Apan Desh | আপন দেশ

ইসলামী ব্যাংকিংয়ে সুশাসন, গ্রাহকআস্থার অতন্দ্র প্রহরী শরিয়াহ্ সুপারভাইজরি বোর্ড

মোঃ খায়রুল হাসান, সিএসএএ

প্রকাশিত: ১৪:১৬, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আপডেট: ১৪:২০, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইসলামী ব্যাংকিংয়ে সুশাসন, গ্রাহকআস্থার অতন্দ্র প্রহরী শরিয়াহ্ সুপারভাইজরি বোর্ড

ছবি : আপন দেশ

একজন গ্রাহক যখন ইসলামী ব্যাংকে তাঁর কষ্টার্জিত অর্থ জমা রাখেন, তখন তিনি শুধু আর্থিক মুনাফার প্রত্যাশা করেন না; তিনি বিশ্বাস করেন, তাঁর অর্থ শরিয়াহ্-সম্মত খাতে ব্যবহৃত হবে, লেনদেনে ন্যায়নীতি অনুসরণ করা হবে এবং ব্যাংক তাঁর আমানতের প্রতি যথাযথ আমানতদারিতা প্রদর্শন করবে।

এই বিশ্বাসই ইসলামী ব্যাংকিংয়ের মূল ভিত্তি। আর সেই বিশ্বাস ও শরিয়াহ্ পরিপালন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে শরিয়াহ্ সুপারভাইজরি বোর্ডের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি কার্যকর শরিয়াহ্ বোর্ড তাই শুধু নীতিগত অনুমোদন প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান নয়; বরং ইসলামী ব্যাংকের নৈতিকতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অন্যতম প্রাতিষ্ঠানিক রক্ষাকবচ।

মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের মানুষের জীবনযাত্রায় ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রভাব যেমন রয়েছে, তেমনি ব্যবসা-বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেনেও শরিয়াহ্ নীতিমালা অনুসরণের আগ্রহ দীর্ঘদিনের। সেই বাস্তবতার প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিফলন হিসেবে আশির দশকের গোড়ায় দেশে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের যাত্রা শুরু হয়। এরপর চার দশকের বেশি সময়ে এ খাতের পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বিস্তৃত হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকের পাশাপাশি প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোও ইসলামী ব্যাংকিং শাখা ও উইন্ডো চালু করেছে। বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থায় ইসলামী ব্যাংকিং আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

তবে এই অগ্রযাত্রার পথ সব সময় মসৃণ ছিল না। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কয়েকটি ইসলামী ব্যাংকের আর্থিক দুর্বলতা, অনিয়ম, সুশাসনের ঘাটতি, খেলাপি বিনিয়োগ এবং আমানতকারীদের অর্থ ফেরত পাওয়া নিয়ে উদ্বেগ এ খাতের প্রতি মানুষের আস্থাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। এর ফলে ইসলামী ব্যাংকিং নিয়ে আলোচনায় শুধু মূলধন, তারল্য, বিনিয়োগ ও মুনাফার হিসাব যথেষ্ট নয়; বরং শরিয়াহ্ পরিপালন, সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হচ্ছে। কারণ, একটি ইসলামী ব্যাংকের প্রকৃত শক্তি শুধু তার আর্থিক সক্ষমতায় নয়, শরিয়াহ্ নীতির প্রতি অঙ্গীকার এবং গ্রাহকের আস্থার মধ্যেও নিহিত।

আরও পড়ুন< খায়রুল হাসানের লেখা সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক ঘুরে দাঁড়াতে পারবে?

এই বাস্তবতায় ইসলামী ব্যাংকিং খাত বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ও পুনর্গঠনপর্ব অতিক্রম করছে। পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের সমন্বয়ে গঠিত রাষ্ট্রমালিকানাধীন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি এই পরিবর্তনের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। একাধিক প্রতিষ্ঠানের আমানত, বিনিয়োগ, পণ্য, চুক্তি, কার্যপ্রক্রিয়া ও সাংগঠনিক সংস্কৃতিকে এক ছাতার নিচে নিয়ে এসে একটি নতুন ব্যাংক পরিচালনা করা একটি জটিল প্রক্রিয়া। এখানে শুধু আর্থিক ও প্রশাসনিক কাঠামো একীভূত করাই যথেষ্ট নয়; শরিয়াহ্ পরিপালনের ক্ষেত্রেও প্রয়োজন একটি অভিন্ন, সুসংহত ও বিশ্বাসযোগ্য কাঠামো। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রচলিত পণ্য, চুক্তি ও কার্যপ্রক্রিয়ার মধ্যে পার্থক্য থাকলে সেগুলো যথাযথভাবে পর্যালোচনা করে সামঞ্জস্যপূর্ণ শরিয়াহ্ নীতি নির্ধারণ করতে হবে। এ কাজের কেন্দ্রে রয়েছে শরিয়াহ্ সুপারভাইজরি বোর্ড।

