Apan Desh | আপন দেশ

মহানবীর (সা.) আদর্শ, শিক্ষা

আপন দেশ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১০:৩৯, ২৬ আগস্ট ২০২৬

মহানবীর (সা.) আদর্শ, শিক্ষা

ছবি: আপন দেশ

রবিউল আউয়াল হিজরি সনের তৃতীয় মাস। প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র জীবন ও কর্মের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত হওয়ায় মুসলিম উম্মাহর কাছে এ মাসের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। প্রচলিত ঐতিহাসিক বর্ণনায় এ মাসে মহানবী (সা.)-এর জন্ম ও ওফাতের কথা উল্লেখ করা হয়; তার হিজরতের সফরও এ মাসে মদিনায় পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে ঐতিহাসিক পরিণতি লাভ করে। তাই রবিউল আউয়াল এলে মুমিনের হৃদয়ে নবীপ্রেম, তার আদর্শ অনুসরণের আকাঙ্ক্ষা এবং তার মহান জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণের প্রেরণা জাগ্রত হয়।

আল্লাহ তাআলা মহানবী (সা.)-কে কেবল একটি জাতি বা ভূখণ্ডের জন্য নয়, সমগ্র বিশ্বমানবতার জন্য রহমত হিসেবে প্রেরণ করেছেন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে— وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ

অর্থ: আমি আপনাকে সমগ্র জগতের জন্য রহমতস্বরূপই প্রেরণ করেছি। (সুরা আল-আম্বিয়া: আয়াত ১০৭)

তার জীবন ছিল শান্তি, সাম্য, ন্যায়, মানবিকতা, ক্ষমা, সহমর্মিতা ও উত্তম চরিত্রের অনন্য দৃষ্টান্ত। তাই মহানবী (সা.)-এর আদর্শ শুধু ইতিহাসের কোনো অধ্যায় নয়; বরং ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনকে সুন্দর করার জন্য চিরন্তন পথনির্দেশ।

জাহেলিয়াতের অন্ধকারে আলোর আবির্ভাব
মহানবী (সা.)-এর আবির্ভাবের আগে আরব সমাজে নানা ধরনের নৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয় ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করেছিল। পাপাচার, ব্যভিচার, মিথ্যাচার, হত্যা, লুণ্ঠন, মদ্যপান, জুয়া, গোত্রীয় সংঘাত ও প্রতিহিংসা সমাজজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল। ধর্মীয় জীবনে শিরক ও কুফর ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। নারীসমাজ ছিল চরম অবহেলা ও অধিকারবঞ্চনার শিকার। এমনকি কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করাকে অনেকেই লজ্জার বিষয় মনে করত এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে জীবন্ত কন্যাশিশুকে মাটিতে পুঁতে ফেলা হতো।

এমন এক অন্ধকারাচ্ছন্ন সময়ে মানবতার মুক্তির দিশারি, সর্বশেষ নবী ও রাসুল হজরত মুহাম্মদ (সা.) আবির্ভূত হন। তার দাওয়াত মানুষের হৃদয়কে তাওহিদ, নৈতিকতা, ন্যায় ও মানবিকতার আলোয় আলোকিত করে। আল্লাহ তাআলা তাকে সমগ্র জগতের জন্য রহমত হিসেবে পাঠিয়েছেন— এটাই তার মিশনের ব্যাপকতা ও মহত্ত্বের পরিচয়।

মহানবী (সা.)-এর জন্ম ও জীবনধারার তাৎপর্য
প্রচলিত সীরাতের বর্ণনা অনুযায়ী, ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে পবিত্র মক্কায় রবিউল আউয়াল মাসে সোমবার মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) জন্মগ্রহণ করেন। তার জন্মের মধ্য দিয়ে মানবসভ্যতার ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। তবে তার জন্মতারিখ হিসেবে ১২ রবিউল আউয়াল বহুল প্রচলিত হলেও সুনির্দিষ্ট তারিখ নিয়ে ঐতিহাসিক মতভেদ রয়েছে। তাই জন্মতারিখের পাশাপাশি তার জীবন, চরিত্র ও শিক্ষা অনুসরণ করাই হওয়া উচিত আমাদের মূল লক্ষ্য।

মহানবী (সা.)-এর চরিত্র ও জীবন মুসলমানদের জন্য অনুসরণীয় আদর্শ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন— لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِّمَن كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا

