Apan Desh | আপন দেশ

সততা ও যোগ্যতার মৃত্যু, নষ্টদের উত্থান: কোন পথে বাংলাদেশ?

সরদার ফরিদ আহমদ

প্রকাশিত: ১৫:২২, ৪ নভেম্বর ২০২৬

আপডেট: ১৫:৪৫, ৪ নভেম্বর ২০২৬

সততা ও যোগ্যতার মৃত্যু, নষ্টদের উত্থান: কোন পথে বাংলাদেশ?

ছবি: আপন দেশ

সমাজে কারা সম্মান পাবেন? কারা নেতৃত্ব দেবেন? কাদের হাতে থাকবে রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর একটি দেশের সামাজিক মূল্যবোধ, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনেক কিছু বলে দেয়। যে সমাজে সততা, যোগ্যতা, দক্ষতা ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা সম্মানের মাপকাঠি, সেই সমাজের সামনে এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আর যে সমাজে অর্থ, ক্ষমতা ও রাজনৈতিক যোগাযোগই সম্মানের প্রধান ভিত্তি হয়ে ওঠে, সেই সমাজের অবক্ষয় ঠেকানো কঠিন।

বাংলাদেশ এখন এমন এক সংকটের মুখোমুখি। এখানে অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তির যোগ্যতার চেয়ে তার রাজনৈতিক পরিচয় বড় হয়ে উঠেছে। সততার চেয়ে অর্থের প্রভাব বেশি। দক্ষতার চেয়ে পদ-পদবির মূল্য বেশি। মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার চেয়ে ক্ষমতাবানদের সঙ্গে সম্পর্ক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রবণতা শুধু রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নেই। প্রশাসন, ব্যবসা, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং সাংবাদিকতার মতো গুরুত্বপূর্ণ পেশাতেও এর অশুভ প্রভাব দেখা যাচ্ছে।

এটি কেবল নৈতিকতার সংকট নয়। এটি রাষ্ট্র ও সমাজের ভবিষ্যতের জন্য একটি বড় বিপদ।

অসৎ মানুষের সামাজিক প্রতিষ্ঠা

একজন মানুষ দুর্নীতিবাজ। তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখলদারি কিংবা প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে। তার সততা ও চরিত্র নিয়ে মানুষের মধ্যে প্রশ্ন আছে। কিন্তু তার অর্থ আছে। রাজনৈতিক যোগাযোগ আছে। ক্ষমতাবানদের সঙ্গে ওঠাবসা আছে। ফলে সমাজে তার পরিচয় বদলে যায়। তিনি হয়ে ওঠেন গণ্যমান্য ব্যক্তি। তাকে ঘিরে তৈরি হয় অনুগত মানুষের ভিড়। অনেকে তাকে সালাম দেন। তার প্রশংসা করেন। জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানাতে প্রতিযোগিতায় নামেন। রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে তাকে সামনের সারিতে বসানো হয়। কখনো কখনো তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদেও বসানো হয়।

এখানে একটি প্রশ্ন জরুরি। মানুষটি কি সত্যিই সম্মানিত? নাকি তার অর্থ ও ক্ষমতার কাছে অন্যরা আত্মসমর্পণ করেছে? সম্মান অর্জন করতে হয়। কিন্তু প্রভাব খাটিয়ে মানুষের কাছ থেকে সম্মান আদায় করা যায়। এই দুইয়ের মধ্যে বড় পার্থক্য আছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাদের সমাজে এই পার্থক্য ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে উঠছে।

আরও উদ্বেগজনক হলো, অনেকে এসব জানেন। তারপরও ওই ব্যক্তিকে সমর্থন করেন। তাকে ভোট দেন। তার পক্ষে অবস্থান নেন। কারণ, তারা ব্যক্তির সততা বা যোগ্যতাকে প্রধান বিবেচনা করেন না। তারা দেখেন তার ক্ষমতা কতটুকু। তার কাছ থেকে কী সুবিধা পাওয়া যাবে। তিনি কোন দলের লোক। কিংবা ক্ষমতার কেন্দ্রের কতটা কাছাকাছি। এভাবে অসততা শুধু ব্যক্তির দোষ হিসেবে থাকে না। ধীরে ধীরে তা সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য আচরণে পরিণত হয়। আর যখন সমাজ অসততাকে মেনে নিতে শেখে, তখন সৎ মানুষের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে।

