Apan Desh | আপন দেশ

ক্ষমতার ছায়ায় শূন্য জাপা

বিশেষ প্রতিবেদক, আপন দেশ

প্রকাশিত: ২১:৩৬, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

আপডেট: ২১:৫২, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

ক্ষমতার ছায়ায় শূন্য জাপা

ছবি : এআই

চার দশকের পুরোনো রাজনৈতিক দল জাতীয় পার্টি যেন এক মুহূর্তের মধ্যে রাজনৈতিক ইতিহাসের ব্যঙ্গচিত্রে পরিণত হয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৯৬টি আসনে লাঙ্গল প্রতীকে প্রার্থী দেয়া সত্ত্বেও একটিও আসন জিততে পারেনি দলটি। দীর্ঘ সময় ক্ষমতার আশেপাশে ঘুরে সুবিধা ভোগ করা, সংসদের প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসা- সব মিলিয়ে এ নির্বাচনে দলটি ভোটারদের কাছে ‘শূন্য’ প্রমাণিত হলো।

দীর্ঘদিনের সুবিধাবাদী রাজনীতি, দ্বৈত চরিত্র এবং আদর্শহীন নেতৃত্ব ভোটারদের আস্থা ক্ষয় করেছে। একসময়ের শক্তিশালী রাজনৈতিক ঘাঁটি এখন নিঃসঙ্গ; তৃণমূল নেতাকর্মীদের গণপ্রস্থান এবং ভোটারদের অনীহা দলকে কার্যত নির্বাচনী মাঠে অদৃশ্য করে দিয়েছে। এ দলটির রাজনৈতিক ‘অস্তিত্ব’ ভোটারদের কাছে আজ শূন্য।

আরও পড়ুন<<>> ন্যাশনাল লাইফের তদন্তে দুদক: ২১শ’ অ্যাকাউন্টে সন্দেহজনক লেনদেন, ৭১৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ-পাচার

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ফলাফল আকস্মিক নয়। বরং দীর্ঘদিনের আদর্শহীনতা, সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং কৌশলগত ভুলের ফল। গত এক-দেড় দশকে জাতীয় পার্টি নিজেদের রাজনীতির তুলনায় ক্ষমতাসীন এবং বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের লেজুরবৃত্তি করেছে। ভোটারদের চোখে তারা ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’, যা কেবল সুবিধা নেয়ার জন্য ক্ষমতার আশেপাশে ঘোরে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী ডেইলি আপন দেশ ডটকমকে বলেন, “জাতীয় পার্টির অতীতই তাদের ভরাডুবির মূল কারণ। শেখ হাসিনার সময় তারা সরকারের ‘সেবাদাস’ ছিল, প্রকৃত বিরোধী নয়। জনগণ কখনোই তা গ্রহণ করেনি।”

দ্বৈত চরিত্রের রাজনৈতিক ব্যঙ্গ

জাতীয় পার্টি দীর্ঘকাল সরকার ও বিরোধী দলে একসাথে থাকার কৌশল অবলম্বন করেছে। একদিকে মন্ত্রিত্ব ভোগ, অন্যদিকে সংসদে বিরোধী ভূমিকা- দ্বৈত চরিত্র ভোটারদের চোখে ‘নিয়ন্ত্রিত বিরোধিতা’ হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে।

গত দেড় বছর ধরে দলটি রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ হওয়ার হুমকির মুখে পড়ে। জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে প্রতিকূল পরিবেশে কার্যকর রাজনীতি করতে পারেনি। নেতা-নেত্রীরা অভিযোগ করেছেন, নির্বাচনের সময় প্রশাসনিক সহায়তা পুরোপুরি অনুপস্থিত ছিল। এ দ্বৈত চরিত্র এবং সুবিধাবাদী অবস্থান ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও রোষ তৈরি করেছে। একসময়ের শক্তিশালী জাপা আজ ভোটারদের কাছে ‘শূন্য লাঙ্গল’।

উত্তরাঞ্চলের দুর্গে লাঙ্গলের পতন

দলের ঐতিহ্যবাহী দুর্গ রংপুর, যেখানে প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জন্মস্থান, এবার ভরাডুবির সাক্ষী। রংপুর-৩ আসনে দলীয় চেয়ারম্যান জি এম কাদের তৃতীয় স্থান অধিকার করেছেন। গাইবান্ধা-১ আসনে মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারীও তৃতীয় হয়েছেন।

ভোটারদের চোখে একসময়ের শক্ত ঘাঁটি আজ নিঃসঙ্গ এবং ঝাপসা। প্রার্থীরা কার্যকর প্রচারণা চালাতে ব্যর্থ হয়েছেন, কারণ শত শত তৃণমূল নেতাকর্মী দলত্যাগ করেছেন। একসময়ের রাজনৈতিক দুর্গ আজ জনমত হারানো নিঃসঙ্গ দুর্গে পরিণত হয়েছে।

নেতৃত্ব বিভাজন ও ভবিষ্যৎ সংকট

জাতীয় পার্টির ইতিহাসে বিভাজন নতুন নয়। ১৯৯১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে অন্তত আটবার দলটি ভেঙেছে। এরশাদের মৃত্যুর পর রওশন এরশাদ ও জি এম কাদের-এর ক্ষমতার দ্বন্দ্ব দলকে আরও দুর্বল করেছে।

গত বছরের আগস্টে সিনিয়র কো-চেয়ারম্যানরা পৃথকভাবে রাজনীতি শুরু করলে দলের কাঠামো নড়বড়ে হয়ে যায়। নির্বাচনী প্রচারণা বিপর্যস্ত, ভোটারদের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ স্থাপন সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন কেন্দ্রে পোলিং এজেন্টদের প্রবেশ বাধা, হামলা-ভাঙচুর ও মামলা- সব মিলিয়ে ভোটের মাঠে উপস্থিতি প্রায় শূন্য।

আরও পড়ুন<<>> বিশ্ব রাজনীতির নতুন উদাহরণ তারেক রহমান

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রধান সমস্যা প্রশাসনিক নয়; ভোটারদের চোখে দলটির গ্রহণযোগ্যতা ইতোমধ্যেই ক্ষয় হয়েছে। দলটি পুনর্গঠন, আদর্শ স্পষ্টতা এবং তৃণমূল শক্তিশালী না করলে নির্বাচনী মানচিত্রে আরও অদৃশ্য হয়ে যাবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক নুরুল আমিন বেপারীর মতে, ‘জনগণের চোখে জাতীয় পার্টি সেবাদাস, সুবিধাভোগী দল। শামীম পাটোয়ারীর মতো নেতা যদি দলকে স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় দিতে পারেন, তবেই ভবিষ্যৎ সম্ভব।’

ত্রয়োদশ নির্বাচনের ফল ভোটারদের কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়: ক্ষমতার আশেপাশে দোলা দেয়া দল, জনগণের সামনে শূন্য। এটি শুধু নির্বাচনি পরাজয় নয়; বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দীর্ঘদিনের সুবিধাবাদী রাজনীতির প্রতিফলন।

আপন দেশ/এবি

মন্তব্য করুন ।। খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত,আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়