Apan Desh | আপন দেশ

ওয়ান-ইলেভেনে মাইনাস ফর্মুলার অপ্রকাশিত গল্প

আফজাল বারী, আপন দেশ

প্রকাশিত: ১৫:০৩, ২২ অক্টোবর ২০২৬

আপডেট: ১৫:৩৮, ২২ অক্টোবর ২০২৬

ওয়ান-ইলেভেনে মাইনাস ফর্মুলার অপ্রকাশিত গল্প

২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর খালেদা জিয়ার কারাবরন। ছবি; সংগৃহীত

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০০৭-০৮ সালের ওয়ান-ইলেভেনের সময়টি ছিল নাটকীয় উত্থান-পতন, নেতৃত্বের সংকট এবং ক্ষমতার নানা সমীকরণে পরিপূর্ণ। জরুরি অবস্থার মধ্যে রাজনীতিতে সংস্কারের উদ্যোগ, বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিভাজন এবং শীর্ষ নেতৃত্বকে রাজনীতির বাইরে রাখার সম্ভাবনা নিয়ে তখন ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়। 

এ সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্যাটকো দুর্নীতি মামলা, তার গ্রেফতার এবং দেশত্যাগে সম্মতি আদায়ের কথিত উদ্যোগকে ঘিরে উঠে আসে নানা ঘটনা। সংশ্লিষ্ট ঘটনাবলির একটি বর্ণনায় দাবি করা হয়েছে, সংকটের সেই সময়ে বিএনপির কয়েকজন সাবেক ছাত্রদল নেতা ও তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা দলটির নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা রক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ওয়ান-ইলেভেনের রাজনৈতিক সমীকরণ, গ্যাটকো মামলার তদন্ত এবং খালেদা জিয়ার দেশত্যাগে অসম্মতিকে ঘিরে এক আলোচিত অধ্যায়

ওয়ান-ইলেভেনের পটভূমি ও সংস্কারের রাজনীতি

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি দেশে জরুরি অবস্থা জারি হয়। ড. ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরু করে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতারের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কার ও পুনর্গঠনের আলোচনা সামনে আসে। বিএনপির ভেতরে একাংশের নেতারা নেতৃত্ব পরিবর্তন ও সাংগঠনিক সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নিলে দলটির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ে।

১/১১’র কুশিলব ও বাস্তবায়নকারীদের একাংশ। ছবি: সংগৃহীত

প্রদত্ত বিবরণে ওয়ান-ইলেভেনের ঘটনাপ্রবাহকে দেশীয় রাজনৈতিক সংকটের পাশাপাশি আঞ্চলিক ভূরাজনীতির প্রেক্ষাপটেও ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এতে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এবং ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের কথিত প্রভাবের প্রসঙ্গ এসেছে। তবে এসব পরিকল্পনা, অর্থায়ন কিংবা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সমন্বিত ভূমিকার দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করার মতো প্রামাণ্য দলিল এখানে উপস্থাপিত হয়নি। ফলে এগুলোকে প্রতিষ্ঠিত সত্যের পরিবর্তে রাজনৈতিক বয়ানের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

গ্যাটকো মামলা: চাপের কেন্দ্রে জিয়া পরিবার

২০০৭ সালের ০২ সেপ্টেম্বর গ্যাটকো দুর্নীতি মামলা দায়ের করা হয়। পরদিন ০৩ সেপ্টেম্বর বেগম খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করা হয়। মামলাটির অভিযোগ ছিল, ২০০৪ সালে ঢাকা আইসিডি ও চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের কাজ গ্লোবাল অ্যাগ্রো ট্রেড কোম্পানি লিমিটেডকে (গ্যাটকো) দেয়ার ক্ষেত্রে দরপত্রের শর্ত লঙ্ঘন, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সরকারি আর্থিক ক্ষতি সাধন করা হয়েছিল।

সাবেক ছাত্রনেতাদের ভূমিকা ও অনড় খালেদা জিয়া।
মামলার এজাহারে খালেদা জিয়া, তার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোসহ ১৫ জনকে আসামি করা হয়। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল দরপত্র প্রক্রিয়া, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা এবং চুক্তি অনুমোদনের সিদ্ধান্ত। মামলাটিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে জিয়া পরিবারকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল- এমন অভিযোগও সংশ্লিষ্ট বর্ণনায় উঠে এসেছে।

তদন্ত কর্মকর্তা ড. জহিরুল হুদার ভূমিকা

গ্যাটকো মামলার তদন্তের দায়িত্ব পান দুর্নীতি দমন কমিশনের তৎকালীন উপপরিচালক মোহাম্মদ জহিরুল হুদা। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পর তার অতীত রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়ে কমিশনের ভেতরে আলোচনা তৈরি হয় বলে বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে।

জাহাঙ্গীর নগর বিশ্বদ্যিালয় শাখা ছাত্রদল নেতা জহুরুল হুদা জালাল। ছবি: সংগৃহীত
বিবরণ অনুযায়ী, তদন্ত কর্মকর্তা নথিপত্র পর্যালোচনা করে ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে একটি তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করেন। এতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পাশাপাশি তৎকালীন মন্ত্রিসভার ক্রয় কমিটির কয়েকজন সদস্য এবং বিএনপির সংস্কারপন্থি হিসেবে পরিচিত নেতাদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর ফলে মামলাটি ঘিরে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়।

