প্রকৌশলী রুহুল আমিন। ফাইল ছবি
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সর্বোচ্চ পদ ‘মহাপরিচালক’ (ডিজি)। এ পদটি বাগিয়ে নিতে ৫ কোটি টাকার বড় ‘চুক্তি’র অভিযোগ উঠেছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী কর্নেল (অব.) জাহিদ ফারুকের প্রধান ‘ক্যাশ কালেক্টর’ হিসেবে পরিচিত পাউবোর বর্তমান অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা) প্রকৌশলী মো. রুহুল আমিনকে এ পদে বসাতে পর্দার আড়ালে বিশাল অঙ্কের লবিং ও মিশন চূড়ান্ত হয়েছে।
নদী শাসনের জন্য বৈদেশিক সহায়তায় ‘ফেমিপ’ মেগা প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল ২৫০০ কোটি টাকা। আর এ প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ছিলেন রুহুল আমিন। দায়িত্বকালে প্রকল্পের সিংহভাগ বরাদ্দই লোপাট করেছেন তিনি। দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট তথ্যসমেত অভিযোগ পড়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন দুদকে।
এদিকে চলতি দুর্নীতির ফাইল লাল ফিতায় বাঁধতে বিতর্কিত প্রকৌশলী রুহুল আমিনকে ডিজি বানানোর মিশনে নেমেছেন বর্তমান ডিজি প্রকৌশলী মো. এনায়েত উল্লাহ। এ খবরে পাউবোর সৎ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।
পানির নিচে’ ২৫০০ কোটির নিখুঁত ডাকাতির কারিগরি জালিয়াতি
দেশের নদী শাসনের নামে সবচেয়ে বড় ও চতুর জালিয়াতিটি করা হয়েছে এডিবি ও নেদারল্যান্ডস সরকারের যৌথ অর্থায়নে পরিচালিত ‘ফেমিপ’ মেগা প্রকল্পের জিও-ব্যাগ ডাম্পিংয়ের ক্ষেত্রে। যেহেতু এ কাজের সিংহভাগই পানির নিচে থাকে, তাই এটিকে সিন্ডিকেটের প্রধান চারণভূমিতে পরিণত করেন রুহুল আমিন। নির্ধারিত ২৫০ কেজির পরিবর্তে ঠিকাদারদের সুবিধা দিয়ে নামমাত্র বালু এবং সাধারণ মাটির মিশ্রণ দিয়ে ব্যাগ ভরা হয়েছে। যমুনা ও পদ্মা নদীতে প্রতিদিন বাস্তবে যেখানে ১০ হাজার ব্যাগ ফেলা হতো, সেখানে সাইট ইঞ্জিনিয়ারদের ম্যানেজ করে কাগজে দেখানো হতো ২৫ হাজার ব্যাগ। দৈনিক এ অতিরিক্ত ১৫ হাজার ব্যাগের সম্পূর্ণ টাকা ঠিকাদার ও রুহুল আমিন সিন্ডিকেট লুটে নিয়েছে। ৪ ইঞ্চি পুরুত্বের ব্লক বাস্তবে ৩ থেকে ৩.৫ ইঞ্চি করে তৈরি করে লাখ লাখ ব্লকের এ চুরির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা চুরি করা হয়েছে।
ডিজাইন রিভিশন ফাঁদ ও প্রশাসনিক মেকানিজম
মাঠপর্যায়ে কাজ চলাকালীন হঠাৎ কৃত্রিম কারিগরি ত্রুটির অজুহাতে নকশা পরিবর্তন করে ৫০০ কোটি টাকার প্রকল্প এক লাফে ১ হাজার কোটিতে উন্নীত করে ভুয়া বিলের মাধ্যমে টাকা তুলে নেয়া হয়েছে। নয় বছরের দীর্ঘ ফ্রেমওয়ার্কের প্রথম ধাপে ইচ্ছাকৃতভাবে ধীরগতি দেখিয়ে, শেষ সময়ে ‘জরুরি ভাঙন রোধ’-এর দোহাই দিয়ে ২য় ও ৩য় ধাপের কাজকে মাত্র দেড় থেকে দুই বছরের সংক্ষিপ্ত উইন্ডোতে নিয়ে আসা হয়। উদ্দেশ্য ছিল- ডিবির বিশাল ফান্ড এককালীন ছাড় করিয়ে দ্রুত বিল আউট করা। তড়িঘড়ি করে শত শত ভুয়া কাজের ভাউচার ও মেজারমেন্ট বুক তৈরি করে নকশা ও পরিকল্পনা উইংয়ের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা হিসেবে প্রকৌশলী রুহুল আমিন নিজে স্বাক্ষর দিয়ে বিল পাস করিয়েছেন। কাজের মান ও ব্যয় নিয়ে দাতা সংস্থা এডিবির অডিট টিমের গুরুতর আপত্তিগুলো তিনি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে ভুয়া কারিগরি জবাবের মাধ্যমে ধামাচাপা দেন।
প্রতিমন্ত্রীর অলিখিত ‘ক্যাশ কালেক্টর’ ও ক্ষমতার শীর্ষ ত্রিমুখী অক্ষ
