Apan Desh | আপন দেশ

কবি জীবনানন্দ দাশের ১২৭তম জন্মবার্ষিকী আজ

আপন দেশ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৫:১৩, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

কবি জীবনানন্দ দাশের ১২৭তম জন্মবার্ষিকী আজ

ছবি: আপন দেশ গ্রাফিক্স

ফাল্গুন মানেই নতুন পাতার শব্দ, কীর্তনখোলার হাওয়ায় নরম আলো, আর স্মৃতির ভেতর ভেসে ওঠা কিছু চিরচেনা পঙ্‌ক্তি। বরিশালের এমন এক দিনেই ১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি জন্ম নিয়েছিলেন আধুনিক বাংলা কবিতার নিভৃততম অথচ দীপ্ত কণ্ঠস্বর জীবনানন্দ দাশ। আজ তার ১২৭তম জন্মবার্ষিকী।

জন্মসন নিয়ে একসময় বিতর্ক থাকলেও গবেষকদের বড় অংশ এখন একমত—১৮৯৯ সালের এ দিনেই তার জন্ম। কবি নিজেই লিখেছিলেন, ‘আমার জন্ম হয়েছিল বরিশালে ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ফাল্গুন মাসে।’ তার ছোট ভাই আশোকানন্দ দাশও পরে একই তথ্য নিশ্চিত করেন। এ জন্ম শুধু একটি তারিখ নয়; এটি বরিশাল শহরের সাংস্কৃতিক ইতিহাসেরও এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।

জীবনানন্দের পূর্বপুরুষেরা ছিলেন মুন্সীগঞ্জ জেলার বিক্রমপুর পরগনার বাসিন্দা। পদ্মার ভাঙনে সে গ্রাম হারিয়ে গেলে তার পিতামহ সর্বানন্দ দাশগুপ্ত পরিবারসহ বরিশালে এসে বসতি স্থাপন করেন। জন্মসূত্রে হিন্দু হলেও তিনি পরে ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষা নেন এবং বরিশালে ব্রাহ্ম সমাজ আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়ে যুক্ত হন। মানবহিতৈষী কাজের জন্য তিনি সমাদৃত ছিলেন। কবির পিতা সত্যানন্দ দাশ ছিলেন শিক্ষাবিদ ও প্রাবন্ধিক; ব্রজমোহন (বিএম) স্কুলে শিক্ষকতা এবং ‘ব্রাহ্মবাদী’ পত্রিকা সম্পাদনার মাধ্যমে পরিবারে গড়ে উঠেছিল চিন্তা ও মননের এক গভীর পরিবেশ। মা কুসুম কুমারী দাশও ছিলেন কবি। ফলে বই, আলোচনা আর সংস্কৃতিমনস্ক আবহেই বেড়ে ওঠেন জীবনানন্দ।

বরিশাল শহরের যে ভাড়া বাড়ির প্রশস্ত আটচালা ঘরে তার জন্ম, সেটি ছিল শান্ত ও নির্জন। শৈশবের কয়েক বছর পর পরিবার বগুড়া রোডে ‘সর্বানন্দভবন’ নামে একটি বাড়িতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। আট বছর বয়স থেকে সেখানেই তার বেড়ে ওঠা। বাইরে থেকে সাধারণ মনে হলেও ঘরের ভেতর ছিল বইয়ের অরণ্য। এ পরিবেশই তার কল্পনা ও মননকে গভীর ভিত্তি দেয়।

বাংলা কাব্যে আধুনিকতার পথিকৃৎদের মধ্যে জীবনানন্দ অগ্রগণ্য। রবীন্দ্র-পরবর্তীকালে বাংলা ভাষার প্রধান কবি হিসেবে তিনি স্বীকৃত এবং তাকে ‘বাংলা ভাষার শুদ্ধতম কবি’ অভিধায় আখ্যায়িত করা হয়েছে। তার কবিতায় প্রকৃতির রূপ, বাংলার মনন, ইতিহাসচেতনা ও মানুষের নিঃসঙ্গ জীবন এক অনন্য ভাষায় প্রকাশ পেয়েছে। ‘আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে—এই বাংলায়/হয়তো মানুষ নয়—হয়তো বা শঙ্খচিল শালিকের বেশে’—এ পঙ্‌ক্তি তারই, যা আজও বাঙালির হৃদয়ে অনুরণিত।