বর্ণনাটিতে আরও দাবি করা হয়েছে, তদন্ত কর্মকর্তাকে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে কিংবা এজাহারভুক্ত আসামিদের বিরুদ্ধে চাহিদামতো অভিযোগপত্র দিতে চাপ দেয়া হয়েছিল। এমনকি তাকে সেনানিবাসে নিয়ে ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগও রয়েছে।

সংস্কারপন্থিদের অবস্থান ও নতুন সংকট

ওয়ান-ইলেভেনের সময় বিএনপির একটি অংশের নেতারা দলীয় নেতৃত্বে পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নেন। তাদের এ অবস্থানকে কেন্দ্র করে বিএনপির অভ্যন্তরে বিভক্তি তৈরি হয়। খালেদা জিয়া ও তার পরিবারের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে গ্যাটকো মামলায় সংস্কারপন্থি নেতাদের নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বিষয়টি বিশেষ তাৎপর্য পায়।

১/১১-তে সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির সংস্কারপন্থিদের একাংশ। ছবি: সংগৃহীত

প্রদত্ত বর্ণনা অনুসারে, ২০০৮ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত মামলাটি নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা ও দর-কষাকষি চলে। সংস্কারপন্থি নেতাদের কেউ কেউ মামলার তালিকা থেকে নিজেদের নাম বাদ দেয়ার বিষয়ে আগ্রহী ছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে মামলাটি শুধু দুর্নীতির অভিযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বিএনপির নেতৃত্ব, দলীয় আনুগত্য এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন সামনে আসে।

দেশত্যাগের প্রস্তাব ও খালেদা জিয়ার সিদ্ধান্ত

২০০৮ সালের এপ্রিল মাসে খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য সৌদি আরবে পাঠানোর একটি পরিকল্পনার কথা প্রদত্ত বিবরণে উঠে এসেছে। এ সময় তার আইনজীবী ব্যারিস্টার নাসিরউদ্দিন অসীমের মাধ্যমে তদন্ত কর্মকর্তা ড. জহিরুল হুদার সঙ্গে যোগাযোগের কথাও বলা হয়েছে।

বর্ণনা অনুযায়ী, খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়েছিল, বিদেশে চলে যাওয়া তার রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য কতটা যুক্তিযুক্ত হবে। জহিরুল হুদা মত দেন যে, তিনি দেশত্যাগ করলে জিয়া পরিবারের রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হতে পারে। বিএনপির নেতৃত্বে বিকল্প বলয় গড়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। এ বক্তব্য খালেদা জিয়ার কাছে পৌঁছানোর পর তিনি বিদেশে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন বলে বর্ণনাটিতে উল্লেখ রয়েছে। তার এ অবস্থানকে বিএনপির নেতৃত্ব ধরে রাখা এবং দলীয় বিভাজন মোকাবিলার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

মাইনাস ফর্মুলার অপ্রকাশিত অধ্যায়ের তাৎপর্য

ওয়ান-ইলেভেনের সময়কার ঘটনাপ্রবাহে খালেদা জিয়ার দেশত্যাগে অসম্মতি, গ্যাটকো মামলার তদন্ত এবং বিএনপির সংস্কারপন্থিদের ভূমিকা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত একটি রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করেছে। এ বয়ান অনুসারে, সংকটের সময়ে কয়েকজন সাবেক ছাত্রদল, যুবদল ও বিএনপি নেতাসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরামর্শ দলীয় নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে প্রভাব ফেলেছিল। আলোচনায় ছিলেন খন্দকার দেলোয়ার হোসেন, আ স ম হান্নান শাহ, নজরুল ইসলাম খান, খন্দকার বাবুল চৌধুরী, সুলতান সালাহ উদ্দিন টুকু, শহীদুল ইসলাম বাবুল, মোহাম্মদ শাহজাহান, শিমুল, অধ্যক্ষ সোহরাব প্রমুখ। আর নয়াপল্টনে পার্টি অফিস দখলসহ দলের পাল্টা কমিটি গঠন করেছিলেন- সাইফুর রহমান, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন, সাদেক হোসেন খোকা ও আব্দুস সালাম প্রমুখ। এ তালিকায় সংখ্যা ছিল ১৭৪। যাদের মধ্যে অনেকেই এখন সরকারের শীর্ষ পদে েবসানো হয়েছে।

তবে মাইনাস ফর্মুলার পেছনে দেশি-বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার পরিকল্পনা, নির্দিষ্ট অর্থায়ন কিংবা সমন্বিত ষড়যন্ত্রের দাবিগুলোর প্রামাণ্য দলিল নেই তবে সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য।

সব মিলিয়ে, ওয়ান-ইলেভেনের এ অধ্যায় বাংলাদেশের রাজনীতিতে নেতৃত্বের সংকট, দলীয় ঐক্য এবং ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের জটিল সম্পর্ক তুলে ধরে। খালেদা জিয়ার অনড় অবস্থানকে তার সমর্থকেরা রাজনৈতিক নেতৃত্ব ধরে রাখার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখেন। আর গ্যাটকো মামলা ও সংস্কারপন্থিদের তৎপরতাকে ঘিরে উত্থাপিত প্রশ্নগুলো আজও ওই সময়ের রাজনৈতিক ইতিহাসের অমীমাংসিত আলোচনার অংশ হয়ে রয়েছে।

আপন দেশ/এবি

মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়