রাজনীতির সর্বগ্রাসী প্রভাব

এই সংকটের অন্যতম কারণ রাজনীতির অতিরিক্ত বিস্তার। রাজনীতি রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য অপরিহার্য। রাজনৈতিক দল গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু রাজনীতি যখন সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে যোগ্যতা নির্ধারণের একমাত্র মাপকাঠি হয়ে ওঠে, তখন বিপদ তৈরি হয়। কে কোন পদ পাবেন, কে প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দেবেন, কে সামাজিক অনুষ্ঠানে গুরুত্ব পাবেন, কে গণমাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করবেন-সবকিছুতেই যদি রাজনৈতিক পরিচয় প্রধান বিবেচ্য হয়, তাহলে ব্যক্তির নিজস্ব যোগ্যতার মূল্য কোথায় থাকে?

রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা কোনো অপরাধ নয়। বরং রাজনীতিতে অংশগ্রহণ নাগরিকের অধিকার। কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয় কাউকে দুর্নীতি, অযোগ্যতা কিংবা অনৈতিকতার দায় থেকে মুক্তি দিতে পারে না। দলীয় আনুগত্য কখনো সততার বিকল্প হতে পারে না।

সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের লোকের অপরাধ উপেক্ষা করে। যখন চাঁদাবাজ, দখলদার কিংবা দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা দলীয় পরিচয়ের কারণে রক্ষা পান। যখন যোগ্য মানুষকে সরিয়ে রাজনৈতিকভাবে অনুগত ব্যক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়। তখন দল শুধু নিজের নৈতিক ভিত্তিই দুর্বল করে না, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।

আরও পড়ুন<> ড. মাহবুব হাসানের লেখা<> অস্থিরতা, পোশাক শিল্পে থাবা

সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট কে. মার্টনের একটি গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা এখানে প্রাসঙ্গিক। তার Social Structure and Anomie গবেষণায় তিনি দেখিয়েছেন, সমাজ যখন সাফল্য, সম্পদ ও মর্যাদাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়, কিন্তু সেই সাফল্য অর্জনের বৈধ ও গ্রহণযোগ্য পদ্ধতির প্রতি যথেষ্ট গুরুত্ব দেয় না, তখন অনৈতিক আচরণের ঝুঁকি বাড়ে। মার্টনের মূল গবেষণাপত্র আমাদের সমাজের এই সংকট বোঝার ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক।

বাংলাদেশে প্রশ্নটি তাই শুধু কে সফল হচ্ছেন, তা নয়। প্রশ্ন হলো, কীভাবে তিনি সফল হচ্ছেন? অসৎ পথে অর্থ উপার্জন করেও যদি কেউ সামাজিক মর্যাদা পান, রাজনৈতিক আশ্রয়ে অপরাধ করেও যদি পদ-পদবি পান, তাহলে সমাজের কাছে ভুল বার্তা যায়। মানুষ বুঝতে শেখে, সৎ থাকার চেয়ে ক্ষমতাবান হওয়া বেশি লাভজনক।

সৎ মানুষের হতাশা, অযোগ্যদের উত্থান

এর সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয় সৎ ও যোগ্য মানুষকে। একজন মেধাবী তরুণ পড়াশোনা করেন। দক্ষতা অর্জনের চেষ্টা করেন। নিজের কাজের প্রতি দায়বদ্ধ থাকেন। কিন্তু দেখেন, তার চেয়ে কম যোগ্য একজন ব্যক্তি শুধু রাজনৈতিক যোগাযোগের কারণে এগিয়ে যাচ্ছেন। একজন সৎ কর্মকর্তা দেখেন, নিয়ম মেনে কাজ করার চেয়ে ক্ষমতাবানদের সন্তুষ্ট রাখা বেশি কার্যকর। একজন পেশাদার সাংবাদিক দেখেন, তথ্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতার চেয়ে রাজনৈতিক পক্ষাবলম্বন অনেক সময় বেশি পুরস্কৃত হচ্ছে।

তখন তাদের মনে প্রশ্ন জাগে, এই সমাজে সততার মূল্য কী? যোগ্যতা অর্জনের প্রয়োজনই বা কী?

