ছবি: আপন দেশ
শরতের শেষ ভাগে বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজার ডামাডোল শুরু হয়েছে। শারদীয় দুর্গোৎসবকে ঘিরে টাঙ্গাইলের ১২টি উপজেলার ১৩৫৭টি মণ্ডপে দেবী দুর্গার অনিন্দ্য সুন্দর রূপ ফুটিয়ে তুলতে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত প্রতিমা শিল্পীরা চরম ব্যস্ত সময় পার করছে। রঙ-তুলির শেষ আঁচড়ে প্রতিমার প্রাণ প্রতিষ্ঠায় মগ্ন মৃৎশিল্পীরা, তাদের যাদুকরী হাতের ছোঁয়ায় মাটির ক্যানভাসে জীবন্ত হয়ে উঠছেন দেবী দুর্গা।
জেলা পূজা উদযাপন ফ্রন্টের তথ্য অনুযায়ী, এবার জেলাজুড়ে রেকর্ডসংখ্যক মণ্ডপে পূজা হচ্ছে। দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে টাঙ্গাইলের সনাতনীদের ঘরে ঘরে এখন উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। জেলায় এ বছর মোট ১৩৫৭টি পূজা মণ্ডপে শারদীয় দুর্গোৎসব হচ্ছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ২৭০টি মণ্ডপ নিয়ে শীর্ষে রয়েছে মির্জাপুর এবং সর্বনিম্ন ৩৪টি মণ্ডপ রয়েছে ভূঞাপুরে। মণ্ডপগুলো হচ্ছে- মির্জাপুর উপজেলায় ২৭০টি, টাঙ্গাইল সদরে ২৩৩টি, কালিহাতীতে ১৮২, নাগরপুরে ১৩৮, দেলদুয়ারে ১২৮, ঘাটাইলে ৯৪, বাসাইলে ৮১, মধুপুরে ৬০, গোপালপুরে ৫৭, সখীপুরে ৪৪, ধনবাড়ীতে ৩৬টি এবং ভূঞাপুর উপজেলায় ৩৪টি।
সরেজমিনে টাঙ্গাইল শহরের শ্রী শ্রী কালিবাড়ি, আদালত পাড়া পূজা সংসদ, থানাপাড়া, সাবালিয়া, রেজিস্ট্রিপাড়া, কলেজপাড়া ও প্যারাডাইস পাড়ায় পূজা মন্দির পরিদর্শনে দেখা যায়, প্রতিমা তৈরির কাজ প্রায় শেষের দিকে। প্রতিমা তৈরির কারিগররা বাঁশ ও কাঠের কাঠামোর ওপর খড় ও মাটির প্রলেপ দিয়ে দুর্গা, সরস্বতী, লক্ষ্মী, কার্তিক ও গণেশের অবয়ব ফুটিয়ে তুলেছেন। মণ্ডপগুলোতে এখন চলছে রঙ-তুলির শেষ আঁচড়। শিল্পীরা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে দেবীর চোখ, মুখমণ্ডল, পোশাক ও বিভিন্ন অলংকারের নকশা ফুটিয়ে তুলতে দিনরাত অবিরাম শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন।
সনাতন ধর্মমতে, আগামী ১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠীর ঘট স্থাপনের মধ্যদিয়ে দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। এর আগে ১৫ অক্টোবর মহাপঞ্চমী এবং ১৬ অক্টোবর ষষ্ঠীপূজা, ১৭-১৮ অক্টোবর মহাসপ্তমী এবং ১৯ অক্টোবর মহাঅষ্টমী হবে। ২০ অক্টোবর মহানবমী এবং ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্যে দিয়ে শারদীয় দুর্গোৎসবের পরিসমাপ্তি ঘটবে। সনাতন ধর্মের বিশ্বাস অনুযায়ী, এ বছর দুর্গাদেবী ঘোড়ায় চড়ে মর্ত্যে আগমন করবেন এবং নৌকায় চড়ে কৈলাশে ফিরে যাবেন।
প্রতিমা তৈরির কারিগর নিশি কান্ত পাল জানান, প্রতিবছরই এ সময়টাতে তারা অধীর আগ্রহে দেবী দুর্গার প্রতিমা তৈরির কাজের অপেক্ষায় থাকেন। এরমধ্যেই দেবী দুর্গার প্রতিমা তৈরির কাজ প্রায় শেষ। এখন রঙের শেষ আঁচড় দেয়া হচ্ছে।
আরও পড়ুন<<>>মা ইলিশ রক্ষায় জেলেদের মানসিক অঙ্গীকার গুরুত্বপূর্ণ: প্রাণিসম্পদমন্ত্রী
তিনি জানান, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধির কারণে এখন প্রতিমা তৈরিতে লাভ অনেকটা কমে গেছে। এ বছর তিনি পাঁচটি প্রতিমার কাজ করছেন। টাঙ্গাইল শহরের বড় কালীবাড়ি ও আদালত পাড়া পূজা সংসদ, রেজিস্ট্রি পাড়া, সিরাজগঞ্জ, নোয়াখালী ও ফরিদপুরে আলফাডাঙ্গায় প্রতিমা তৈরির কাজ করছেন। ছোট-বড় প্রতিমা তৈরিতে কাজ ভেদে ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত মজুরি নেন তিনি।
