Apan Desh | আপন দেশ

নিত্যপণ্যের চড়া দামে ক্ষুব্ধ ক্রেতারা

নিজস্ব প্রতিবেদক, আপন দেশ 

প্রকাশিত: ১১:৫৪, ২১ আগস্ট ২০২৬

নিত্যপণ্যের চড়া দামে ক্ষুব্ধ ক্রেতারা

ছবি: আপন দেশ

গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটে মানুষের দৈনন্দিন জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সময়মতো গ্যাস না পাওয়ায় রান্না করা অসম্ভব হচ্ছে। ঘনঘন লোডশেডিংয়ে গরমে ও অন্ধকারে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই বাজারে নিত্যপণ্যের বাড়তি দামে চাপে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। মাছ, মুরগি ও ডিমের দামে অস্বস্তি সবচেয়ে বেশি। 

বাজারে চড়া দামে ক্ষুব্ধ ক্রেতারা। পণ্যের দামের সঙ্গে খরচের হিসাব মেলাতে পারছেন না তারা। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের বাধ্য হয়ে কাটছাঁট করতে হচ্ছে বাজারের ফর্দে। কেউ কেউ প্রয়োজনের চেয়ে কিনছেন কম। আবার কাউকে আপস করতে হচ্ছে পণ্যের মানের সঙ্গে।

সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবার (২১ আগস্ট) রাজধানীর বিভিন্ন কাঁচাবাজার ও নিত্যপণ্যের দোকান ঘুরে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

 টানা বৃষ্টির প্রবণতা কমে যাওয়ায় সরবরাহ বাড়ায় সবজির দাম কিছুটা কমলেও বাজার এখনো স্বস্তিদায়ক নয়। কয়েক সপ্তাহ আগে সরবরাহের ঘাটতির কারণে অনেক সবজির দাম কেজিতে ১০০ টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। পরে সরবরাহ বাড়ায় কিছু সবজির দাম কমেছে। বর্তমানে বেশিরভাগ সবজি ৬০ থেকে ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। পটোল, পেঁপে ও ঢ্যাঁড়সের দাম তুলনামূলক কম।

কাঁচা মরিচের দাম অবশ্য কিছুটা কমেছে। খুচরা বাজারে কাঁচা মরিচ প্রতি কেজি ১২০ থেকে ১৬০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। পাইকারি বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১১০ টাকা কেজি।

বেগুন ও টমেটো এখনো ১২০-১৪০ টাকা কেজি। নতুন শিম ১৪০-১৬০ টাকা, শসা অর্ধেকে নেমে বিক্রি হচ্ছে ৪০-৫০, ধুন্দল-লাউ-পটোল-চিচিঙা ৪০-৬০, কচুর লতি ৯০-১১০ এবং করলা ৫০-৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। বরবটি-ঝিঙে ৭০, কচুরমুখী, কাঁকরোল, ঢ্যাঁড়স, পটোল ৪০-৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। শাকসবজির দামও কমে গেছে। সবচেয়ে বেশি কমেছে লেবুর দাম। ডজন ২০ থেকে ৬০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে।

পেঁয়াজের দামে অবশ্য বড় কোনো পরিবর্তন নেই। মানভেদে প্রতি কেজি ৫৫ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আলুর দামও দীর্ঘদিন ধরে প্রায় একই রয়েছে। প্রতি কেজি আলু ২৫ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। রাজধানীর বিভিন্ন রাস্তায় ভ্যানে পাঁচ কেজি আলু একসঙ্গে ১০০ টাকায় বিক্রি করতেও দেখা যাচ্ছে।

ডিমের দামও এখনো আগের উচ্চমূল্যেই রয়েছে। বাজারে প্রতি ডজন ডিম ১৫০ টাকা এবং চারটি ডিম ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রায় এক মাস ধরে ডিমের দাম উচ্চপর্যায়ে রয়েছে। এর আগে প্রতি ডজন ডিম ১৩০ থেকে ১৪০ টাকার মধ্যে বিক্রি হয়েছিল। মাংসের বাজারেও স্বস্তি নেই। বর্তমানে ব্রয়লার মুরগি প্রতি কেজি ১৮০ থেকে ২০০ টাকা এবং সোনালি মুরগি ৩৩০ থেকে ৩৪০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভারত থেকে কাঁচামরিচ আমদানি হওয়ায় সরবরাহ বেড়েছে। পাশাপাশি দেশি মরিচের সরবরাহ বেড়ে এর দামও কমেছে। পেঁয়াজের দামও কেজিতে ১০ টাকার মতো কমে ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

মাছের বাজারেও স্বস্তি নেই। তেলাপিয়া ২৫০ থেকে ২৬০ টাকা, পাঙাশ ২৩০ থেকে ২৫০ টাকা, রুই-কাতলা ৩৮০ থেকে ৪২০ টাকা এবং চিংড়ি ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। পাবদা ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা, বড় রুই ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা এবং ট্যাংরা প্রায় ৭০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