এই হতাশা ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সামাজিক প্রভাবও রয়েছে। যোগ্য মানুষ নিজেদের গুটিয়ে নেন। কেউ পেশাগত স্বাধীনতা হারান। কেউ দেশ ছাড়ার কথা ভাবেন। কেউ আবার টিকে থাকার জন্য আপস করতে শুরু করেন। ফলে সমাজে একটি বিপজ্জনক বাছাইপ্রক্রিয়া তৈরি হয়। সৎ ও দক্ষ মানুষ পিছিয়ে পড়েন। আর ক্ষমতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারা মানুষ সামনে এগিয়ে যান।

সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি হলো, পরবর্তী প্রজন্মও এই ব্যবস্থাকে স্বাভাবিক বলে ভাবতে শুরু করে। তারা দেখে, সততার চেয়ে যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ। পরিশ্রমের চেয়ে তদবির কার্যকর। নীতির চেয়ে আনুগত্য লাভজনক। এভাবে একটি প্রজন্মের হতাশা পরবর্তী প্রজন্মের মূল্যবোধকেও প্রভাবিত করে।

প্রতিষ্ঠান যখন ব্যক্তির স্বার্থে বন্দি হয়

একটি রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার আইন, ভবন কিংবা প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর নির্ভর করে না। নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারে, তার ওপর। প্রতিষ্ঠান মানে এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে ব্যক্তি নয়, নিয়মই শেষ কথা। সেখানে যোগ্যতা ও সততার ভিত্তিতে নিয়োগ হবে। অপরাধ করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রাজনৈতিক পরিচয় কাউকে বিশেষ সুবিধা দেবে না।

কিন্তু প্রতিষ্ঠান যখন দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, তখন তার উদ্দেশ্য বদলে যায়। জনস্বার্থের পরিবর্তে গোষ্ঠীস্বার্থ প্রাধান্য পায়। জবাবদিহির পরিবর্তে আনুগত্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আইনের পরিবর্তে ক্ষমতাবান ব্যক্তির ইচ্ছা কার্যকর হয়। ফলে প্রতিষ্ঠান বাইরে থেকে টিকে থাকলেও ভেতরে ভেতরে দুর্বল হয়ে পড়ে। সেখানে দক্ষতার চর্চা কমে। সিদ্ধান্তের মান নেমে যায়। দুর্নীতির সুযোগ বাড়ে। সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার ও সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হয়।

রাজনৈতিক পক্ষপাত ও পৃষ্ঠপোষকতার সঙ্গে দুর্নীতির সম্পর্ক নিয়ে আন্তর্জাতিক গবেষণাতেও উদ্বেগ রয়েছে। বার্টেলসম্যান স্টিফটাংয়ের বাংলাদেশবিষয়ক ২০২৬ সালের প্রতিবেদন বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং জবাবদিহির সংকট নিয়ে আলোচনা করেছে। এসব বিশ্লেষণ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট: দুর্নীতি শুধু কিছু অসৎ ব্যক্তির সমস্যা নয়। দুর্বল প্রতিষ্ঠান এবং জবাবদিহির অভাব দুর্নীতিকে টিকিয়ে রাখার পরিবেশ তৈরি করে।

প্রতিষ্ঠানকে দুর্নীতিবাজদের স্বার্থরক্ষার হাতিয়ারে পরিণত হতে দেওয়া হলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো রাষ্ট্র। তখন যোগ্য মানুষও প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা হারান। নাগরিকেরা ন্যায়বিচারের বদলে ক্ষমতার আশ্রয় খোঁজেন। আইন সবার জন্য সমান-এই বিশ্বাস দুর্বল হয়ে পড়ে।

সাংবাদিকতাও কি এই রোগে আক্রান্ত?

সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে এই অবক্ষয় বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। কারণ সাংবাদিকতা শুধু একটি পেশা নয়। এটি সমাজের বিবেক হিসেবে কাজ করার কথা। ক্ষমতাবানদের জবাবদিহির আওতায় আনা, দুর্নীতি প্রকাশ করা এবং সাধারণ মানুষের কথা তুলে ধরা সাংবাদিকতার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কিন্তু সাংবাদিকতায়ও যদি রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত আনুগত্য, মালিকের স্বার্থ কিংবা ক্ষমতাবানদের সঙ্গে সম্পর্ক পেশাগত সততার ওপরে স্থান পায়, তাহলে সাংবাদিকতা তার মূল শক্তি হারায়।

কোনো সাংবাদিকের রাজনৈতিক মতামত থাকতে পারে। কিন্তু সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে তথ্য যাচাই, নিরপেক্ষতা ও পেশাগত নীতি বজায় রাখা জরুরি। সাংবাদিক যদি ক্ষমতাবানদের অনিয়ম আড়াল করেন, রাজনৈতিক পক্ষের প্রচারক হয়ে ওঠেন কিংবা অর্থ ও সুবিধার বিনিময়ে সত্যকে বিকৃত করেন, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় জনস্বার্থ। 

