গ্রাফিক্স ছবি
বিয়ে ইসলামে একটি পবিত্র ইবাদত এবং সামাজিকভাবে স্বীকৃত একটি চুক্তি। এর মাধ্যমে শুধু দুজন মানুষের মিলনই নয়, বরং দুটি পরিবারের মধ্যে নতুন সম্পর্কের সূচনা হয়। তাই ইসলাম বিয়েকে গোপন রাখার পরিবর্তে যথাসম্ভব প্রকাশ করার নির্দেশনা দিয়েছে, যাতে স্বামী-স্ত্রীর অধিকার সংরক্ষিত হয়, সমাজে কোনো সন্দেহ বা অপবাদ সৃষ্টি না হয় এবং হালাল ও হারামের সীমারেখা স্পষ্ট থাকে।
তবে বর্তমানে নানা কারণে ‘গোপন বিয়ে’ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে— এ ধরনের বিয়ে কি বৈধ, নাকি শরিয়তে অপছন্দনীয়? এ বিষয়ে ইসলামী শরিয়তের নির্দেশনা ও ফকীহদের মতামত জানা জরুরি।
বিয়ের বৈধতার মৌলিক শর্ত
যদি গোপন বিয়ে বলতে এমন বিয়েকে বোঝানো হয়, যেখানে কোনো সাক্ষী ছাড়াই নির্জনে বর-কনে ইজাব-কবুল করেছেন, তাহলে ইসলামী আইনজ্ঞদের সর্বসম্মত মত অনুযায়ী এ ধরনের বিয়ে সম্পূর্ণ বাতিল ও অকার্যকর। কারণ সাক্ষী ছাড়া বিয়ে শরিয়তসম্মত হয় না।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— لَا نِكَاحَ إِلَّا بِوَلِيٍّ وَشَاهِدَيْ عَدْلٍ
অর্থ: অভিভাবক ও দুইজন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষী ছাড়া বিয়ে (সম্পূর্ণ) হয় না। (বায়হাকি ১৪৭৩৯)
সাক্ষী থাকলে বিয়ে কি গোপন থাকে?
যদি দুইজন সাক্ষীর উপস্থিতিতে বিয়ে সম্পন্ন হয় এবং পরে তা প্রকাশ করার ক্ষেত্রে কোনো নিষেধাজ্ঞা না থাকে, তাহলে ইসলামের দৃষ্টিতে এটিকে গোপন বিয়ে বলা হয় না। এ ধরনের বিয়ের বৈধতা নিয়ে ফকীহদের মধ্যে কোনো মতভেদ নেই।
তবে যদি বিয়ের সময় সাক্ষীদের বলে দেয়া হয় যে তারা যেন কারও কাছে এ বিয়ের কথা প্রকাশ না করেন, তাহলে এ বিষয়ে ইসলামী আইনজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
ফকীহদের মতামত—
জামিয়া আল-আজহারের সাবেক গ্র্যান্ড ইমাম শায়খ মাহমুদ শালতুত (রহ.) বলেন, সাক্ষীর উপস্থিতিতে বিয়ে হলেও যদি সাক্ষীদের গোপন রাখার শর্ত দেয়া হয়, তাহলে অধিকাংশ ফকীহ এটিকে অপছন্দনীয় (মাকরুহ) বলেছেন। তবে এর বৈধতা নিয়ে দুটি মত রয়েছে।
আরও পড়ুন<<>>ইসলামে পরকীয়ার কঠিন শাস্তি
প্রথম মত অনুযায়ী— দুইজন সাক্ষী উপস্থিত থাকলেই বিয়ে বৈধ হয়ে যায়। পরে গোপন রাখার শর্ত বিয়ের বৈধতাকে নষ্ট করে না।
কিন্তু ইমাম মালিক (রহ.) এবং তার মতের অনুসারী একদল আলেমের মতে— সাক্ষীদের গোপন রাখার শর্ত সাক্ষ্য প্রদানের মূল উদ্দেশ্যই নষ্ট করে দেয়। কারণ বিয়েতে সাক্ষী রাখার উদ্দেশ্যই হলো সমাজে বিয়ের ঘোষণা পৌঁছে দেয়া, যাতে মানুষের অধিকার রক্ষিত হয় এবং কোনো সন্দেহ সৃষ্টি না হয়।
বিয়ে প্রকাশ করার নির্দেশনা রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—أَعْلِنُوا هَذَا النِّكَاحَ
অর্থ: তোমরা এই বিয়ে প্রকাশ কর। (মুসনাদ আহমদ ১৬১৩০, তিরমিজি ১০৮৯)
এছাড়া আল্লাহ তাআলা বলেন—وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُمْ مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُمْ مَوَدَّةً وَرَحْمَةً
অর্থ: আর তার নিদর্শনসমূহের মধ্যে রয়েছে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ কর। আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া স্থাপন করেছেন। (সুরা আর-রূম: আয়াত ২১)
গোপন বিয়ে কেন নিরুৎসাহিত?
যে বিয়ে করার পর সারাক্ষণ পরিবার, সমাজ কিংবা আত্মীয়স্বজনের কাছে প্রকাশ হয়ে যাওয়ার ভয় কাজ করে, সেই বিয়ে কুরআনে বর্ণিত ‘প্রশান্তির’ আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ইসলাম সততা, স্বচ্ছতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতাকে গুরুত্ব দেয়। গোপন বিয়া অনেক সময় পারিবারিক বিরোধ, অধিকারহানি, উত্তরাধিকার জটিলতা এবং সামাজিক বিভ্রান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এ কারণেই ইসলামের নির্দেশনা হলো— বিয়েকে এমনভাবে সম্পন্ন করা, যাতে তা সামাজিকভাবে স্বীকৃত হয় এবং কোনো সন্দেহের অবকাশ না থাকে।
ইসলামের দৃষ্টিতে সাক্ষী ছাড়া গোপন বিয়ে সর্বসম্মতিক্রমে অবৈধ। আর সাক্ষী উপস্থিত থাকলেও যদি বিয়েকে গোপন রাখার শর্ত দেয়া হয়, তাহলে এর বৈধতা নিয়ে ফকীহদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তাই দ্বীনের নিরাপত্তা, পারিবারিক স্থিতি এবং সামাজিক মর্যাদা রক্ষার স্বার্থে বিয়ে যথাসম্ভব প্রকাশ্যে সম্পন্ন করাই উত্তম। একজন মুমিনের জন্য সংশয়পূর্ণ পথ এড়িয়ে সুস্পষ্ট ও নিরাপদ পথ অনুসরণ করাই তাকওয়ার পরিচয়। সাময়িক সংকোচ বা পার্থিব অসুবিধার চেয়ে ইমান, সম্মান এবং শরিয়তের নির্দেশনার মূল্য অনেক বেশি।
আপন দেশ/জেডআই
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।




































