ছবি: সংগৃহীত
টুথপেস্ট এবং টুথব্রাশ। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই যা অতি প্রয়োজন। কিন্তু কখনো কি খেয়াল করেছেন, টুথপেস্টের টিউবের একেবারে নিচে ছোট একটি রঙিন দাগ থাকে? সেটি লাল, নীল, সবুজ বা কালো রঙের হতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দীর্ঘদিনের দাবি, টুথপেস্টের টিউবের এ রঙিন দাগ থেকেই নাকি বোঝা যায়, পেস্টে কী ধরনের উপাদান আছে।
প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, সবুজ দাগ মানে প্রাকৃতিক উপাদান, নীল দাগ মানে প্রাকৃতিক উপাদানের সঙ্গে ওষুধ, লাল দাগ মানে প্রাকৃতিক ও রাসায়নিক উপাদানের মিশ্রণ এবং কালো দাগ মানে শুধুই রাসায়নিক উপাদান।
তবে এ দাবির কোনো বৈজ্ঞানিক বা শিল্পভিত্তিক বাস্তবতা নেই। টুথপেস্টের টিউবের নিচে থাকা রঙিন দাগের সঙ্গে পেস্টের ভেতরের উপাদানের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। তাহলে এ দাগ কেন থাকে? চলুন, জেনে নিই আসল কারণ।
টুথপেস্টের টিউবের নিচের দিকে থাকা ছোট রঙিন চিহ্নকে সাধারণত আই মার্ক বা কালার মার্ক বলে। এটি মূলত টিউব তৈরির ও প্যাকেজিংয়ের কাজে ব্যবহৃত একটি নির্দেশক চিহ্ন।
কারখানায় টুথপেস্টের টিউব তৈরি করা, ভরা এবং সিল করার সময় স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র ব্যবহার করা হয়ে থাকে। যন্ত্রের অপটিক্যাল সেন্সর এ চিহ্ন শনাক্ত করে টিউবের অবস্থান বুঝতে পারে। আর এর সাহায্যে নির্দিষ্ট জায়গায় টিউব কাটা, ভাঁজ করা বা সিল করার কাজ সম্পন্ন করা যায়।
সহজভাবে বললে, এ রঙিন দাগটি মূলত কারখানার যন্ত্রের কাজ সহজ করার জন্য ব্যবহার করা হয়। ক্রেতাদের টুথপেস্টের উপাদান সম্পর্কে তথ্য দেয়ার জন্য মোটেই এটি তৈরি করা হয়নি।
আরও পড়ুন <<>> চিঠির যুগ পেরিয়ে ডাকসেবায় নতুন সম্ভাবনা
টুথপেস্টের টিউবের রঙিন দাগের জন্য এমন কোনো সর্বজনীন নিয়ম নেই, যেখানে প্রতিটি রঙের নির্দিষ্ট উপাদানগত অর্থ রয়েছে। তবে, অনলাইনে প্রচলিত দাবিগুলো হলো-
সবুজ দাগ: টুথপেস্টে শুধু প্রাকৃতিক উপাদান রয়েছে।
নীল দাগ: প্রাকৃতিক উপাদানের সঙ্গে ওষুধ মেশানো হয়েছে।
লাল দাগ: প্রাকৃতিক ও রাসায়নিক উপাদান রয়েছে।
কালো দাগ: টুথপেস্টে শুধু রাসায়নিক উপাদান রয়েছে।
এ ব্যাখ্যাগুলো পুরোপুরি ভুল। দাগের রং দেখে টুথপেস্টে কতটা প্রাকৃতিক উপাদান আছে, কোনো ওষুধ মেশানো হয়েছে কি না বা পণ্যটি নিরাপদ কি না, তা নির্ধারণ করা যায় না।
প্যাকেজিংয়ের রং ও নকশার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এবং কারখানার যন্ত্রের সেন্সর যাতে চিহ্নটি সহজে শনাক্ত করতে পারে, সে অনুযায়ী এ রং নির্বাচন করা হয়। তাই একটি টিউবে কালো দাগ থাকলেও সেটিকে শুধু এ কারণে ক্ষতিকর বলা যাবে না।
টুথপেস্টে কী রয়েছে তা জানার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায় হলো প্যাকেট বা টিউবের গায়ে থাকা উপাদানের তালিকা দেখা। সেখানে সাধারণত পণ্য তৈরিতে ব্যবহৃত উপাদানগুলোর নাম উল্লেখ করা থাকে।
টুথপেস্টে নানান ধরনের উপাদান থাকতে পারে। যেমন-
ফ্লোরাইড: দাঁতের এনামেলকে শক্তিশালী করতে এবং দাঁতে ক্ষয় বা ক্যাভিটি হওয়ার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। তবে পণ্যের ধরন ও ব্যবহারবিধি অনুযায়ী সঠিক টুথপেস্ট বেছে নেয়া জরুরি।