সাংবাদিক সংগঠনগুলো যখন দলীয় ক্যাডার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় বা দলের পদধারীরা নেতা হন, নির্বাচন নিয়ে টালবাহানা চলে, মেয়াদ উত্তীর্ণ অবৈধ কমিটি গঠন করে দাপট দেখায় তখন সেটি আর সাংবাদিকদের সংগঠন থাকে না, হয়ে যায় স্বার্থসিদ্ধির অবৈধ পন্থা। সাংবাদিক সংগঠনগুলো এখন আসলে সাংবাদিকদের সংগঠন নয়, এগুলো হয়ে গেছে রাজনৈতিক দলের অঙ্গ সংগঠন।

আরও পড়ুন<> মোস্তাফা কামালের কলাম<>কোন ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জেন-জি?

বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম নিয়ে ২০২৬ সালে প্রকাশিত গবেষক সীমা ভৌমিকের একটি গবেষণায় media capture বা গণমাধ্যমের ওপর বিভিন্ন পক্ষের নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। গবেষণাটিতে সরকার, গণমাধ্যমের মালিকানা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। 

এই বাস্তবতা মনে করিয়ে দেয়, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা শুধু আইনি স্বাধীনতার ওপর নির্ভর করে না। পেশাগত সততা এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সাংবাদিক নিজেই যদি রাজনৈতিক ও আর্থিক স্বার্থের কাছে আত্মসমর্পণ করেন, তাহলে শুধু আইন দিয়ে স্বাধীন সাংবাদিকতা নিশ্চিত করা যাবে না।

তবে সব সাংবাদিককে এক কাতারে ফেলা ঠিক হবে না। এখনো অনেক সাংবাদিক প্রতিকূলতার মধ্যেও সততা বজায় রাখছেন। তাদের সুরক্ষা দেওয়া এবং পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে সাংবাদিকতার নামে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে পেশার ভেতর থেকেই প্রতিবাদ গড়ে তুলতে হবে।

রাজনীতির কি কোনো দায় নেই?

অবশ্যই আছে। রাজনৈতিক দলগুলো শুধু সরকার গঠন কিংবা নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য কাজ করে না। রাষ্ট্র ও সমাজের মূল্যবোধ গঠনের ক্ষেত্রেও তাদের ভূমিকা রয়েছে। একটি দল কাদের মনোনয়ন দেয়, কাদের পদে বসায়, কার অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় এবং কাদের প্রশ্রয় দেয়-এসবের মাধ্যমে তাদের রাজনৈতিক চরিত্র প্রকাশ পায়।

জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার রাজনীতিতে দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতার গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন। তার Politics as a Vocation বক্তৃতায় রাজনীতিকের দায়িত্ববোধ, বিচারবুদ্ধি এবং নিজের কাজের পরিণতি বিবেচনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ওয়েবারের রাজনৈতিক নৈতিকতা সম্পর্কে পড়ুন।

এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি কয়েকটি প্রশ্ন তোলা যায়। দল কি শুধু নির্বাচনে জেতার জন্য জনপ্রিয় বা অর্থশালী ব্যক্তিকে প্রার্থী করবে? অভিযোগ গুরুতর হলে কি দলীয় পরিচয়ের কারণে কাউকে রক্ষা করবে? গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে আনুগত্যকে প্রাধান্য দেবে, নাকি যোগ্যতা ও সততা বিবেচনা করবে?

এসব প্রশ্নের উত্তর শুধু দলগুলোর ঘোষণাপত্রে পাওয়া যাবে না। উত্তর পাওয়া যাবে তাদের বাস্তব আচরণে।

কোনো দলের নেতা দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত হলেই তাকে অপরাধী বলা যায় না। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া জরুরি। কিন্তু অভিযোগ বিশ্বাসযোগ্য হলে তদন্ত হতে দেওয়া, প্রয়োজনে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করা রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব। একই মানদণ্ড সব দলের জন্য প্রযোজ্য হওয়া উচিত।

মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনার উপায় কী?

