ফাইল ছবি
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালিতে তেল সরবরাহে বিঘ্নের কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। বুধবার (০১ এপ্রিল) প্রভাবশালী ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট এ শঙ্কা প্রকাশ করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিদিন কাজের জন্য ২২ কিলোমিটার যাতায়াত করেন ৩৩ বছর বয়সী বেসরকারি চাকরিজীবী মাজিদ আলী। তার মতো লাখো মানুষ ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ফিলিং স্টেশনের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, কখনও কখনও রাত জাগার পরেও জ্বালানি সংগ্রহের জন্য অপেক্ষা করছেন। তিনি জানান, মোটরসাইকেলের জন্য প্রয়োজনীয় অকটেন না পেলে যাতায়াত বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। মজুত সীমিত হওয়ায় অনেক পাম্পে বাঁশের ব্যারিকেড দিয়ে গেট বন্ধ করা হয়েছে, আবার কোথাও জ্বালানি সরবরাহ যন্ত্র নীল প্লাস্টিক দিয়ে মুড়িয়ে রাখা হয়েছে।
মাজিদ আলী বলেন, আমি ভাগ্যবান যে তেল পেয়েছি, কিন্তু আমার পিছনে থাকা ডজনখানেক চালক খালি হাতে ফিরে গেছে। রাজধানীর সড়কগুলোতে আগের তুলনায় যানবাহন কম দেখা যাচ্ছে, তবে রাজধানীর বাইরে পরিস্থিতি আরও গুরুতর। সেখানে এক থেকে দুই লিটার করে ছোট বোতলে জ্বালানি অনানুষ্ঠানিকভাবে বিক্রি হচ্ছে।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি অধিকাংশ জাহাজের জন্য বন্ধ থাকায় জ্বালানির দাম বেড়ে গেছে। এশিয়ার প্রায় ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এ প্রণালির মাধ্যমে পরিবাহিত হয়।
বাংলাদেশ তার মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশ আমদানি নির্ভর। ৪ মার্চের তথ্য অনুযায়ী, ডিজেলের মজুত দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৫ হাজার ৪৭৩ টন, যা মাত্র নয় দিনের চাহিদা মেটাতে সক্ষম। অকটেনের মজুত দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ১৫২ টন, যা দুই সপ্তাহের চাহিদা পূরণ করতে পারবে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন এপ্রিল মাসে ভারতের নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে ৪০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল আমদানি করতে যাচ্ছে, যা মার্চের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। এছাড়া দেশটি সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া, আজারবাইজান, কাজাখস্তান, অ্যাঙ্গোলা ও অস্ট্রেলিয়া থেকে জ্বালানি আমদানির চেষ্টা করছে।
নবনির্বাচিত তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার চেষ্টা করছে। সরকারের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশের স্পট বাজার থেকে কেনা জ্বালানি রিজার্ভে চাপ তৈরি করছে এবং মাত্র ১০ দিনের জ্বালানি মজুত রয়েছে।
আরও পড়ুন <<>> মধ্যপ্রাচ্যে উত্তাপ: ইরান যুদ্ধে যোগ দিচ্ছে আরব আমিরাত
বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির যুগ্ম আহবায়ক মিজনুর রহমান রতন জানিয়েছেন, ফিলিং স্টেশনগুলোতে অল্প সরবরাহের কারণে কর্মীরা ক্ষুব্ধ গ্রাহকের হামলার শিকার হচ্ছেন। তিনি বলেন, প্রতিটি চালককে সীমিত পরিমাণ জ্বালানি দেয়া হচ্ছে। তারা আবার লাইনে দাঁড়াচ্ছে। আমাদের পাম্প ও কর্মীদের সুরক্ষায় ব্যবস্থা নিতে সরকারের প্রতি আহবান জানাচ্ছি।
জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, বর্তমানে কোনো জ্বালানি সংকট নেই, বরং সরবরাহ বেড়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা অনানুষ্ঠানিক সিন্ডিকেট ও জনগণের আতঙ্কমূলক মজুতজারণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।
সরকার তিন মাসের স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা এবং মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণের চেষ্টা করছে। এছাড়া জ্বালানি সাশ্রয় করতে বাসা থেকে কাজ চালু, কর্মদিবস কমানো এবং নাগরিকদের সচেতন করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জ্বালানি খাতকে দীর্ঘমেয়াদে পুনর্গঠন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে দ্রুত অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন।
মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেলের সরবরাহে স্থায়ী বিঘ্ন থাকলে বাংলাদেশে শিল্প, বিদ্যুৎ, পরিবহন এবং দৈনন্দিন জীবন তীব্র প্রভাবিত হবে। এ পরিস্থিতিতে সরকারের কার্যকর প্রস্তুতি এবং বৈদেশিক আমদানি বৈচিত্র্যই দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার মূল চাবিকাঠি।
আপন দেশ/এসএস
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।




































