ছবি: আপন দেশ
ঝড়বৃষ্টিতে উত্তাল বঙ্গোপসাগর। যেখানে এখন ট্রলার টিকে থাকতে পারছে না, সেখানে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের সঙ্গে তিন দিন লড়াই করে প্রাণ নিয়ে ফিরেছেন জেলে আল আমিন হাওলাদার (৪২)। যিনি চোখের সামনে সহকর্মীদের মরদেহ সাগরে ভেসে যেতে দেখেছেন।
ভাসতে ভাসতে শেষ পর্যন্ত ভোলার ঢালচর নদ এলাকায় পৌঁছালে স্থানীয় জেলেরা আল আমিনকে উদ্ধার করেন। তিনি পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার ইছাদী গ্রামের মৃত চান মিয়া হাওলাদারের ছেলে।
গত ০৫ জুলাই রাত ১০টার দিকে আকস্মিক ঝড়ের কবলে পড়ে পায়রা সমুদ্রবন্দর এলাকার পূর্ব-দক্ষিণে গভীর বঙ্গোপসাগরে একটি মাছ ধরার ট্রলার ডুবে যায়। ট্রলারটিতে আল আমিনসহ ১১ মাঝিমাল্লা ছিলেন। দুর্ঘটনার পর সবাই নিখোঁজ হন। এর মধ্যে গত সোমবার পাঁচ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। নিখোঁজ বাকি ছয় জনের মধ্যে আল আমিনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। পরে তাকে পটুয়াখালীতে পরিবারের কাছে দেয়া হয়।
দীর্ঘ সময় সাগরে ভেসে থাকার কারণে লবণাক্ত পানি পেটে ঢুকে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন আল আমিন। তাকে উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন গলাচিপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবুজর মো. ইজাজুল হক।
চিকিৎসাধীন আল আমিন জানান, রোববার (০৫ জুলাই) রাত ১০টার দিকে তিনি ও অন্য মাঝিমাল্লারা গভীর বঙ্গোপসাগরে জাল ফেলেছিলেন। এ সময় হঠাৎ তীব্র বেগে বাতাস শুরু হলে ট্রলারটি উল্টে ডুবে যায়। এ সময় ট্রলারের মালিক এমাদুল সিকদার, হারুন মিয়া, আকাশ, রাকিব, শাকিল, নাজমুল, বায়জীদ ও তিনি (আল আমিন) ট্রলারের বাইরে থাকায় সহজে বের হতে পারেন। কিন্তু তার আত্মীয় ফোরকান হাওলাদার, ফোরকানের ছেলে সায়েম ও পানপট্টি এলাকার এবাদুল ট্রলারের কেবিনে থাকায় বের হওয়ার সুযোগ পাননি।
আরও পড়ুন<<>>ভারতে পাচারকালে বিপুল সার জব্দ
আল আমিন জানান, উত্তাল সাগরে একপর্যায়ে ট্রলারমালিক এমাদুল সিকদার, নাজমুল, বায়জীদ, শাকিল ও রাকিব তাদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। তিনি, হারুন ও আকাশ ডুবে যাওয়া ট্রলারের একটি অংশ এবং একটি ফিশিং বয়া ধরে ভেসে থাকেন। দুই দিন পর উল্টে থাকা ট্রলারের কেবিন থেকে ফোরকান ও এবাদুলের লাশ বের হয়ে সাগরে ভেসে যেতে দেখেন তারা। তিনি এ দৃশ্য দেখে কাঁদতে থাকেন, একপর্যায়ে কান্না চেপে রেখে বেঁচে থাকার চেষ্টা করতে থাকেন।
তিনি বলেন, উত্তাল ঢেউয়ের মধ্যে একপর্যায়ে হারুন ও আকাশের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি। এরপর একটি ছোট ফিশিং বয়া পেটের নিচে চেপে ধরে একাই ভেসে থাকি। ক্ষুধা–পিপাসায় দুর্বল হয়ে জ্ঞান হারানোর মতো অবস্থা হয়েছিল। অবশেষে ভাসতে ভাসতে বুধবার সন্ধ্যায় ভোলার ঢালচর নদ এলাকায় পৌঁছালে স্থানীয় জেলে দুলাল মাঝি ও তার সহকর্মীরা উদ্ধার করেন। সেখান থেকে ভোলার চরফ্যাশনে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে পরিবারের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়।
গলাচিপার জ্যেষ্ঠ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. জহিরুন্নবী বলেন, সোমবার এমাদুল, নাজমুল, শাকিল, বায়জীদ ও রাকিবকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। বৃহস্পতিবার (০৯ জুলাই) আল আমিনকে উদ্ধার করা হয়। তার শারীরিক অবস্থা খারাপ থাকায় গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।
এখন পর্যন্ত নিখোঁজ আছেন হারুন, আকাশ, ফোরকান, সায়েম ও এবাদুল। ফোরকান ও এবাদুলের মরদেহ সাগরে ভেসে যেতে দেখেছেন বলে দাবি করেছেন উদ্ধার হওয়া আল আমিন।
গলাচিপার ইউএনও আবুজর মো. ইজাজুল হক বলেন, উদ্ধার হওয়া ও নিখোঁজ জেলেদের পরিবারের সদস্যদের বাড়িতে গিয়ে আর্থিক সহায়তা ও খাদ্যসামগ্রী দেয়া হয়েছে। তাদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
নিখোঁজ জেলেদের উদ্ধারের বিষয়ে তিনি বলেন, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর সহায়তা চাওয়া হয়েছে। স্থানীয় জেলেদের কাছেও নিখোঁজদের সন্ধানে সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।
আপন দেশ/জেডআই
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।




































