ছবি: এআই
ইসলামী ব্যাংক পিএলসি। একপাশে রাষ্ট্রের সমর্থনপুষ্ট নতুন চেয়ারম্যান, অন্যপাশে রাজপথে অবস্থান নেয়া আন্দোলনকারী গ্রাহক ও বিরোধী রাজনৈতিক বলয়।
এ টানাপোড়েনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে দেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক। এমডি ও কোম্পানি সচিব ছাড়া হওয়া এক প্রশ্নবিদ্ধ বোর্ড সভা শুধু করপোরেট গভর্ন্যান্সের বিতর্কই উসকে দেয়নি, বরং দেখিয়ে দিয়েছে- ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে সংঘাত এখন আর কেবল ব্যাংকিংয়ের বিষয় নয়; এটি রাজনৈতিক শক্তি-পরীক্ষারও এক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
সোমবার (০১ জুন) দিনভর উত্তেজনা, বিক্ষোভ এবং গ্রাহকদের বাধার মুখে ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারে বোর্ড সভা করতে ব্যর্থ হওয়ার পর রাতে অনলাইনে পরিচালকদের নিয়ে একটি সভা করেন নয়া চেয়ারম্যান খুরশিদ আলম। তবে সভায় উপস্থিত ছিলেন না ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) আলতাফ হুসাইন এবং কোম্পানি সচিব হাবিবুর রহমান।
ব্যাংকিং খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা বলছেন, দেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে এমডি ও কোম্পানি সচিব ছাড়া পরিচালনা পর্ষদের সভা আয়োজনের নজির কার্যত নেই। ফলে সভাটির আইনগত অবস্থান, সিদ্ধান্ত গ্রহণের বৈধতা এবং করপোরেট গভর্ন্যান্স নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ব্যাংক কোম্পানি আইন ও করপোরেট গভর্ন্যান্স কাঠামো অনুযায়ী, পরিচালনা পর্ষদের সভা আয়োজন, কার্যবিবরণী সংরক্ষণ, সিদ্ধান্ত লিপিবদ্ধকরণ এবং নথিপত্র ব্যবস্থাপনায় কোম্পানি সচিবের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
একাধিক ব্যাংকারের মতে, কোম্পানি সচিবের অনুপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত সভাকে পূর্ণাঙ্গ বোর্ড সভা হিসেবে গণ্য করা যায় কি না, সে প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর এখনও মেলেনি।
এ বিষয়ে নতুন চেয়ারম্যান খুরশিদ আলম গণমাধ্যমকে বলেন, তিনি ভারপ্রাপ্ত এমডি ও কোম্পানি সচিবকে সভায় যুক্ত করার চেষ্টা করেছিলেন। তবে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
তার দাবি, বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন বোর্ড গঠন করে দেয়ায় সভা করার বাধ্যবাধকতা ছিল।
দিনভর বিক্ষোভের কারণে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে বোর্ড সভা আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। সন্ধ্যায় ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলতাফ হুসাইন গ্রাহক ফোরামের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে পারেননি। পরে রাত ৯টার দিকে জুম প্ল্যাটফর্মে সভা হয়। প্রায় ৪০ মিনিটের ওই সভায় সাবেক চেয়ারম্যানের পদত্যাগের বিষয়টি পরিচালকদের অবহিত করা হয় এবং ছুটিতে পাঠানো এমডি ওমর ফারুক খানের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হয়। অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলতাফ হুসাইনকে ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব চালিয়ে যাওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয় বলে জানা গেছে।
আরও পড়ুন <<>> বিক্ষোভের মুখে ইসলামী ব্যাংকে আসতে পারলেন না চেয়ারম্যান
তবে সভার কার্যবিবরণী কে লিপিবদ্ধ করেছেন, সিদ্ধান্তগুলো কীভাবে নথিভুক্ত হয়েছে এবং সেগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হবে কোন প্রক্রিয়ায়- এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনও পাওয়া যায়নি।
ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ইস্যু এখন ব্যাংকিং খাতের সীমানা ছাড়িয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবেশ করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রের ভাষ্য, বিষয়টি ক্রমেই রাষ্ট্রপক্ষ এবং সংসদের বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির মর্যাদার লড়াইয়ে রূপ নিচ্ছে। তাদের মতে, নতুন চেয়ারম্যান খুরশিদ আলম দায়িত্বে থেকে কার্যকরভাবে ব্যাংক পরিচালনা করতে পারলে সেটিকে রাষ্ট্রের অবস্থানের বিজয় হিসেবে দেখা হবে। অন্যদিকে তিনি ব্যর্থ হলে বা সরে যেতে বাধ্য হলে আন্দোলনকারী পক্ষ সেটিকে নিজেদের বিজয় হিসেবে তুলে ধরবে।
জামায়াত নেতা মনির হোসেন পাটোয়ারি আপন দেশকে বলেন, অতীতেও ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে টানাপোড়েন হয়েছে। তার দাবি, তখন তাদের রাজনৈতিক অবস্থান ভিন্ন ছিল, কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলেছে।
তিনি অভিযোগ করেন, আন্দোলনকারীদের ওপর লাঠিচার্জ করা হয়েছে এবং তাদের লোকজন আহত হয়েছেন।
তার ভাষ্য, ইসলামী ব্যাংক প্রশ্নে তাদের অবস্থান থেকে সরে যাওয়ার সুযোগ নেই। আজ আহত হয়েছি প্রয়োজনে সামনের দিনে মরব, তবুও ব্যাংক ছাড়ব না।
দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার সাংবাদিক শহীদুল ইসলাম। যার রাজনৈতিক আদর্শ জামায়াত। ফেসবুকে পোষ্টে তিনি লিখেন, 'ইসলামী ব্যাংক থেকেই কি সরকারের পতন শুরু?
অন্যদিকে সরকারঘনিষ্ঠ মহলের একাধিক সূত্রের দাবি, ইসলামী ব্যাংককে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক বলয়ের অর্থনৈতিক ভিত্তি হিসেবে দেখা হয়।
তাদের মতে, ব্যাংকটির প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও আর্থিক কাঠামোয় পরিবর্তন আনতে পারলে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক শক্তির সাংগঠনিক সক্ষমতার ওপরও প্রভাব পড়তে পারে। তবে এসব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত যখন রাজপথের আন্দোলন, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং রাষ্ট্রীয় অবস্থানের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে, তখন বিষয়টি আর কেবল ব্যাংকিং খাতের সংকট থাকে না। ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে বর্তমান পরিস্থিতি সে বাস্তবতারই প্রতিফলন।
এদিকে সাধারণ গ্রাহক রাইসুল ইসলাম বলেন, ব্যাংকটি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মঞ্চ না হয়ে স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রমে ফিরে যাক।
তাদের ভাষ্য, আমানতকারী ও গ্রাহকদের স্বার্থই হওয়া উচিত সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। পরিচালনা পর্ষদ, চেয়ারম্যান কিংবা রাজনৈতিক পক্ষগুলোর অবস্থান যাই হোক না কেন, ব্যাংকের স্থিতিশীলতা ও সুশাসন নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সব মিলিয়ে ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যানকে ঘিরে শুরু হওয়া সংকট এখন শুধু একটি ব্যাংকের প্রশাসনিক সংকট নয়; বরং তা দেশের আর্থিক খাত, করপোরেট সুশাসন এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার এক জটিল সমীকরণে পরিণত হয়েছে।
ব্যাংকের বোর্ডরুমের সিদ্ধান্ত ও রাজপথের প্রতিরোধ- দুইয়ের সংঘাতে ইসলামী ব্যাংক এখন জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে।
আপন দেশ/এবি
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।




