একটি কার্যকর শরিয়াহ্ সুপারভাইজরি বোর্ডের দায়িত্ব কোনো পণ্য বা চুক্তি শরিয়াহ্-সম্মত কি না, সে বিষয়ে মতামত প্রদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ব্যাংকের আমানত সংগ্রহ, বিনিয়োগ পরিচালনা, চুক্তির কাঠামো, মুনাফা বণ্টন, নতুন পণ্য ও সেবা প্রবর্তন এবং শরিয়াহ্-অসম্মত আয়ের শনাক্তকরণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বোর্ডের দিকনির্দেশনা প্রয়োজন হতে পারে। একই সঙ্গে শরিয়াহ্ কমপ্লায়েন্স ও অডিটের ফলাফল পর্যালোচনা, বিচ্যুতি চিহ্নিতকরণ এবং সংশোধনমূলক পদক্ষেপের বিষয়ে পরামর্শ প্রদানও এর গুরুত্বপূর্ণ কাজের অংশ। বিশেষ করে ডিজিটাল ব্যাংকিং, ফিনটেক ও প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক সেবার বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে শরিয়াহ্ তদারকির পরিধি আরও বাড়ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনাকারী ব্যাংকের শরিয়াহ্ সুপারভাইজরি কমিটি গঠন, সদস্যদের নিয়োগ ও অপসারণ এবং তাদের ভূমিকা ও দায়িত্ব সম্পর্কে পৃথক নির্দেশনা জারি করেছে। এই নির্দেশনা শরিয়াহ্ তদারকির কাঠামোকে আরও সুস্পষ্ট ও প্রাতিষ্ঠানিক করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে কোনো বোর্ড বা কমিটি গঠন করলেই শরিয়াহ্ গভর্ন্যান্স কার্যকর হয়ে যায় না। এর প্রকৃত কার্যকারিতা নির্ভর করে বোর্ডের স্বাধীনতা, সদস্যদের দক্ষতা, পর্যাপ্ত তথ্যপ্রাপ্তি, মতামত প্রদানের সুযোগ এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ওপর।

শরিয়াহ্ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক চাপ, মুনাফার লক্ষ্য কিংবা ব্যবস্থাপনার প্রভাব যাতে অযাচিত বাধা সৃষ্টি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা জরুরি। বোর্ডের সদস্যদের স্বাধীনভাবে মতামত দেওয়ার সুযোগ থাকতে হবে এবং ব্যাংকের কার্যক্রম সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য তাঁদের কাছে সময়মতো পৌঁছাতে হবে। কোনো শরিয়াহ্ বিচ্যুতি শনাক্ত হলে তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরা, সংশোধনমূলক পদক্ষেপের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা এবং প্রয়োজনীয় রিপোর্টিং নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে বোর্ডের সুপারিশ বাস্তবায়নে ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা পর্ষদের সুস্পষ্ট দায়িত্ব ও জবাবদিহিতা থাকা প্রয়োজন। কারণ, শরিয়াহ্ পরিপালন শুধু একটি নীতিগত ঘোষণা নয়; এটি বাস্তব কার্যক্রমে প্রতিফলিত হওয়ার বিষয়।

এ ক্ষেত্রে শরিয়াহ্ সুপারভাইজরি বোর্ড, শরিয়াহ্ কমপ্লায়েন্স এবং শরিয়াহ্ অডিটের ভূমিকা ও দায়িত্বের মধ্যে সুস্পষ্ট বিভাজন থাকা দরকার। শরিয়াহ্ বোর্ড নীতি ও সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে দিকনির্দেশনা প্রদান করে, শরিয়াহ্ কমপ্লায়েন্স নির্ধারিত নীতি ও সিদ্ধান্ত দৈনন্দিন কার্যক্রমে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করে এবং শরিয়াহ্ অডিট স্বাধীনভাবে বাস্তব পরিপালনের অবস্থা পরীক্ষা করে। এই তিনটি স্তর যদি নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে এবং পারস্পরিক সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করে, তাহলে শরিয়াহ্ গভর্ন্যান্স আরও শক্তিশালী হয়। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতাও উন্নত করা সম্ভব হয়।