আরও পড়ুন<<>>দেশে আজকের স্বর্ণ-রুপার বাজারদর

এ ছাড়া ভেটকি ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা, মৃগেল ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, বাইন ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা এবং দেশি কই ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। চাষের কইয়ের দাম প্রায় ৩০০ টাকা। পোয়া ২৬০ টাকা এবং শোল ৭০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। চাষের শিং মাছ আকারভেদে ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা কেজি।

মাঝারি আকারের রুই ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা কেজি দরে পাওয়া যাচ্ছে। রূপচাঁদা, শোল ও নদীর বেলে মাছ কিনতে গেলে কেজিপ্রতি ১ হাজার টাকার বেশি খরচ হচ্ছে। ৯০০ গ্রাম থেকে ১ কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৫০০ টাকা কেজি দরে। ১ কেজি ৩০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের দাম প্রায় ৩ হাজার টাকা।

বাজার করতে আসা মাহমুদুল হাসান বলেন, মাছ কিনতে এসে মাথা নষ্ট হয়ে যায়। ২৫০ টাকার নিচে তেমন কোনো মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। তেলাপিয়াও প্রায় ২৫০ টাকা কেজি। আয় না বাড়লেও বাজার খরচ বাড়তে থাকায় মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে।

মাছ বিক্রেতা আল আমিন বলেন, মাছের দামে বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি। তবে একদিন কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা কমলেও পরদিন আবার দাম বেড়ে যায়।

ক্রেতাদের ভাষ্য, মাছ, মুরগি ও ডিম—তিনটি পণ্য কিনতেই এখন বেশি টাকা খরচ হচ্ছে। একটি পণ্যের দাম কিছুটা কমলে অন্যটির দাম বেড়ে যাচ্ছে। ফলে সীমিত আয়ের পরিবারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।

এদিকে মূল্যবৃদ্ধির তালিকায় যুক্ত হয়েছে আটা ও ময়দাও। বিক্রেতাদের তথ্য অনুযায়ী মোড়কজাত আটা (২ কেজি) বেড়ে ১২০-১৩০ টাকা এবং খোলা আটা কেজিতে ৬-১০ টাকা বেড়ে ৪৫-৫০ টাকা হয়েছে। একইভাবে মোড়কজাত ময়দা (২ কেজি) ১৩০ থেকে বেড়ে ১৬০ টাকা এবং খোলা ময়দা কেজিতে ৫-৭ টাকা বেড়ে ৬২ থেকে ৬৫ টাকায় ঠেকেছে।

চালের বাজার তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে। মোটা চাল ৫২-৫৫, বিআর-আটাশ ৬০, মিনিকেট ৭০-৭৮ এবং কাটারি নাজির ৮৫ টাকা কেজি। তবে পোলাও চাল এখনো বাড়তি দামে ২০০-২৩০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।

বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো মূল্যস্ফীতি। বিবিএস যে তথ্য দিচ্ছে, বাজারের চিত্র তা প্রমাণ করে না। দু-একটি ছাড়া প্রায় সব পণ্যের দাম বেড়েছে। এতে স্পষ্ট যে সরকারের শুল্ক বা ট্যাক্স কমানোর সুবিধা সাধারণ ভোক্তারা পাচ্ছেন না, যা অর্থনীতির বড় দুর্বলতা।

তারা বলেন, উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থায় কমিশন এজেন্ট ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ের ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে আমদানিকারক অনেকেই একে অপরের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক সমঝোতা (সিন্ডিকেট) করে দাম নির্ধারণ করেন। এতে বাজারে প্রতিযোগিতার অভাব দেখা দেয়। এই সুযোগেই অসাধু ব্যবসায়ীরা ইচ্ছেমতো দাম বাড়ান। 

যদিও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, দেশের বিভিন্ন স্থানে পণ্য পরিবহনে চাঁদাবাজির কারণে খরচ বাড়ছে। যার প্রভাব পড়ছে পণ্যের দামে। অন্যদিকে আমদানি ও প্রক্রিয়াজাতকারীরা বলছেন, সাম্প্রতিক গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে পণ্যের উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে উৎপাদন খরচ ও সরবরাহে। 

এ পরিস্থিতিতে অর্থনীতিবিদ ও ভোক্তা-সংশ্লিষ্টরা বাজারে নজরদারি বাড়ানো, কৃত্রিম সংকট রোধ, সিন্ডিকেট দমন ও পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থায় চাঁদাবাজি বন্ধের আহ্বান জানান। পাশাপাশি গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট দ্রুত নিরসন করে উৎপাদন খরচ কমানোর পরামর্শ দেন তারা।

আপন দেশ/জেডআই

মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়