অর্থ: নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ—তার জন্য, যে আল্লাহ ও শেষ দিনের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে। (সুরা আল-আহযাব: আয়াত ২১)

শান্তি প্রতিষ্ঠায় মহানবী (সা.)-এর ভূমিকা
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন শান্তি ও সহমর্মিতার মূর্ত প্রতীক। তৎকালীন আরবের বিভিন্ন গোত্রে দীর্ঘদিন ধরে হিংসা-বিদ্বেষ, সংঘাত ও যুদ্ধবিগ্রহ চলত। মহানবী (সা.) সংঘাতের পরিবর্তে শান্তি, প্রতিহিংসার পরিবর্তে ক্ষমা এবং বিভেদের পরিবর্তে ঐক্য প্রতিষ্ঠায় গুরুত্ব দেন। বিভিন্ন গোত্র ও জনগোষ্ঠীর সঙ্গে চুক্তি ও সন্ধির মাধ্যমে তিনি একটি সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে তোলেন।

তার শিক্ষা ছিল—সমাজে নিরাপত্তা ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে মানুষের অধিকার রক্ষা করতে হবে, অন্যায় ও জুলুম থেকে বিরত থাকতে হবে এবং পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ন্যায় ও সৌহার্দ্য বজায় রাখতে হবে।

নারীসমাজের মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠা
ইসলামপূর্ব আরব সমাজে নারীকে অনেক ক্ষেত্রে ভোগের বস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হতো। তাদের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও অধিকার ছিল অত্যন্ত সীমিত। কন্যাশিশুকে জীবন্ত কবর দেওয়ার মতো নিষ্ঠুর প্রথাও বিদ্যমান ছিল।

আরও পড়ুন<<>>পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) আজ

মহানবী (সা.) এসে নারীজাতির মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন এবং তাদের প্রতি সদাচরণের শিক্ষা দেন। তিনি নারীর প্রতি উত্তম আচরণকে ঈমান ও উত্তম চরিত্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— أَكْمَلُ الْمُؤْمِنِينَ إِيمَانًا أَحْسَنُهُمْ خُلُقًا وَخِيَارُكُمْ خِيَارُكُمْ لِنِسَائِهِمْ خُلُقًا

অর্থ: মুমিনদের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ ঈমানের অধিকারী সে-ই, যার চরিত্র সর্বোত্তম; আর তোমাদের মধ্যে উত্তম তারাই, যারা তাদের নারীদের প্রতি উত্তম আচরণ করে। (তিরমিজি ১১৬২)

আরেক হাদিসে নারীদের সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ দিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— وَاسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ خَيْرًا

অর্থ: তোমরা নারীদের প্রতি উত্তম আচরণের ব্যাপারে বিশেষভাবে যত্নশীল হও। (মুসলিম ১৪৬৮) 

তিনি কন্যাসন্তানের লালন-পালনকে সম্মানের বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং নারীকে বিবাহের ক্ষেত্রে তার সম্মতি ও অধিকার প্রদান করেন। সহিহ মুসলিমে এসেছে— الثَّيِّبُ أَحَقُّ بِنَفْسِهَا مِنْ وَلِيِّهَا وَالْبِكْرُ تُسْتَأْذَنُ فِي نَفْسِهَا

অর্থ: পূর্বে বিবাহিত নারী তার নিজের ব্যাপারে তার অভিভাবকের চেয়ে বেশি অধিকার রাখে; আর কুমারী নারীর কাছ থেকেও তার সম্মতি নেয়া হবে। (মুসলিম ১৪২১)

ইসলাম নারীকে উত্তরাধিকার, মোহর, ভরণপোষণসহ বিভিন্ন অধিকার প্রদান করে এবং তালাকপ্রাপ্ত ও বিধবা নারীর অধিকার সংরক্ষণের নির্দেশ দেয়। একইভাবে এতিম-অনাথদের স্বার্থ রক্ষা এবং তাদের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ না করার ব্যাপারেও কঠোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এতিমের পরিচর্যার মর্যাদা বোঝাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— أَنَا وَكَافِلُ الْيَتِيمِ فِي الْجَنَّةِ هَكَذَا