এদিকে, জেলার মির্জাপুর উপজেলার কুমুদিনী হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা এশিয়াখ্যাত দানবীর রণদা প্রসাদ সাহার বাড়ির পূজা মণ্ডপটি উপজেলার সর্ববৃহৎ মণ্ডপ। এ মণ্ডপে দেশ-বিদেশের ভিআইপিদের আগমনে মুখরিত হয়ে উঠে। এ মণ্ডপের প্রতিমা তৈরির কাজ করছেন, মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার নৌহাটা গ্রামের চন্দ্র পালের ছেলে অচিন্ত পাল।
মৃৎশিল্পী অচিন্ত পাল জানান, তিনি মির্জাপুর সাহাপাড়া ও মধ্যপাড়া সার্বজনীন মণ্ডপে প্রতিমা তৈরি করছেন। এতে তিনি এক লাখ টাকা পারিশ্রমিক নেবেন। এছাড়া তিনি টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার পাথরাইলের লোকনাথ মন্দির, ঝিনাইদহ শহরে ৩টি, মাগুরা ও ফরিদপুর শহরে ২টি মণ্ডপের প্রতিমা তৈরি করেছেন।

দুর্গোৎসবকে নির্বিঘ্ন ও শান্তিপূর্ণ করতে জেলাজুড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। প্রতিটি মণ্ডপে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারি থাকবে। পুলিশ, আনসার ও ভিডিপি সদস্যদের পাশাপাশি মণ্ডপগুলোতে নিয়োজিত থাকবে পূজা কমিটির নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবক দল। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ ও বড় মণ্ডপগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, সার্বক্ষণিক মনিটরিং সেল এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিশেষ স্ট্রাইকিং ফোর্সের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সব ধর্মের মানুষের পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও প্রশাসনের কড়া নজরদারিতে এবার একটি উৎসবমুখর ও নিরাপদ পরিবেশে দুর্গাপূজা সম্পন্ন হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
জেলা পূজা উদযাপন ফ্রন্টের সভাপতি অমল ব্যানার্জি জানান, হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সর্ববৃহৎ উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপনের লক্ষ্যে তাদের সব প্রস্তুতি শেষের দিকে। আসন্ন দুর্গাপূজার সার্বিক নিরাপত্তা ও প্রস্তুতি নিয়ে জেলা প্রশাসক ও জেলা পুলিশের সঙ্গে পূজা উদযাপন কমিটির একাধিক মিটিং হয়েছে।
তিনি জানান, পুলিশ প্রশাসন, আনসার সদস্যের পাশাপাশি প্রতিটি পূজা মণ্ডপে তাদের সেচ্ছাসেবক কর্মীরাও দায়িত্ব পালন করবে। প্রতি বছরের মতো এবারও সকলের অংশগ্রহণে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্যদিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে দুর্গাপূজা হবে।
টাঙ্গাইলের এসপি মুহম্মদ শামসুল আলম সরকার জানান, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা উপলক্ষে নেয়া হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। দুর্গাপূজা সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে সনাতনীদের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে পুলিশ প্রশাসনের নিয়মিত বৈঠক হচ্ছে। দুর্গাপূজাকে ঘিরে জেলায় গোয়েন্দা তৎপরতাও বৃদ্ধি করা হয়েছে। এছাড়া সার্বক্ষণিক মনিটরিং সেল এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিশেষ স্ট্রাইকিং ফোর্সের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
আপন দেশ/এসআর
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।





































