প্রতীকী ছবি
মানুষের শরীরকে যদি একটি বিশাল কর্মযন্ত্র হিসেবে কল্পনা করা হয়, তাহলে ভিটামিন ও মিনারেলস হলো সে যন্ত্রের অদৃশ্য, কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। আমরা প্রতিদিন খাবার খাই মূলত শক্তি পাওয়ার জন্য, কিন্তু শুধু ভাত, রুটি বা প্রোটিন খেলেই শরীর সুস্থ থাকে না।
শরীরের প্রতিটি কোষ, প্রতিটি অঙ্গ, প্রতিটি রাসায়নিক বিক্রিয়া সঠিকভাবে পরিচালিত হওয়ার জন্য প্রয়োজন নানা ধরনের ভিটামিন ও খনিজ উপাদান। এদের ঘাটতি হলে শরীর ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, শিশুদের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, এমনকি মস্তিষ্ক ও হৃদযন্ত্রের কাজও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই ভিটামিন ও মিনারেলসকে ‘মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট’ বলা হলেও এদের গুরুত্ব মোটেও ছোট নয়।
ভিটামিন মূলত দুই ধরনের, যথা: ফ্যাট সলিউবল ও ওয়াটার সলিউবল। ফ্যাট সলিউবল ভিটামিন শরীরে কিছুটা জমা থাকে, আর ওয়াটার সলিউবল ভিটামিন প্রতিদিন খাবারের মাধ্যমে গ্রহণ করতে হয়। অন্যদিকে মিনারেলস শরীরের গঠন, স্নায়ু, হরমোন, রক্ত ও কোষীয় কার্যক্রমের জন্য অপরিহার্য।
ভিটামিন এ মানুষের শরীরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি হলো চোখ ও এপিথেলিয়াল টিস্যুর সুরক্ষা। এটি চোখের রেটিনায় আলো অনুভবের জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক তৈরিতে সাহায্য করে। তাই ভিটামিন-এ’র অভাবে রাতকানা রোগ হতে পারে। এ ছাড়া এটি শ্বাসনালী, অন্ত্র ও ত্বকের আবরণীকে সুস্থ রাখে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। হাম রোগে ভিটামিন এ দেওয়া হয় মূলত এ কারণেই। এটি এপিথেলিয়াল ইন্টিগ্রেটি বজায় রাখে এবং জটিলতা ও মৃত্যুর ঝুঁকি কমায়। গাজর, কুমড়া, মিষ্টি আলু, কলিজা, ডিমের কুসুম ও সবুজ শাকসবজি ভিটামিন এ-এর ভালো উৎস।
ভিটামিন-ডি শরীরের ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে হাড় ও দাঁত শক্ত রাখতে সাহায্য করে। সূর্যের আলো থেকে শরীরে ভিটামিন ডি তৈরি হয়। এর অভাবে শিশুদের রিকেটস এবং বড়দের অস্টিওম্যালেসিয়া হতে পারে। বর্তমানে ঘরের ভেতরে বেশি থাকা, মোবাইল ও স্ক্রিন নির্ভর জীবনযাপন এবং পর্যাপ্ত রোদে না যাওয়ার কারণে ভিটামিন ডি ঘাটতি বাড়ছে। মাছ, ডিম, দুধ ও রোদ এটির প্রধান উৎস।
ভিটামিন-ই একটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এটি কোষকে ক্ষতিকর ফ্রি র্যাডিক্যালের আক্রমণ থেকে রক্ষা করে। কোষের ঝিল্লি সুরক্ষা, স্নায়ুর কার্যক্রম ও রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ। বাদাম, বীজ, উদ্ভিজ্জ তেল ও শাকসবজিতে ভিটামিন ই পাওয়া যায়।
ভিটামিন কে রক্ত জমাট বাঁধার জন্য অপরিহার্য। এটি ছাড়া শরীর স্বাভাবিকভাবে রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে পারে না। নবজাতকদের জন্মের পর ভিটামিন-কে ইনজেকশন দেয়া হয় যাতে তারা বিপজ্জনক রক্তক্ষরণ থেকে সুরক্ষিত থাকে। সবুজ শাকসবজি ও অন্ত্রের কিছু ব্যাকটেরিয়া ভিটামিন কে-এর উৎস।
ভিটামিন-বি কমপ্লেক্স আসলে একাধিক ভিটামিনের সমষ্টি। এরা শরীরে শক্তি উৎপাদন, স্নায়ুর কার্যক্রম, রক্ত তৈরির প্রক্রিয়া এবং মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কাজের জন্য প্রয়োজনীয়। ভিটামিন বি১ বা থায়ামিনের অভাবে বেরিবেরি হতে পারে, যা হৃদযন্ত্র ও স্নায়ুকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ভিটামিন বি১২ ও ফলিক এসিড রক্ত তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ; এদের ঘাটতিতে মেগালোব্লাস্টিক অ্যানিমিয়া হয়। গর্ভাবস্থায় ফলিক এসিডের ঘাটতি শিশুর নিউরাল টিউব ডিফেক্টের ঝুঁকি বাড়ায়। মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, ডাল ও শাকসবজি-বি ভিটামিনের প্রধান উৎস।