অর্থ: আমি এবং এতিমের অভিভাবক জান্নাতে এভাবে থাকব’— এ কথা বলে তিনি তর্জনী ও মধ্যমা আঙুল পাশাপাশি দেখিয়েছেন। (বুখারি ৬০০৫)

সাম্য, মানবমর্যাদা ও ভ্রাতৃত্বের শিক্ষা
মহানবী (সা.) মানুষের মধ্যে বংশ, গোত্র, জাতি, ভাষা বা বর্ণের ভিত্তিতে অহংকার ও শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা দূর করেন। তিনি এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে মানুষের মর্যাদার মাপকাঠি ছিল তাকওয়া ও সৎকর্ম। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন— يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُم مِّن ذَكَرٍ وَأُنثَىٰ وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا ۚ إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ ۚ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ

অর্থ: হে মানবজাতি! আমি তোমাদের একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হতে পার। নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সে-ই অধিক মর্যাদাবান, যে অধিক তাকওয়াবান। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সর্ববিষয়ে অবহিত। (সুরা আল-হুজুরাত: আয়াত ১৩)

এ কুরআনিক শিক্ষাই মহানবী (সা.)-এর সমাজ সংস্কারের অন্যতম ভিত্তি। বিদায় হজের ভাষণে তিনি মানুষের পারস্পরিক মর্যাদা ও সাম্যের যে শিক্ষা দিয়েছেন, তার মর্মার্থ হলো—জাতি, বর্ণ, ভাষা বা বংশ মানুষের প্রকৃত শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি নয়; আল্লাহভীতি ও নৈতিকতাই মর্যাদার আসল মানদণ্ড। বংশ নিয়ে অহংকারের বিরুদ্ধেও তিনি কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন। 

মহানবী (সা.)-এর আদর্শ: আজকের সমাজে প্রাসঙ্গিকতা
মহানবী (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণ মানে শুধু তাকে ভালোবাসার কথা বলা নয়; বরং তার চরিত্র ও শিক্ষাকে জীবনে বাস্তবায়ন করা। সত্যবাদিতা, আমানতদারি, ন্যায়পরায়ণতা, দয়া, ক্ষমাশীলতা, প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা, নারী ও শিশুর প্রতি সম্মান, এতিম-দরিদ্রের পাশে দাঁড়ানো এবং মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ দূর করা— এসবই তার শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

আজকের পৃথিবীতে যখন হিংসা, বিদ্বেষ, বৈষম্য, পারিবারিক অশান্তি ও সামাজিক বিভাজন নানা রূপে দেখা দিচ্ছে, তখন মহানবী (সা.)-এর শান্তি, ন্যায়, মানবিকতা ও ভ্রাতৃত্বের শিক্ষা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। তার আদর্শ ব্যক্তি থেকে পরিবার, পরিবার থেকে সমাজ এবং সমাজ থেকে রাষ্ট্রে বাস্তবায়িত হলে একটি সুন্দর, ন্যায়ভিত্তিক ও শান্তিপূর্ণ মানবসমাজ গড়ে উঠতে পারে।

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মানবজাতির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এক মহান রহমত। তিনি অজ্ঞতা ও জাহেলিয়াতের অন্ধকার দূর করে মানুষকে তৌহিদ, ন্যায়, সাম্য, শান্তি ও মানবিকতার পথে আহ্বান করেছেন। তিনি নারীকে মর্যাদা দিয়েছেন, এতিমের অধিকার রক্ষা করেছেন, দুর্বল ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং জাতি-বর্ণ-গোত্রের অহংকারের পরিবর্তে তাকওয়া ও উত্তম চরিত্রকে শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন।

তাই রবিউল আউয়ালে নবীপ্রেম প্রকাশের সর্বোত্তম উপায় শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং তার সুন্নাহ ও আদর্শকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ধারণ করা। আমাদের কথা, কাজ, পরিবার, ব্যবসা, সামাজিক আচরণ ও মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক— সবকিছুতে যদি মহানবী (সা.)-এর উত্তম চরিত্রের প্রতিফলন ঘটে, তাহলেই তার প্রতি ভালোবাসা সত্যিকার অর্থে সার্থক হবে।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে মহানবী (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণ করার, তার সুন্নাহ আঁকড়ে ধরার এবং তার দেখানো শান্তি, সাম্য ও মানবিকতার পথে জীবন পরিচালনা করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

আপন দেশ/জেডআই

মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়