প্রকৌশলী মো: রুহুল আমিনের এ নজিরবিহীন দুর্নীতির মূল খুঁটির জোর ছিল বিগত পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক এবং সিনিয়র সচিব নাজমুল হাসানের অক্ষ। তারা পাউবোতে একটি ‘লুটপাট ট্রায়ো’ বা ত্রিমুখী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন। রুহুল আমিন নির্দিষ্ট মাফিয়া ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিয়ে অর্জিত ঘুষের টাকার একটি বড় অংশ প্রতিমন্ত্রীর ফান্ডে দিতেন। দাতা সংস্থা এডিবি যখনই দুর্নীতির বিরুদ্ধে অডিট আপত্তি তুলত, তখনই সচিব নাজমুল তার প্রশাসনিক ক্ষমতা খাটিয়ে তা ফাইলবন্দি করতেন। আর রুহুল আমিন নকশা শাখা থেকে ভুয়া কারিগরি জাস্টিফিকেশন তৈরি করে সে ফাইল চিরতরে চাপা দিতেন।

লিখিত অভিযোগ আছে, ঢাকা সেন্ট্রাল জোনের প্রধান প্রকৌশলী থাকাকালীন রুহুল আমিন নিজেকে আওয়ামী লীগের কট্টর সমর্থক হিসেবে জাহির করতেন। তিনি যুবলীগ ও ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতাদের মালিকানাধীন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নিয়মবহির্ভূতভাবে কাজ পাইয়ে দিতে টেন্ডার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতেন। কোনো কর্মকর্তা রুহুল আমিনের দুর্নীতির প্রতিবাদ করলে তাকে রাজনৈতিক ট্যাগ (বিএনপি-জামায়াত) দিয়ে বদলি বা হেনস্তা করা হতো। নির্দিষ্ট কিছু মাফিয়া ঠিকাদারকে একচেটিয়া কাজ পাইয়ে দেয়ার মাধ্যমে তিনি অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন। মূলত স্বৈরসরকারের নির্বাচনী ফান্ড জোগাতে তিনি পানি উন্নয়ন বোর্ডকে এটিএম বুথের মতো ব্যবহার করেছেন। ২০২৪ সালের গণঅভূত্থানের পর রুহুল আমিন তরী পার হবার মাঝি হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসানকে। ওই সময়ও বড় অঙ্ক বিনিয়োগ করেছেন প্রকৌশলী রুহুল আমিন।
চুক্তি রুখে পাউবো বাঁচানোর জোর দাবি
নদী ভাঙন কবলিত অসহায় মানুষের টেকসই বাঁধের টাকা নদীগর্ভে ভুয়া মালামাল দেখানোর মাধ্যমে লোপাটকারী এ সিন্ডিকেট প্রধান যদি ৫ কোটি টাকার চুক্তির বিনিময়ে মহাপরিচালক (ডিজি) পদে আসীন হন, তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সম্পূর্ণ প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে পড়। রাষ্ট্রীয় কোষাগারের হাজার হাজার কোটি টাকা সম্পূর্ণ অরক্ষিত হয়ে পড়বে। দেশ ও জনগণের স্বার্থে এ চরম বিতর্কিত ও দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অবিলম্বে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন করার দাবি উঠেছে। পাউবোর উচ্চপদের দুই কর্মকর্তা এ প্রতিবেদককে বলেন, ফ্যাসিষ্ট সরকারের প্রতিমন্ত্রীর কালেক্টর রুহুল আমিন কোনোভাবেই যেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের ডিজি পদে পদোন্নতি দেয়া না হয়। তিনি বলেন, এটাই এখন পাউবোর সর্বস্তরের কর্মকর্তা ও সাধারণ মানুষের জোরালো দাবি।
আরও পড়ুন<>১৩ হাজার কোটি টাকা চুরি করেও রেলে আফজালের ডিজিগিরি!
অভিযোগের বিষয়ে জানতে প্রকৌশলী রুহুল আমিনের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে (০১৭১১*****৭২০) একাধিকবার ফোন করা হয়। কিন্তু তিনি রিসিভ করেননি। অফিসের নম্বরে ১ দেড় ঘণ্টা পরপর চার দফায় যোগাযোগ করা হলে ফোন রিসিভ করে অপরপ্রাপ্ত থেকে জানানো হয় স্যার ব্যস্ত আছেন পরে কল দিন।
তদবিরের বিষয়ে জানতে মহাপরিচালক (ডিজি) প্রকৌশলী মো. এনায়েত উল্লাহ বিষয়টি অস্বীকার করেন।
এদিকে প্রকৌশলী রুহুল আমিনের দীর্ঘদিনের দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট তথ্যসমেত অভিযোগ পড়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনে। পরের পর্বে আসছে বিস্তারিত।
আপন দেশ/এবি
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।




