আরও পড়ুন<<>>হাম উপসর্গ নিয়ে আরও ১৬ শিশুর মৃত্যু
ভিটামিন-সি শরীরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এটি কোলাজেন তৈরিতে সাহায্য করে, ক্ষত দ্রুত শুকাতে সহায়তা করে এবং আয়রন শোষণ বাড়ায়। এর অভাবে স্কার্ভি নামের রোগ হতে পারে, যেখানে মাড়ি থেকে রক্ত পড়ে, শরীর দুর্বল হয়ে যায় এবং ক্ষত শুকাতে দেরি হয়। আমলকি, কমলা, পেয়ারা, লেবু ও টমেটো ভিটামিন সি-এর সমৃদ্ধ উৎস।
মিনারেলসের মধ্যে আয়রন সবচেয়ে পরিচিত। এটি হিমোগ্লোবিন তৈরির জন্য অপরিহার্য। আয়রনের অভাবে আয়রন ডেফিসিয়েন্সি এনিমিয়া হয়, যা শিশুদের শেখার ক্ষমতা, আচরণ ও শারীরিক বৃদ্ধির উপর প্রভাব ফেলে। অনেক শিশু দুর্বলতা, খেতে না চাওয়া, মনোযোগ কমে যাওয়া বা বারবার অসুস্থ হওয়ার মাধ্যমে আয়রনের ঘাটতির লক্ষণ দেখায়। কলিজা, মাংস, মাছ, ডিম, ডাল ও শাকসবজি আয়রনের ভালো উৎস।
ক্যালসিয়াম হাড় ও দাঁতের প্রধান উপাদান। এটি শুধু হাড়ের জন্যই নয়, বরং পেশি সংকোচন, হৃদস্পন্দন ও স্নায়ুর কার্যক্রমের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। ক্যালসিয়ামের ঘাটতিতে শিশুদের হাড় দুর্বল হয় এবং বড়দের হাড় ভঙ্গুর হয়ে যেতে পারে। দুধ, দই, ছোট মাছ ও সবুজ শাক ক্যালসিয়ামের ভালো উৎস।
জিংক শিশুদের বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও ক্ষত নিরাময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জিংকের ঘাটতিতে শিশুদের বৃদ্ধি কমে যেতে পারে এবং ডায়রিয়া ও সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। এজন্য ডায়রিয়ায় জিংক খাওয়ানো হয়। মাছ, মাংস, ডিম ও ডাল জিংকের উৎস।
আয়োডিন থাইরয়েড হরমোন তৈরির জন্য অপরিহার্য। এর অভাবে গয়টার, মানসিক বিকাশের সমস্যা ও শিশুদের বুদ্ধিবিকাশে প্রতিবন্ধকতা দেখা দিতে পারে। আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহার এই সমস্যা প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রেখেছে।
ম্যাগনেসিয়াম, পটাশিয়াম ও সোডিয়াম শরীরের ইলেকট্রোলাইট ভারসাম্য বজায় রাখে। এরা হৃদযন্ত্রের স্বাভাবিক স্পন্দন, পেশির কার্যক্রম এবং স্নায়ুর সংকেত আদান-প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ডায়রিয়া, বমি বা অপুষ্টিতে এই খনিজগুলোর ভারসাম্য নষ্ট হলে খিঁচুনি, দুর্বলতা বা হৃদযন্ত্রের জটিলতা হতে পারে।
সেলেনিয়াম, কপার ও অন্যান্য ট্রেস এলিমেন্ট তুলনামূলক কম পরিমাণে প্রয়োজন হলেও শরীরের বিভিন্ন এনজাইম ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এদের ঘাটতি দীর্ঘমেয়াদে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও কোষীয় কার্যক্রমকে প্রভাবিত করতে পারে।
বর্তমান সময়ে একটি বড় সমস্যা হলো—অনেকে মনে করেন বাজারের মাল্টিভিটামিন খেলেই স্বাস্থ্য ভালো থাকবে। বাস্তবে প্রয়োজন ছাড়া অতিরিক্ত ভিটামিন খাওয়াও ক্ষতিকর হতে পারে, বিশেষ করে ফ্যাট সলিউবল ভিটামিন বেশি জমে টক্সিসিটি তৈরি করতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অযথা সাপ্লিমেন্ট ব্যবহার করা উচিত নয়।
সুষম খাদ্যই হলো ভিটামিন ও মিনারেলস পাওয়ার সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর উপায়। শিশুর খাদ্যতালিকায় বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি, ফলমূল, মাছ, মাংস, ডিম, ডাল ও দুধ রাখা প্রয়োজন। একঘেয়ে খাদ্যাভ্যাস শরীরে নীরব অপুষ্টি তৈরি করতে পারে, যার প্রভাব ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়।
শরীরের সুস্থতা শুধু পেট ভরে খাওয়ার উপর নির্ভর করে না; বরং কী খাওয়া হচ্ছে এবং শরীর প্রয়োজনীয় ক্ষুদ্র পুষ্টি উপাদানগুলো পাচ্ছে কি না, সেটিই আসল বিষয়। ভিটামিন ও মিনারেলস হয়তো অল্প পরিমাণে লাগে, কিন্তু সুস্থ জীবন গঠনে এদের ভূমিকা অসীম।
আপন দেশ/জেডআই




