আরও পড়ুন < > বাংলা কিউআরে পেমেন্টের টাকা নিয়ে নতুন নির্দেশনা

আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শরিয়াহ্ গভর্ন্যান্সকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড অডিটিং অর্গানাইজেশন ফর ইসলামিক ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন্স বা আওফি ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড প্রণয়নকারী সংস্থাগুলোর একটি। তাদের বিভিন্ন গভর্ন্যান্স মানদণ্ডে শরিয়াহ্ গভর্ন্যান্স কাঠামো, শরিয়াহ্ বোর্ডের গঠন ও কার্যক্রম, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, পর্যালোচনা এবং রিপোর্টিংয়ের মতো বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। এসব মানদণ্ডের মূল শিক্ষা হলো, শরিয়াহ্ পরিপালনকে কোনো বিচ্ছিন্ন আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি ব্যাংকের গভর্ন্যান্স, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, পণ্য উন্নয়ন, কমপ্লায়েন্স ও জবাবদিহিতার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

নবগঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া বিভিন্ন পণ্য, বিনিয়োগ কাঠামো ও চুক্তিকে পর্যালোচনা করে একটি অভিন্ন শরিয়াহ্ কাঠামোর আওতায় আনা প্রয়োজন। কোনো প্রতিষ্ঠানে প্রচলিত পদ্ধতি অন্য প্রতিষ্ঠানের পদ্ধতি থেকে ভিন্ন হলে তা যথাযথভাবে যাচাই করে সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতি নির্ধারণ করতে হবে। বিশেষ করে পুরোনো বিনিয়োগ কাঠামোর শরিয়াহ্ পর্যালোচনা, আমানতকারীদের মুনাফা বণ্টনে স্বচ্ছতা এবং নতুন পণ্য ও ডিজিটাল সেবা চালুর আগে যথাযথ শরিয়াহ্ সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার।

এখানে একটি মৌলিক বিষয় মনে রাখা জরুরি—আর্থিক পুনর্গঠন ও শরিয়াহ্ পরিপালন পরস্পরের বিকল্প নয়। বরং একটি টেকসই ইসলামী ব্যাংক গড়ে তুলতে আর্থিক শৃঙ্খলা, সুশাসন ও শরিয়াহ্ পরিপালনকে একই সংস্কার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা পুনর্গঠনের পাশাপাশি চুক্তি, বিনিয়োগ, মুনাফা বণ্টন ও গ্রাহকসেবার ক্ষেত্রে শরিয়াহ্ নীতির যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। একটি ব্যাংক আর্থিকভাবে শক্তিশালী হলেও যদি তার শরিয়াহ্ পরিপালন ও সুশাসন নিয়ে প্রশ্ন থাকে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে গ্রাহকের আস্থা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

গ্রাহকের আস্থা পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার কোনো বিকল্প নেই। একজন গ্রাহক যখন মুদারাবা আমানতে অর্থ রাখেন, তখন তিনি প্রত্যাশা করেন তাঁর অর্থ শরিয়াহ্-সম্মত খাতে ব্যবহৃত হবে এবং মুনাফা বণ্টন নির্ধারিত নীতির আলোকে সম্পন্ন হবে। তাই শুধু ‘শরিয়াহ্-সম্মত’—এই ঘোষণা যথেষ্ট নয়; কীভাবে সেই পরিপালন নিশ্চিত করা হচ্ছে, তার প্রাসঙ্গিক তথ্যও গ্রাহকের সামনে থাকা উচিত। বার্ষিক প্রতিবেদন ও অন্যান্য প্রকাশনায় শরিয়াহ্ গভর্ন্যান্স কাঠামো, বোর্ডের কার্যক্রম এবং শরিয়াহ্ অডিটের সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হলে স্বচ্ছতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে গ্রাহকদের জন্য সহজবোধ্য ভাষায় ইসলামী ব্যাংকিং পদ্ধতি, চুক্তির ধরন ও মুনাফা বণ্টনের নীতি ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। কারণ, তথ্যের স্বচ্ছতা গ্রাহককে শুধু অবহিত করে না; এটি প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থাভিত্তিক সম্পর্কও গড়ে তোলে।