সমাজের এই অবক্ষয় এক দিনে তৈরি হয়নি। তাই এক দিনে এর সমাধানও হবে না। তবে পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে কয়েকটি মৌলিক পদক্ষেপের মাধ্যমে।

প্রথমত, রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রার্থী মনোনয়ন এবং পদ-পদবি দেওয়ার ক্ষেত্রে সততা, যোগ্যতা ও জনসেবার রেকর্ডকে গুরুত্ব দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, দুর্নীতি ও অপরাধের অভিযোগ তদন্তে রাজনৈতিক প্রভাব বন্ধ করতে হবে। চতুর্থত, গণমাধ্যমকে মালিকানা, রাজনৈতিক যোগাযোগ ও আর্থিক স্বার্থের অযাচিত প্রভাব থেকে মুক্ত রাখার উদ্যোগ নিতে হবে।

তবে শুধু আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার যথেষ্ট নয়। সামাজিক আচরণেও পরিবর্তন আনতে হবে।

কোনো ব্যক্তি ধনী হলেই তাকে সম্মান জানাতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। রাজনৈতিক নেতা হলেই তিনি নৈতিকতার ঊর্ধ্বে চলে যান না। বড় পদে থাকলেই কেউ শ্রদ্ধার যোগ্য হয়ে ওঠেন না। প্রকৃত সম্মানের ভিত্তি হওয়া উচিত সততা, দক্ষতা, মানবিকতা এবং জনকল্যাণে অবদান।

আমাদের সামাজিক অনুষ্ঠান, পেশাজীবী সংগঠন, গণমাধ্যম এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও এই মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অন্যায়ভাবে প্রভাবশালী হয়ে ওঠা ব্যক্তির সঙ্গে ছবি তোলা কিংবা তার অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়া ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হতে পারে। কিন্তু সেই উপস্থিতি যখন তার অনৈতিক ক্ষমতাকে সামাজিক বৈধতা দেয়, তখন বিষয়টি আর নিছক ব্যক্তিগত থাকে না।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সৎ মানুষের পাশে দাঁড়ানো। যোগ্য মানুষের কাজের মূল্যায়ন করা। অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে তাকে একা ফেলে না দেওয়া। কারণ, একটি সমাজে অসৎ মানুষ যতটা বিপজ্জনক, তার চেয়েও বিপজ্জনক হলো অসৎ মানুষের সামনে সৎ মানুষের নীরব হয়ে যাওয়া।

সমাজ যখন নষ্টদের দখলে চলে যায়, তখন শুধু কিছু অসৎ মানুষ লাভবান হন না। পুরো সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যোগ্যতা অবমূল্যায়িত হয়। সততা দুর্বল হয়। প্রতিষ্ঠান আস্থা হারায়। আর সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করেন, সৎ পথে থেকে সম্মান ও সাফল্য অর্জন করা সম্ভব নয়। এই বিশ্বাস ভেঙে দেওয়া জরুরি।

আরও পড়ুন< তারেক সালমানের লেখা> শামসুল হক: যে নেতার হাত ধরে জন্ম নেয় আ.লীগের রাজনৈতিক যাত্রা

বাংলাদেশের মানুষ বারবার পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন। তারা এমন একটি রাষ্ট্র চান, যেখানে অন্যায়ের বিচার হবে। যোগ্য মানুষ যোগ্যতার ভিত্তিতে দায়িত্ব পাবেন। রাজনৈতিক পরিচয় কাউকে অপরাধের দায় থেকে রক্ষা করবে না। আর অর্থ ও ক্ষমতা দিয়ে কেনা যাবে না সামাজিক মর্যাদা।

রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে এখন বড় পরীক্ষা। তারা কি পুরোনো সুবিধাভোগী সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখবে, নাকি নিজেদের ভেতর থেকেই পরিবর্তন শুরু করবে? তারা কি চাঁদাবাজ, দখলদার ও দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের প্রশ্রয় দেবে, নাকি সততা ও যোগ্যতাকে নেতৃত্বের প্রধান শর্ত করবে? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি কোন দিকে যাবে।

মনে রাখতে হবে, একটি দেশ শুধু দুর্নীতিবাজদের কারণে নষ্ট হয় না। দেশ নষ্ট হয় তখন, যখন দুর্নীতিবাজেরা সম্মান পায়, সৎ মানুষেরা অবহেলিত হয় এবং প্রতিষ্ঠান অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর ক্ষমতা হারায়।

এই প্রবণতা বদলাতে না পারলে সরকার বদলাবে, রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব বদলাবে, ক্ষমতার কেন্দ্রও বদলাবে। কিন্তু সমাজের সংকট বদলাবে না। শুধু নষ্টদের মুখ বদলাবে। নষ্টদের দখলদারি থেকে যাবে। বাংলাদেশের জন্য সেই পরিণতি কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।

লেখক: সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন।

মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়