পরিষ্কারক ও ঘর্ষণকারী উপাদান: দাঁতের উপরিভাগ থেকে খাবারের অবশিষ্টাংশ ও জমে থাকা দাগ পরিষ্কার করতে সাহায্য করে।
আর্দ্রতা ধরে রাখার উপাদান: টুথপেস্টকে শুকিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে।
স্বাদ ও ফেনা তৈরির উপাদান: টুথপেস্টের স্বাদ, ব্যবহারযোগ্যতা ও পরিষ্কারের অভিজ্ঞতা উন্নত করতে ব্যবহৃত হয়।
সব টুথপেস্টের উপাদান এক নয়। তাই নির্দিষ্ট কোনো উপাদান সম্পর্কে জানতে হলে পণ্যের গায়ে লেখা তালিকা ও প্রস্তুতকারকের তথ্য দেখুন। দাঁতের বিশেষ সমস্যা থাকলে দন্তচিকিৎসকের পরামর্শে টুথপেস্ট নির্বাচন করুন।
প্রাকৃতিক শব্দটি শুনে কোনো পণ্যকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেশি নিরাপদ বা ভালো মনে করা ঠিক নয়। প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম, দুই ধরনের উপাদানেরই নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কোনো উপাদান নিরাপদ কি না, তা নির্ভর করে সেটির প্রকৃতি, পরিমাণ, ব্যবহার ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ওপর।
একইভাবে, টুথপেস্টে রাসায়নিক উপাদান রয়েছে মানেই সেটি ক্ষতিকর, এমন ধারণাও ভুল। পানি থেকে শুরু করে শরীরের অনেক প্রয়োজনীয় উপাদানই রাসায়নিক পদার্থ। তাই শুধু প্রাকৃতিক বা রাসায়নিক শব্দের ভিত্তিতে পণ্যের গুণমান বিচার করা যায় না।
টুথপেস্ট বেছে নেয়ার সময় দাঁতের প্রয়োজন, ফ্লোরাইডের উপস্থিতি, পণ্যের ব্যবহারবিধি, মেয়াদ এবং প্রস্তুতকারকের নির্ভরযোগ্যতার দিকে নজর দিন।
টুথপেস্টের নিচের রঙিন দাগের পরিবর্তে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যাচাই করতে পারেন।
উপাদানের তালিকা পড়ুন: পণ্যটিতে কী কী উপাদান রয়েছে, তা জানুন।
ফ্লোরাইড আছে কি না দেখুন: দাঁতে ক্ষয় প্রতিরোধে ফ্লোরাইডযুক্ত টুথপেস্ট সাধারণত উপকারী। শিশুদের ক্ষেত্রে বয়স অনুযায়ী উপযুক্ত পণ্য ও সঠিক পরিমাণ ব্যবহারের বিষয়ে দন্তচিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
মেয়াদ পরীক্ষা করুন: মেয়াদোত্তীর্ণ টুথপেস্ট ব্যবহার না করাই ভালো।
প্যাকেটের অবস্থা দেখুন: টিউব ফুটো, ক্ষতিগ্রস্ত বা সিল খোলা থাকলে সেটি কেনা এড়িয়ে চলুন।
দাঁতের সমস্যার জন্য উপযুক্ত পণ্য বেছে নিন: দাঁতে শিরশির করা, মাড়ি থেকে রক্ত পড়া বা অন্য কোনো সমস্যা থাকলে শুধু বিজ্ঞাপন দেখে টুথপেস্ট না কিনে দন্তচিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
টুথপেস্টের টিউবের নিচে থাকা লাল, নীল, সবুজ বা কালো দাগ কোনো গোপন উপাদান সংকেত নয়। এটি মূলত টিউব তৈরি ও প্যাকেজিংয়ের সময় স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রকে সঠিকভাবে কাটতে ও সিল করতে সাহায্য করে।
তাই কালো দাগ দেখেই টুথপেস্টকে ক্ষতিকর বা সবুজ দাগ দেখেই সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ভাবার কারণ নেই। টুথপেস্টের গুণমান ও উপাদান জানতে প্যাকেটের তথ্য পড়ুন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দন্তচিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া স্বাস্থ্যসংক্রান্ত দাবি যাচাই না করে বিশ্বাস করবেন না।
আপন দেশ/এসএস





































