Apan Desh | আপন দেশ

প্রশ্নের মুখে রিপাবলিক ইন্স্যুরেন্সের আর্থিক প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিবেদক, আপন দেশ

প্রকাশিত: ১১:৫৭, ৭ জুন ২০২৬

প্রশ্নের মুখে রিপাবলিক ইন্স্যুরেন্সের আর্থিক প্রতিবেদন

রিল্যায়েন্স ইন্স্যুরেন্সের লোগো

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত রিপাবলিক ইন্স্যুরেন্স পিএলসির ২০২৫ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অনিয়ম, আর্থিক ঘাটতি ও নিয়ন্ত্রক বিধি লঙ্ঘনের বিষয় উঠে এসেছে। এসব কারণে কোম্পানিটির বহিঃনিরীক্ষক ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ সমাপ্ত অর্থবছরের আর্থিক বিবরণীর ওপর ‘কোয়ালিফায়েড ওপিনিয়ন’ (Qualified Opinion) প্রদান করেছেন। 

পাশাপাশি ‘এমফ্যাসিস অব ম্যাটার’ অংশে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোম্পানিটির গ্র্যাচুইটি দায় যথাযথভাবে হিসাবায়ন করা হয়নি। বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ অনুযায়ী টানা ১০ বছরের বেশি সময় চাকরি করা কর্মচারীদের প্রতি সম্পূর্ণ চাকরিকালের জন্য প্রতি বছরের বিপরীতে ৪৫ দিনের মজুরি সমপরিমাণ গ্র্যাচুইটি প্রদানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে কোম্পানিটি শুধু সাম্প্রতিক কয়েক বছরের সংরক্ষিত প্রভিশনের ভিত্তিতে দায় দেখিয়েছে, যা প্রকৃত দায়ের তুলনায় কম। চলতি বছরে কিছু অতিরিক্ত প্রভিশন সংরক্ষণ করা হলেও পূর্ববর্তী বছরের দায় পুনর্মূল্যায়ন না করায় মোট গ্র্যাচুইটি দায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম দেখানো হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন নিরীক্ষকরা।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোম্পানির আর্থিক বিবরণীতে গ্র্যাচুইটি প্রভিশন দেখানো হয়েছে ৮৪ লাখ ১৭ হাজার ৯৫৪ টাকা। কিন্তু এ জন্য নির্ধারিত ব্যাংক হিসাবে জমা রয়েছে মাত্র ৭ লাখ ৯ হাজার ৬১০ টাকা। ফলে গ্র্যাচুইটি তহবিলে ৭৭ লাখ ৮ হাজার ৩৪৪ টাকার ঘাটতি রয়েছে।

নিরীক্ষকরা আরও উল্লেখ করেছেন, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মান (IFRS-9) অনুসারে সম্ভাব্য ঋণ ক্ষতি (Expected Credit Loss-ECL) তাৎক্ষণিকভাবে আয়-ব্যয় হিসাবে স্বীকৃতি দেয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও রিপাবলিক ইন্স্যুরেন্স তা অনুসরণ করেনি। কোম্পানিটির ডিপোজিট ক্লিয়ারিং ও স্বল্পমেয়াদি আমানতের বিপরীতে ৬৩ লাখ ৯১ হাজার ৭৭৪ টাকার সম্ভাব্য ক্ষতি তাৎক্ষণিকভাবে হিসাবভুক্ত না করে পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সাত বছরে সমান কিস্তিতে সমন্বয়ের নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। ফলে চলতি বছরের ব্যয় কম দেখানো হয়েছে এবং সম্পদের মূল্য বেশি প্রদর্শিত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এ ছাড়া সাধারণ বীমা করপোরেশনের (এসবিসি) সঙ্গে কোম্পানির লেনদেনের হিসাবও নিরীক্ষকদের কাছে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, এসবিসির কাছে কোম্পানির প্রাপ্য রয়েছে ৭৯ কোটি ৯৭ লাখ ২৪ হাজার ৪৯৭ টাকা এবং প্রদেয় রয়েছে ৬ কোটি ৫ লাখ ৪৫ হাজার ৬৩৯ টাকা। এ বিষয়ে নিরীক্ষকরা ব্যালেন্স নিশ্চিতকরণের জন্য অনুরোধ পাঠালেও নিরীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশের তারিখ পর্যন্ত কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

আরও পড়ুন<<>>দুই ঘণ্টায় ৭২২ কোটি টাকার শেয়ার লেনদেন

নিরীক্ষা প্রতিবেদনের ‘এমফ্যাসিস অব ম্যাটার’ অংশে বলা হয়েছে, বীমা আইন, ২০১০ অনুযায়ী কোম্পানির স্পন্সর বা উদ্যোক্তা শেয়ারহোল্ডারদের সম্মিলিতভাবে পরিশোধিত মূলধনের কমপক্ষে ৬০ শতাংশ শেয়ার ধারণ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে রিপাবলিক ইন্স্যুরেন্সে উদ্যোক্তাদের শেয়ার ধারণের হার মাত্র ৪১ দশমিক ৬৭ শতাংশ। বিপরীতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে ৫৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ শেয়ার। ফলে কোম্পানিটি আইনগতভাবে নির্ধারিত শেয়ার ধারণের শর্ত পূরণ করতে পারেনি।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, কোম্পানিটি ২০১৪ সাল থেকে শ্রমিকদের মুনাফা অংশগ্রহণ তহবিল (WPPF) বাবদ প্রভিশন সংরক্ষণ করে আসছে। বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী অর্থবছর শেষ হওয়ার নয় মাসের মধ্যে এ অর্থ শ্রমিক অংশগ্রহণ তহবিল, শ্রমিক কল্যাণ তহবিল এবং বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনে যথাক্রমে ৮০:১০:১০ অনুপাতে বিতরণ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) নির্দেশনার ভিত্তিতে কোম্পানিটি এখন পর্যন্ত এসব অর্থ বিতরণ করেনি।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, কোম্পানির তিনটি স্থায়ী আমানত রসিদ (এফডিআর), যার মোট মূল্য ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা, বর্তমানে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) অনুকূলে বন্ধক (Lien) রাখা হয়েছে। পরিশোধিত মূলধনের বিপরীতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা মেনে এ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

করপোরেট গভর্ন্যান্স কোড, ২০১৮ অনুসারেও কোম্পানিটির একটি ঘাটতি ছিল। বিধান অনুযায়ী ১৬ সদস্যের পরিচালনা পর্ষদে কমপক্ষে চারজন স্বতন্ত্র পরিচালক থাকার কথা। কিন্তু নিরীক্ষা সময় পর্যন্ত কোম্পানির বোর্ডে স্বতন্ত্র পরিচালকের সংখ্যা ছিল মাত্র তিনজন। ফলে করপোরেট গভর্ন্যান্স কোডের শর্ত পূরণ হয়নি। তবে পরবর্তীতে বিএসইসির অনুমোদন নিয়ে একজন নারী স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগের মাধ্যমে এ ঘাটতি পূরণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

নিরীক্ষকরা জানিয়েছেন, উল্লিখিত বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেগুলোর কারণে আর্থিক বিবরণীর সামগ্রিক উপস্থাপনা পুরোপুরি অগ্রহণযোগ্য হয়ে যায়নি। তবে গ্র্যাচুইটি দায়, সম্ভাব্য ঋণ ক্ষতির হিসাব, স্পন্সর শেয়ার ধারণ এবং শ্রমিক কল্যাণ তহবিল বিতরণ সংক্রান্ত বিষয়গুলো কোম্পানির আর্থিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।

আপন দেশ/জেডআই

মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়