প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন শরিয়াহ্ গভর্ন্যান্সের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। ডিজিটাল লেনদেন, ফিনটেক, সুকুক, ট্রেজারি পণ্য, ডিজিটাল বিনিয়োগ এবং নতুন ধরনের আর্থিক চুক্তি শরিয়াহ্ বিশেষজ্ঞদের সামনে নানা প্রশ্ন নিয়ে আসছে। ফলে ভবিষ্যতের শরিয়াহ্ বিশেষজ্ঞদের শুধু ফিকহুল মুয়ামালাতের জ্ঞান থাকলেই চলবে না; ব্যাংকিং, অর্থনীতি, হিসাবরক্ষণ, আইন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তি সম্পর্কেও সম্যক ধারণা থাকা প্রয়োজন। একইভাবে ব্যাংকারদেরও শরিয়াহ্ নীতিমালা ও ইসলামী ব্যাংকিং পদ্ধতি সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান অর্জন করতে হবে। কারণ, শরিয়াহ্ পরিপালন কোনো একটি বিভাগ বা কয়েকজন বিশেষজ্ঞের একক দায়িত্ব নয়; এটি ব্যাংকের প্রতিটি স্তরের প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব।

আরও পড়ুন<> শাহিদুর রহমান শাহিদের লেখা <> দ্বিতীয় যমুনা সেতু: উত্তরাঞ্চলের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির নতুন করিডোর

বর্তমান বাস্তবতায় ইসলামী ব্যাংকিং খাতের সামনে তাই কয়েকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। শরিয়াহ্ সুপারভাইজরি বোর্ডের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, দক্ষ ও বহুমাত্রিক জ্ঞানসম্পন্ন সদস্যদের সম্পৃক্ত করা, শক্তিশালী শরিয়াহ্ কমপ্লায়েন্স ও স্বাধীন শরিয়াহ্ অডিট ব্যবস্থা গড়ে তোলা, নতুন পণ্য ও সেবার আগে যথাযথ শরিয়াহ্ পর্যালোচনা করা এবং প্রয়োজনীয় তথ্য স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রকাশ করা—এসবের কোনো বিকল্প নেই। পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, শরিয়াহ্ সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত শরিয়াহ্ গভর্ন্যান্স মানদণ্ড অনুসরণের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

সবশেষে বলা যায়, ইসলামী ব্যাংকিংয়ের ভবিষ্যৎ শুধু আমানত, বিনিয়োগ, মুনাফা কিংবা শাখার সংখ্যা দিয়ে নির্ধারিত হবে না। এর দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নির্ভর করবে আস্থা, সুশাসন, শরিয়াহ্ পরিপালন, স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্বের সমন্বয়ের ওপর। বিশেষ করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের মতো একটি বৃহৎ পুনর্গঠিত প্রতিষ্ঠানের জন্য শক্তিশালী শরিয়াহ্ গভর্ন্যান্স গ্রাহকের আস্থা পুনর্গঠনের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে। তবে সেই আস্থা তৈরি হবে শুধু আশ্বাস বা আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মাধ্যমে নয়; বরং নীতির যথাযথ প্রয়োগ, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার মাধ্যমে।

ইসলামী ব্যাংকিংয়ের মূল প্রতিশ্রুতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে ন্যায্যতা, আমানতদারিতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও শরিয়াহ্-সম্মত আর্থিক লেনদেন। সেই প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার অন্যতম প্রাতিষ্ঠানিক প্রহরী হলো একটি স্বাধীন, দক্ষ, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর শরিয়াহ্ সুপারভাইজরি বোর্ড। বোর্ডের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা, পেশাগত দক্ষতা এবং বাস্তবায়ন কাঠামো যত শক্তিশালী হবে, ইসলামী ব্যাংকিংয়ের প্রতি গ্রাহকের আস্থার ভিত্তিও তত সুদৃঢ় হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। আর সেই আস্থার ভিত্তির ওপরই গড়ে উঠতে পারে একটি স্বচ্ছ, ন্যায়ভিত্তিক ও টেকসই ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা।

লেখক: ইসলামিক ব্যাংকার এবং বাহরাইনভিত্তিক আওফি‘র একজন ফেলো। ইমেইল: [email protected]

মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়