ছবি: আপন দেশ
গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার নাগরী ইউনিয়নে অবস্থিত সেন্ট নিকোলাস চার্চ (সেন্ট নিকোলাস অব টলেনটিনো চার্চ)। যা বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন খ্রিষ্টান উপাসনালয়।
প্রায় সাড়ে তিনশ বছরের ইতিহাসের সাক্ষী এ চার্চটি শুধু দৃষ্টিনন্দন ধর্মীয় স্থাপনা নয়, বরং এটি কালীগঞ্জের প্রাচীন স্থাপত্যের ঐতিহ্য, বাংলা ভাষা শিক্ষা ও উপমহাদেশের ইতিহাসেরও এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।
বাংলাদেশে পুরোনো যে কয়টি গির্জা রয়েছে তার মধ্যে দ্বিতীয় পুরোনো গির্জাটি টলেন্টিনির সেন্ট নিকোলাস চার্চ বা নাগরী গির্জা নামে পরিচিত।
গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার নাগরী এলাকায় ১৬৬৩ সালে সেন্ট নিকোলাস চার্চটি স্থাপিত হয়। চার্চটি এ উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীনতম চার্চ।
ঢাকার তেজগাঁও এ অবস্থিত তেজগাঁও গির্জা এবং টলেন্টিনির সাধু নিকোলাস গির্জা পর্তুগিজরা নির্মাণ করেছিলেন। মূলত, ব্যাবসায়িক উদ্দেশে পর্তুগিজদের এ দেশে আগমন ঘটলেও তারাই প্রথম খ্রিষ্ট ধর্ম প্রচার শুরু করেন।
তথ্যে জানা যায়, এখান থেকে কালীগঞ্জের আঞ্চলিক বাংলা ভাষার প্রথম বাইবেল অনূদিত হয়। এমনকি বাংলা ভাষার প্রথম দ্বিভাষিক অভিধানও প্রথম ছাপা বই এখান থেকেই। যার প্রকাশনা প্রমাণ মিলেছে।
পর্তুগিজ ভাষায় বাংলা ভাষার প্রথম ব্যাকরণ ও ডিকশনারি রচনাকারী পাদরি ম্যানুয়েল দ্যা অ্যাসুম্পসাও এ গির্জারই পাদ্রী ছিলেন এবং এখানেই তিনি গ্রন্থ রচনা করতেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, স্থানীয়দের সহযোগিতা ও পর্তুগিজ ব্যবসায়ীদের আর্থিক সহায়তায় সাধু নিকোলাস গির্জাটি নির্মাণ করেন। তাই তার নামানুসারে এ গির্জার নামকরণ করা হয় টলেন্টিনির সাধু নিকোলাস গির্জা। নাগরী এলাকায় স্থাপিত হওয়ায় স্থানীয়রা একে নাগরী গির্জা নামে ডাকে।
গির্জা এলাকায় বিশাল ২টি সমাধিস্থল রয়েছে। পুরাতন গির্জাটির পাশেই বিশাল এলাকাজুড়ে আধুনিকভাবে নতুন গির্জা ভবন নির্মিত হয়েছে।
ঐতিহাসিক ভাবে জানা যায়, মসলা ও ভারতীয় মসলিনের খোঁজে ইউরোপ থেকে ১৪৯৮ সালে ভারতে আসার পথ আবিষ্কার করেন পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো-দা-গামা। এরপর হতেই দলে দলে ইউরোপীয়রা উপমহাদেশে আসতে থাকে এবং মিশনারিদের হাত ধরে এ অঞ্চলে খ্রিষ্টধর্মের বিস্তার লাভ করে।
ষোড়শ শতাব্দীর শেষ দিকে পর্তুগিজ খ্রিষ্টানরা এখানে আস্তানা ফেলে এবং সম্রাট জাহাঙ্গীরের অনুমতিক্রমে ১৬৬৩ সালে তারা প্রথম গির্জাটি স্থাপন করে।
পরে ১৬৮০ সালে পাকা ইমারত হয় নাগরীর সেন্ট নিকোলাস চার্চ। পর্তুগিজ স্থাপত্য নিদর্শনে তৈরি দর্শনীয় সেন্ট নিকোলাস চার্চ ও সাধু আন্তনির তীর্থস্থান নগরীকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে ফুটিয়ে তুলেছে।
আরও পড়ুন <<>> ঠাকুরগাঁওয়ে ‘ফিল্মি কায়দায়’ পুলিশের হেফাজত থেকে পালালেন আসামি
প্রায় প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভ্রমণ পিপাসু পর্যটকেরা এ গির্জার মনোরম দৃশ্য উপভোগ করতে আসেন। নতুন ভবনের সামনে স্থাপন করা হয়েছে হস্ত প্রসারিত যিশুর দণ্ডায়মান একটি মূর্তি।
গির্জাটি বর্তমান সময়ের আধুনিক একটি নির্মাণশৈলী। গির্জাটির স্থাপত্য পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বারান্দাযুক্ত প্রবেশপথ। সমবেত উপাসনার জন্য কক্ষ ও বেদি এবং একান্ত প্রার্থনা কক্ষ। সেন্ট নিকোলাস চার্চে চিরাচরিত নার্দেক্সের পরিবর্তে বাংলা ঘরের অনুকরণে চারটি মজবুত খুঁটির ওপর সমতল ছাদযুক্ত একটি বারান্দা তৈরি করা হয়েছে। এটা ইউরোপীয় গির্জা স্থাপত্যের দেশীয় চরিত্র হিসেবেও ধরা যেতে পারে।
সেন্ট নিকোলাস চার্চের পাল পুরোহিত ফাদার খোকন ভিনসেন্ট গমেজ একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেন, গির্জায় শনিবার ও সপ্তাহের প্রতি রোববারে খৃষ্টজাক বা মিশা হয়ে থাকে। মেশায় দেশের জন্য শান্তি কামনায় প্রার্থনা হয়ে থাকে।
তিনি আরও বলেন, যিশু শান্তিরাজ বা অনন্য মন্ত্রণাদাতা, হিসেবে মা মারিয়ামের গর্ভে আসেন এবং মানুষকে পাপ থেকে মুক্তি দিতে জগতে তার আগমন ঘটে। খ্রিষ্ট ধর্মের মূল কথা হচ্ছে ভালবাসা। তা ছাড়া যীশুর জন্মদিন উপলক্ষ্যে ২৫ ডিসেম্বর বড় দিন, ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও স্টার সানডেতে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে দিনটি পালিতো হয়।
আপন দেশ/এসএস
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।





































