, এসব তথ্য দেয়া যাবে না। বাংলাদেশে ব্যাংকের কিছু নিয়ম-কানুন রয়েছে এ বিষয়ে। গ্রাহকদের অভিযোগের বিষয়েও একই জবাব বলে জানান বিকাশের এ কর্মকর্তা।

আপনদেশ/কেএম/এবি

মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়