ছবি: আপন দেশ
নাটোরের গুরুদাসপুর পৌর ছাত্রদলের সদস্য সচিব শাকিল ইসলাম হত্যা মামলায় নাটোর-৪ (গুরুদাসপুর-বড়াইগ্রাম) আসনের বিএনপির এমপি আব্দুল আজিজের ছেলে নুরুজ্জামান মিন্টুর তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বিকেলে তাকে হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে হাজির করা হয়। পরে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই আমির হোসেন তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। শুনানি শেষে গুরুদাসপুর আমলি আদালতের বিচারক মেহেদী হাসান তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
নাটোর জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ওসি নজরুল ইসলাম জানান, সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাতে গুরুদাসপুরে মিন্টুর নিজ বাসা থেকে তাকে হেফাজতে নেয়া হয়। পরে শাকিল হত্যা মামলায় সম্পৃক্ততার অভিযোগে মঙ্গলবার তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। এরপর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড আবেদন করে আদালতে হাজির করা হয়।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, নিহত শাকিল ইসলাম গুরুদাসপুর পৌর ছাত্রদলের সদস্যসচিব ছিলেন। গত ১৪ অক্টোবর রাতে উপজেলার চাঁচকৈড় বাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে হেলমেট পরা দুর্বৃত্তরা তার ওপর হামলা চালায়। হামলাকারীরা প্রথমে তাকে গুলি করে এবং পরে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে পালিয়ে যায়।
গুরুতর আহত অবস্থায় শাকিলকে প্রথমে গুরুদাসপুর উপজেলা হাসপাতালে নেয়া হয়। পরে তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল হয়ে ঢাকার পিজি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার রাতে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় ১৯ অক্টোবর গুরুদাসপুর থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেছিলেন তার বাবা রবিউল করিম। সে মামলায় নুরুজ্জামান মিন্টুকে গ্রেফতার দেখানো হয়।
দলীয় সূত্র জানিয়েছে, দুর্বৃত্তদের হামলায় গুরুতর আহত শাকিল রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ১২ দিন চিকিৎসার পর সোমবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে মারা যান। তার মৃত্যুর খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর ওই হাসপাতালেই কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতির নেতৃত্বে এমপি আবদুল আজিজকে অবরুদ্ধ করা হয়। সেখানে তার বড় ছেলে নুরুজ্জামান মিন্টুকে গ্রেফতার ও নিহত শাকিলের পরিবারকে ২০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়ার দাবি জানান নেতাকর্মীরা। সে দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই রাত ১০টার দিকে মিন্টুকে আটক করে মধ্যরাত পর্যন্ত গুরুদাসপুর থানায় ওসির কক্ষে বসিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এরপর আরও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রাতেই তাকে নাটোর জেলা ডিবি কার্যালয়ে নেয়া হয়।
আরও পড়ুন<<>>‘খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে সরকার’
মঙ্গলবার সকালে শাকিলের পরিবারকে সমবেদনা জানাতে যান এমপি আবদুল আজিজ। এ সময় তিনি বলেন, অপ্রত্যাশিত এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার সন্তান জড়িত থাকলে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে।
এ সময় এমপি ও ওসির উপস্থিতিতে নিহত শাকিলের বাবা রবিউল করিম অপরাধীদের গ্রেফতারে পুলিশের অবহেলার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ঘটনার পর থেকে আসামি ধরতে পুলিশের চরম অবহেলা ছিল। স্থানীয় নেতাকর্মীরাও এ ব্যাপারে আগ্রহ দেখাননি। তিনি মামলার এজাহারে নাম উল্লেখ করে দিলেও এজাহারটি অজ্ঞাতনামা হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে।
পুলিশ ও দলীয় সূত্রে জানা যায়, ১৪ অক্টোবর রাত ৯টার দিকে গুরুদাসপুর পৌর শহরের চাঁচকৈড় বাজারপাড়া এলাকায় হেলমেট পরা সশস্ত্র দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হন ছাত্রদল নেতা শাকিল। এ সময় শাকিলকে কুপিয়ে জখম করে মোটরসাইকেলে পালিয়ে যায় হামলাকারীরা।
সেদিন হাসপাতালের জরুরি বিভাগের বেডে শুয়ে শাকিল বলেছিলেন, চাঁচকৈড় বাজার থেকে রাত ৯টার দিকে হেঁটে বাড়ি ফিরছিলেন। বাজারপাড়া এলাকার নুর অ্যাকাডেমির কাছে পৌঁছালে হেলমেট পরা দুই ব্যক্তি মোটরসাইকেলে এসে তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। গুলি থেকে বাঁচতে দৌড় দেন। গুলি গায়ে না লাগায় দুর্বৃত্তরা তার পেছনে ধাওয়া করে। পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক দুলাল সরকারের বাড়ির সামনে এলে দুর্বৃত্তরা তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করে। এ সময় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। চিৎকার শুনে স্থানীয় লোকজন এগিয়ে আসার আগেই মোটরসাইকেল নিয়ে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শী সুমন রহমান জানান, বাজারপাড়ার শহীদা জলিল স্কুলের কাছে পর পর দুটি গুলি শব্দ শুনতে পান তারা। এগিয়ে যেতেই শাকিলকে দৌড়ে চলে যেতে দেখেন। পেছনে মোটরসাইকেল নিয়ে ধাওয়া করে দুই ব্যক্তি। কিছুক্ষণ পর রক্তমাখা অস্ত্র নিয়ে হামলাকারীদের ফিরতে দেখেন। পরে শহীদা জলিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পেছনে চিৎকার করছিলেন শাকিল। তারা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান।
গুরুতর আহত অবস্থায় শাকিলকে উদ্ধার করে প্রথমে গুরুদাসপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর রাতেই উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহীতে পাঠানো হয়।
তখন গুরুদাসপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক নওশিন জাহান বলেছিলেন, গুরুতর অবস্থায় তাকে হাসপাতালে আনা হয়েছিল। হাত-পাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাত করা হয়। শারীরিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় চিকিৎসা শেষে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
যুবদল নেতা ইসরাফিল শেখ বলেন, হামলার রাতেই রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে শাকিলকে অন্তত পাঁচ ব্যাগ রক্ত দেয়া হয়। এরপর অবস্থার অবনতি হলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে অপারেশনের পর অবস্থার অবনতি হলে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার কিডনি কাজ করছিল না। শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হওয়ায় ওই হাসপাতালে নিবিড় পর্যবেক্ষণে নেয়া হয়। আইসিইউতে রাখার পর লাইফ সাপোর্ট দেয়া হয়। সবশেষ সোমবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
নাটোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতেখার আহমেদ বলেন, চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ড তদন্ত করতে পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে। অপরাধী যত বড় প্রভাবশালী হোক না কেন পুলিশ ছাড় দেবে না।
শাকিলের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার বিকেল ৩টায় রাজধানীর নয়া পল্টন এলাকায় বিএনপির দলীয় কার্যালয়ের সামনে নিহত শাকিলের প্রথম জানাজা হয়। এরপর এশার নামাজের পর বিলচলন শহীদ শামসুজ্জোহা কলেজ মাঠে দ্বিতীয় জানাজা হওয়ার কথা রয়েছে। জানাজা শেষে তাকে চাঁচকৈড় পুড়ানপাড়া কেন্দ্রীয় কবরস্থানে দাফন করা হবে।
আপন দেশ/এসআর
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।





