আরও পড়ুন<<>>বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী কবিতা ‘কাজলা দিদি’

তিনি প্রায় ৮০০ কবিতা রচনা করেন, যার মধ্যে জীবদ্দশায় প্রকাশিত হয়েছিল ২৬২টি। উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ঝরা পালক (১৯২৭), ধূসর পাণ্ডুলিপি (১৯৩৬), বনলতা সেন (১৯৪২), মহাপৃথিবী (১৯৪৪), সাতটি তারার তিমির (১৯৪৮)। মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয় বহুল আলোচিত রূপসী বাংলা (১৯৫৭) এবং বেলা অবেলা কালবেলা (১৯৬১)। এছাড়া ‘সুদর্শনা’, ‘আলো পৃথিবী’, ‘মনোবিহঙ্গম’, ‘হে প্রেম তোমার কথা ভেবে’, ‘অপ্রকাশিত একান্ন’ ও ‘আবছায়া’সহ অগ্রন্থিত কবিতার সংকলন প্রকাশিত হয়েছে পরবর্তী সময়ে।

কবি প্রধানত কবি হলেও তিনি ২১টি উপন্যাস ও ১০৮টি ছোটগল্প রচনা করেছিলেন। যার একটিও তার জীবদ্দশায় প্রকাশিত হয়নি। মৃত্যুর পর তার গল্প, উপন্যাস ও পত্রাবলি প্রকাশিত হলে পাঠকমহলে নতুনভাবে মূল্যায়িত হন তিনি। ‘শ্রী কাল পুরুষ’ ছিল তার একটি ছদ্মনাম। ইংরেজি ও ফরাসিসহ কয়েকটি ইউরোপীয় ভাষায় তার কবিতা অনূদিত হয়েছে।

১৯৫৪ সালের ১৪ অক্টোবর কলকাতার বালিগঞ্জ এলাকায় ট্রাম দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন তিনি। চিকিৎসাধীন অবস্থায় একই বছরের ২২ অক্টোবর রাত ১১টা ৩৫ মিনিটে তার মৃত্যু হয়। তবে মৃত্যুর পরই তার সাহিত্যকীর্তি ব্যাপক স্বীকৃতি পেতে শুরু করে। তিনি ১৯৫৫ সালে ভারতের সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন; এর আগে ১৯৫২ সালে ‘বনলতা সেন’ কাব্যগ্রন্থ পুরস্কৃত হয়।

জীবনানন্দের কবিতায় বারবার ফিরে আসে নদীর ধারে দাঁড়িয়ে থাকা একাকী মানুষ, বিকেলের ক্লান্ত আকাশ, ধানসিঁড়ির জল, পাখির ডানার শব্দে ভেসে থাকা বিষণ্নতা। বরিশালের প্রকৃতি তার কবিতায় রূপান্তরিত হয়েছে এক গভীর নৈঃশব্দ্যে। তাই বলা হয়—বরিশালের জীবনানন্দ দাশ, কিংবা জীবনানন্দের বরিশাল।

জন্মদিন উপলক্ষে বরিশালে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সাহিত্য সংগঠন আলোচনা সভা, আবৃত্তি, চিত্র প্রদর্শনীসহ নানা কর্মসূচির আয়োজন করেছে। বরিশাল বজ্রমোহন কলেজের জীবনানন্দ চত্বরে ‘স্মরণে জীবনানন্দ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানেরও প্রস্তুতি নেয়া হয়। শহরের বিভিন্ন স্থানে কবির স্মৃতি রক্ষায় উদ্যোগ থাকলেও বাস্তবতার সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। তবু কবি হারিয়ে যাননি—তিনি আছেন কীর্তনখোলার হাওয়ায়, বিকেলের রোদে, মানুষের মুখে মুখে ফেরত আসা তার পঙ্‌ক্তিতে।

রূপসী বাংলার কবি এখানে জন্মেছিলেন বলেই, আজও বরিশালের আকাশ যেন একটু বেশি নীল, একটু বেশি বিষণ্ন। জীবনানন্দ দাশ তাই শুধু একজন কবি নন—তিনি বাংলার নিঃসঙ্গ সৌন্দর্যের এক চিরজাগরূক প্রতীক।

আপন দেশ/এসএস

মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement