Apan Desh | আপন দেশ

স্ত্রীদের প্রতি যেভাবে ভালোবাসা প্রকাশ করতেন মহানবী

আপন দেশ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪:০২, ১৩ জুন ২০২৬

স্ত্রীদের প্রতি যেভাবে ভালোবাসা প্রকাশ করতেন মহানবী

প্রতীকী ছবি

একটি সুখী পরিবার কেবল চার দেয়ালের একটি ঘর নয়; এটি ভালোবাসা, মমতা, শ্রদ্ধা এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার এক প্রশান্তির আশ্রয়স্থল। বর্তমান সময়ে দাম্পত্য কলহ, ভুল বোঝাবুঝি ও সম্পর্কের দূরত্ব যখন বেড়েই চলেছে, তখন মানবজাতির শ্রেষ্ঠ আদর্শ হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দাম্পত্য জীবন আমাদের সামনে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে।

তিনি শুধু একজন নবীই ছিলেন না, ছিলেন একজন আদর্শ স্বামীও। তার জীবনে হজরত খাদিজা (রা.) ও হজরত আয়েশা (রা.)-এর সঙ্গে আচরণের অসংখ্য ঘটনা প্রমাণ করে যে, ভালোবাসা প্রকাশ, অনুভূতির মূল্যায়ন এবং পারস্পরিক সহযোগিতাই একটি সফল বৈবাহিক জীবনের মূল ভিত্তি। মহানবী (সা.)-এর জীবনের এসব শিক্ষা আজও প্রতিটি দম্পতির জন্য সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও অনুসরণীয়।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُمْ مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِّتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُمْ مَوَدَّةً وَرَحْمَةً

অর্থ-আর তার নিদর্শনাবলীর মধ্যে একটি হলো, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ কর এবং তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। (সুরা আর-রূম: আয়াত ২১)

১. স্ত্রীর পরামর্শ ও মতামতকে গুরুত্ব দেয়া
ইসলাম এমন কোনো পারিবারিক ব্যবস্থা শিক্ষা দেয় না, যেখানে স্বামী একাই সব সিদ্ধান্ত নেবে আর স্ত্রী কেবল অনুসরণ করবে। বরং ইসলাম পারস্পরিক সম্মান, পরামর্শ এবং সহযোগিতার ভিত্তিতে সংসার গড়ে তোলার শিক্ষা দেয়। তৎকালীন আরব সমাজে নারীদের প্রতি নানা বৈষম্য বিদ্যমান থাকলেও হজরত খাদিজা (রা.)-এর সঙ্গে মহানবী (সা.)-এর সম্পর্ক ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী। তিনি ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী ও স্বাধীনচেতা নারী। বিয়ের পরও তার ব্যক্তিত্ব ও কর্মজীবন অব্যাহত ছিল। তিনি সংসারে শুধু একজন স্ত্রী ছিলেন না; ছিলেন স্বামীর বিশ্বস্ত সহচর, উপদেষ্টা ও সহযোগী।

হেরা গুহায় প্রথম ওহী লাভের পর মহানবী (সা.) যখন ভীত ও উদ্বিগ্ন অবস্থায় ঘরে ফিরলেন, তখন হজরত খাদিজা (রা.)-ই তাকে সান্ত্বনা দিলেন। তিনি বললেন— আল্লাহর কসম! আল্লাহ কখনো আপনাকে অপমানিত করবেন না। আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখেন, সত্য কথা বলেন, অসহায়দের সাহায্য করেন এবং মেহমানদের আপ্যায়ন করেন।

এ ঘটনাটি শুধু একজন স্ত্রীর ভালোবাসার নয়; বরং একজন জীবনসঙ্গীর বিচক্ষণতা, প্রজ্ঞা ও মানসিক সমর্থনের উজ্জ্বল উদাহরণ। মহানবী (সা.) তার স্ত্রীর পরামর্শকে গুরুত্ব দিয়েছেন এবং জীবনের কঠিন মুহূর্তগুলোতে তার সহযোগিতা গ্রহণ করেছেন।

২. স্ত্রীর অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করা
একটি সুখী সংসারের অন্যতম ভিত্তি হলো কার্যকর যোগাযোগ। মহানবী (সা.) দেখিয়েছেন, দাম্পত্য জীবনে শুধু নিজের কথা বলাই যথেষ্ট নয়; বরং জীবনসঙ্গীর অনুভূতি বুঝতে শেখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

হজরত আয়েশা (রা.)-এর সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত আন্তরিক ও হৃদ্যতাপূর্ণ। আয়েশা (রা.) স্বাধীনভাবে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারতেন এবং মহানবী (সা.) সেগুলো মনোযোগ দিয়ে উপলব্ধি করতেন।

হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাকে বললেন— إِنِّي لَأَعْلَمُ إِذَا كُنْتِ عَنِّي رَاضِيَةً وَإِذَا كُنْتِ عَلَيَّ غَضْبَى

অর্থ-আমি জানি তুমি কখন আমার ওপর সন্তুষ্ট থাকো এবং কখন অসন্তুষ্ট থাকো।

আমি বললাম, আপনি তা কীভাবে বুঝতে পারেন? তিনি বললেন— إِذَا كُنْتِ عَنِّي رَاضِيَةً قُلْتِ: لَا وَرَبِّ مُحَمَّدٍ، وَإِذَا كُنْتِ عَلَيَّ غَضْبَى قُلْتِ: لَا وَرَبِّ إِبْرَاهِيمَ

অর্থ-তুমি যখন সন্তুষ্ট থাকো, তখন বলো—মুহাম্মদের রবের কসম। আর যখন রাগ করো, তখন বলো—ইবরাহিমের রবের কসম।

আরও পড়ুন<<>>মহানবী (সা.)-এর দৃষ্টিতে ইসলামী শাসনব্যবস্থা

আয়েশা (রা.) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! রাগ হলে আমি শুধু আপনার নামটিই উচ্চারণ করি না। (বুখারি ৫২২৮)

এ ঘটনা প্রমাণ করে, একজন আদর্শ স্বামী তার স্ত্রীর অনুভূতি, অভিমান ও আনন্দকে কতটা গুরুত্ব দেন। বর্তমান সমাজে অনেক সময় স্ত্রীর ভিন্নমতকে অবাধ্যতা হিসেবে দেখা হয়; অথচ মহানবী (সা.)-এর শিক্ষা সম্পূর্ণ বিপরীত।

৩. স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করা
ভালোবাসা শুধু হৃদয়ে লুকিয়ে রাখার বিষয় নয়; বরং তা কথায়, আচরণে ও ছোট ছোট কাজে প্রকাশ করাও সুন্নত। মহানবী (সা.) তার স্ত্রীদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশে কখনো সংকোচবোধ করতেন না। হজরত আয়েশা (রা.)-কে তিনি স্নেহভরে ‘হুমাইরা’ বলে ডাকতেন, যা আয়েশা (রা.) অত্যন্ত পছন্দ করতেন।

হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন— كُنْتُ أَشْرَبُ وَأَنَا حَائِضٌ، ثُمَّ أُنَاوِلُهُ النَّبِيَّ ﷺ، فَيَضَعُ فَاهُ عَلَى مَوْضِعِ فِيَّ فَيَشْرَبُ

অর্থ-আমি ঋতুবর্তী অবস্থায় পানি পান করতাম। এরপর পাত্রটি নবী (সা.)-কে দিলে তিনি ঠিক সে স্থানে মুখ রেখে পানি পান করতেন, যেখানে আমি মুখ রেখেছিলাম। (নাসাঈ ২৮৯)

এটি ছিল তার ভালোবাসার সূক্ষ্ম অথচ গভীর প্রকাশ। শুধু তাই নয়, তিনি সংসারের কাজেও স্ত্রীদের সহযোগিতা করতেন। আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, নবী (সা.) ঘরে কী করতেন?

তিনি বলেন— كَانَ فِي مِهْنَةِ أَهْلِهِ

অর্থ- তিনি পরিবারের কাজে সাহায্য করতেন। আর নামাজের সময় হলে নামাজে চলে যেতেন। (বুখারি ৬৭৬)

এখান থেকে আমরা শিখি, সংসারের দায়িত্ব শুধু স্ত্রীর নয়; বরং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে পরিবারকে সুখী ও সুন্দর করে তুলতে হয়।

সর্বোত্তম মানুষের পরিচয়
মহানবী (সা.) বলেছেন— خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ، وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي

অর্থ-তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তিই সর্বোত্তম, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম। আর আমি আমার পরিবারের কাছে তোমাদের সবার চেয়ে উত্তম। (তিরমিজি ৩৮৯৫)

দাম্পত্য জীবনকে সুন্দর, স্থায়ী ও প্রশান্তিময় করতে কেবল ভালোবাসার দাবি করলেই হয় না; সে ভালোবাসাকে সম্মান, সহযোগিতা, সহমর্মিতা এবং দায়িত্ববোধের মাধ্যমে প্রকাশ করতে হয়। মহানবী (সা.)-এর জীবন আমাদের শেখায়— স্ত্রীর মতামতকে মূল্য দেয়া, তার অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করা এবং ভালোবাসা প্রকাশে উদার হওয়াই একজন আদর্শ স্বামীর বৈশিষ্ট্য।

আজ যদি প্রতিটি পরিবার নববী শিক্ষার এ তিনটি কৌশল— পরামর্শ গ্রহণ, অনুভূতির মূল্যায়ন এবং ভালোবাসার প্রকাশ— নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করতে পারে, তবে অসংখ্য ভাঙনের মুখে থাকা পরিবার আবারও ফিরে পাবে শান্তি, সৌহার্দ্য ও জান্নাতের সুবাসময় সুখের আবহ।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে মহানবী (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণ করে পরিবারকে ভালোবাসা, দয়া ও প্রশান্তির নিবাসে পরিণত করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

আপন দেশ/জেডআই

মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়